Image description

চট্টগ্রাম নগরের খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি আটতলা ভবন। বাইরে থেকে সাধারণ ভাড়া বাড়ি মনে হলেও ভেতরের ১৪টি ফ্ল্যাটে চলছিল ভিন্ন এক কার্যক্রম। সেখান থেকে গত ১০ই সেপ্টেম্বর ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে ১৩৪টি মোবাইল, ৫৭টি ল্যাপটপ ও সার্ভারসহ বিপুল ডিজিটাল সরঞ্জাম।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৩৫ জন লাওসের, ২১ জন পাকিস্তানের, ৫ জন চীনের এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। পুলিশ জানায়, তাদের কারও কাছেই পাসপোর্ট বা ভিসা ছিল না। তাদের নথিপত্র স্থানীয় একটি চক্রের কাছে জমা ছিল। ভবনটি দেড় মাস আগে প্রায় ১ কোটি টাকা অগ্রিম দিয়ে ভাড়া নেয়া হয়েছিল। লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মহসিন ভবনটি ভাড়া নিয়েছিল। ৬৩ বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এবং বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্টও তার কাছেই জমা ছিল।

ঘটনাটিকে খুব সাধারণ ঘটনা হিসাবে দেখছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার জানিয়েছেন, প্রতারকরা মূলত ওয়েবসাইট হ্যাক করে অনলাইন জুয়ার অফার এবং ভুয়া চাকরির ফাঁদ তৈরি করতো। লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলায় তারা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। কমিশনারের এমন বক্তব্যই নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। তাড়া খেয়ে কি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীরা তাদের ঘাঁটি সরিয়ে আনছে বাংলাদেশে? অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধীরা বিভিন্ন দেশে সুবিধা করতে না পেরে এখন বাংলাদেশকে সহজ টার্গেট হিসাবে নিয়েছে। কারণ তারা গবেষণা করে দেখেছে- বাংলাদেশের মানুষ সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে এখনো অভিজ্ঞ হয়ে উঠেনি।

শুধু চট্টগ্রামের ওই ঘটনাতেই শেষ নয়। গত সপ্তাহে কক্সবাজারের একটি বিলাসবহুল হোটেলে প্রায় ২ হাজার আইফোন ও ল্যাপটপসহ ৫ চীনা ও ১ তাইওয়ানিজ নাগরিককে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চক্রটি স্টারলিংক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন শেয়ারবাজার, জুয়া ও বিভিন্ন কারেন্সি-সংক্রান্ত প্রতারণায় জড়িত ছিল। পুলিশ সূত্র জানায়, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ এলাকায় চারটি রিসোর্টে প্রায় ৩০০ জন চীনা নাগরিক ঘাঁটি গেড়েছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে ডিজিটাল ফাঁদ পেতেছিল চক্রটি। তারা হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলাস রিসোর্টে ল্যাব তৈরি করেছিল। চীনারা মেরিন রিসোর্টটি ভাড়া নিয়েছিল তিন বছরের চুক্তিতে। সেখানে ছয়টি শব্দ নিরোধক কক্ষও তৈরি করেছিল। এসব কক্ষে গোপনে অনলাইনভিত্তিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো। রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় এ ধরনের একাধিক প্রতারক চক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর ব্যাপক অভিযান শুরু হলে চক্রটির সদস্যরা প্রথমে চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় ঘাঁটি গড়ে তোলার চেষ্টা করে। তবে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতা বেশি থাকায় কক্সবাজারকে তারা নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেরিন ড্রাইভের চারটি রিসোর্টেই ছিলেন দুই শতাধিক চীনা নাগরিক। তারা দিনের বেলায় রুমের বাইরে যেতেন না। তাদের ব্যবহারের জন্য ছিল কয়েকটি মাইক্রোবাস। কালো গ্লাসের গাড়িগুলোতে তারা মুখ ঢেকে চলাফেরা করতেন। তাদের গাইড করতেন স্থানীয় শাহজাহান, আকতার কামাল ও ক্যাসন নামের তিন তরুণ। চীনারা নিজেদের দেশ থেকে তাদের রান্নার লোক সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। রাতের বেলায় তারা রিসোর্টের রুম থেকে বের হতেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি ঘটনায় এক জায়গায় মিল রয়েছে। চক্রগুলো অভিজাত এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতো। তাদের হেফাজতে থাকতো বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ডিভাইস এবং তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করতো দেশি অপরাধীরা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চক্রগুলো দেশি সহযোগী ছাড়া টিকতে পারে না। খুলশীর ঘটনায় কোকেন উদ্ধার মামলায় আগে গ্রেপ্তার হওয়া মোহাম্মদ মহসিনকে বাড়ি ভাড়া দেয়ার অভিযোগে এই মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে তুলনামূলক কম ভাড়ায় বড় ভবন পাওয়া, সিমের সহজলভ্যতা, দুর্বল ইমিগ্রেশন মনিটরিং এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট এই তিনটি কারণে দেশটি স্ক্যামারদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তবে পুলিশ বলছে, ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে এলে কাদের প্রতারণা করা হয়েছে এবং টাকা কোন পথে পাচার হয়েছে, তা স্পষ্ট হবে।

ইউএনওডিসি’র ২০২৬ সালের দু’টি পৃথক প্রতিবেদনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন স্ক্যাম, মানব পাচার, অর্থপাচার ও অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের আন্তঃদেশীয় বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে স্ক্যাম অপারেশনে লোক সরবরাহকারী নিয়োগ নেটওয়ার্কের পাশাপাশি দেশের ভেতরে স্ক্যাম অপারেশন ও অনলাইন জুয়ার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএনওডিসি বলছে, প্রায় ৩/৪ ভাগ স্ক্যাম অপারেশন মেকং অঞ্চলে (মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া) ছিল, কিন্তু এখন সেটা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রসমূহ, দক্ষিণ এশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে স্ক্যাম অপারেশন বাড়ছে। মেকং অঞ্চলে চাপ বাড়ায় অপরাধীরা এখন অ্যাপার্টমেন্ট, হোটেল ও সাধারণ অফিস ভবনকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে যা সহজে সরানো যায়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি কিছু দেশের নাগরিক বাংলাদেশে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পড়াশোনার কথা বলে এসে নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধের অধিকাংশই প্রযুক্তিভিত্তিক বা সাইবার ক্রাইম। এর সঙ্গে জাল টাকা তৈরি, মানব পাচার এবং বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিকেন্দ্রিক অপরাধের সঙ্গেও এদের কারও কারও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিদেশিরা যখন বাংলাদেশে আসছে, তখন এখানকার সমাজব্যবস্থা ও অপরাধের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে তাদের তো পূর্বধারণা থাকার কথা নয়। তাহলে এই ধারণাগুলো নেয়ার জন্য এ দেশে থাকা কোনো অপরাধী চক্রের সঙ্গে কি তাদের আসার আগেই সম্পর্ক তৈরি থাকে? আবার কখনো এখানে আসার পরও আমাদের দেশীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে অপরাধ করার বিভিন্ন উপায়- বিশেষ করে কীভাবে অপরাধ করে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়, কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে থাকার জন্য কোথায় বাসা নিলে সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়- এই ধরনের অপরাধমূলক পরামর্শ দেশীয় চক্রগুলো তাদের দিয়ে থাকে।

আর যে সমস্ত বিদেশি নাগরিক নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের একটা বড় অংশের প্রযুক্তিগত দক্ষতা তুলনামূলকভাবে বেশি। তারা সাইবার ক্রাইম কিংবা মানব পাচারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা করে থাকে- এমন অভিযোগ রয়েছে। ডলার জাল তৈরি, টাকা পাচার এবং মানুষের মধ্যে সাইবারভীতি সৃষ্টি করা কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রেও এখানকার অপরাধীদের তারা অর্থের বিনিময়ে বা কোনো সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে প্রযুক্তিগতভাবে সহযোগিতা করে- এমন অভিযোগও রয়েছে। তৌহিদুল হক বলেন, আমরা বারবার বলছি, যেসব বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে আসেন, তারা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আসেন, সেই প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর পুলিশের বিশেষ শাখা, এসবি-কে একটি রিপোর্ট প্রদান করবে। আর যেখানে তারা বাসা ভাড়া নেবেন, সেই বাসা ভাড়া নেয়ার চুক্তির একটি ফটোকপি, পাসপোর্ট নম্বরসহ, বাড়িওয়ালা নিকটস্থ থানায় জমা দেবেন। এভাবে যদি মনিটরিং করা হয়, তাহলে আসলে তাদের অপরাধ থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।