স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দোটানা অবস্থায় পড়েছে নির্বাচন কমিশন। মধ্য নভেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ আয়োজনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করলেও কমিশন আপাতত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অবস্থায় নেই। গতকাল কমিশনে বৈঠক হলেও নির্বাচন শুরুর দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মতামত এসেছে।
কমিশন এই মতামত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। বৈঠকে আসা মতামতে এ বছর নির্বাচন শুরুর বিষয়ে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতার উল্লেখ করা হয়েছে। বৈঠক সূত্র জানায়, নানা কারণে এ বছর নির্বাচন শুরু করা নিয়ে সংশয় আছে। বিশেষ করে নভেম্বর এবং ডিসেম্বর হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষার সময়। এই সময়ে নির্বাচন আয়োজন অনেকটা জটিল প্রক্রিয়া। তাই বার্ষিক পরীক্ষার পর থেকে নির্বাচন শুরুর বিষয়েও মত এসেছে। নানা শঙ্কার কারণে এ বছর নির্বাচন আয়োজন থেকে ইসি পিছিয়ে আসতে পারে। যদিও গতকাল পর্যন্ত আগের অবস্থানই জানানো হয়েছে ইসি’র তরফে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সরকারের পক্ষ অংশ নেয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চলতি বছরের মধ্যে ইউপি নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেই। ভোট করার প্রস্তুত হতে কতোদিন লাগবে, তা জানাতে একমাস সময় লাগতে পারে।
আরও পড়ুন:
এই সেই অডিও
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সচিবদের কাছে ভোটের সুবিধাজনক সময় জানতে চাওয়া হয়। বৈঠকে একজন সচিব বলেন, নভেম্বর বা ডিসেম্বরে ভোট করার মতো প্রস্তুতি তাদের নেই। ভোট করার জন্য প্রস্তুত হতে কতোদিন লাগবে তা জানাতে একমাস সময় লাগতে পারে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষা সচিব বলেন, বন্যার প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি ভোটগ্রহণে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। আবার নভেম্বর-ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা, বৃত্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা রয়েছে। তাতে শিক্ষকেরা ব্যস্ত থাকবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হলে পরীক্ষায় ব্যাঘাত হতে পারে। এ সময় ভোট করা সম্ভব নয়। বৈঠক সূত্র জানায়, দুইজন নির্বাচন কমিশনার তাদের বক্তব্যে অন্তত এ বছরের শেষের দিকে হলেও প্রথম ধাপের নির্বাচন দিয়ে ইউপি নির্বাচন শুরু করতে চান বলে জানিয়েছেন।
ওদিকে শুরুর সময় জানাতে না পারলেও আগামী বছরের জুনের আগেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। নির্বাচন আয়োজনের সময় নিয়ে নানা বাস্তবতা ও জটিলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বর জুড়ে বিভিন্ন পরীক্ষা, ফেব্রুয়ারিতে রোজা এবং এরপর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আগের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়সূচি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে কমিশন পর্যালোচনা করবে। গতকাল আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, এই সীমিত সময়ের মধ্যে কীভাবে নির্বাচন আয়োজন করা যায়, তা নিয়ে আরও সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। কমিশন এ বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করছে।
সানাউল্লাহ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় একটি সর্বসম্মত মতামত পাওয়া গেছে, সবাই একমত হয়েছেন যে আগামী বছরের জুনের আগেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। তবে ঠিক কবে থেকে নির্বাচন শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত সোমবার নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছিলেন স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। সেখানে সাত ধাপে ভোট করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সাড়ে চার হাজারের মতো ইউনিয়ন পরিষদে সাত ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে ৮০ উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটের মধ্যদিয়ে এবারের ইউপি নির্বাচন শুরু হবে। প্রথম ধাপের নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ১২ই নভেম্বর উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্যের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, এ বিষয়ে সরকার কিংবা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কিছুই জানে না। এমনকি ইসি’র সঙ্গে এ নিয়ে সরকারের কোনো চিঠি চালাচালিও হয়নি। পরে প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর নির্বাচন কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট করে কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, কমিশনের পক্ষ থেকে সোমবার যে বিস্তারিত ব্রিফিং দেয়া হয়েছে, সেখানে বারবার বলা হয়েছে-এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
গতকালের বৈঠকের পর ইসি সানাউল্লাহ বলেন, নির্বাচনের সময় নিয়ে জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগে তো আমাকে স্লটটা পেতে হবে নির্বাচন করার জন্য।’ নভেম্বর ও ডিসেম্বর জুড়ে বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা থাকায় এ সময়ে নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ খুবই সীমিত। জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারির শুরুতে রোজা শুরু হবে। রোজা শেষে শুরু হবে এসএসসি পরীক্ষা। তবে এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ৬ই জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত কিছুটা সময় পাওয়া যেতে পারে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে সানাউল্লাহ বলেন, এবারের বন্যায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে যে ব্যাঘাত ঘটেছে, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় পরীক্ষা কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রশিক্ষণের সমন্বয় ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য একজন শিক্ষককে অন্তত এক সপ্তাহ সময় দিতে হয়। এর বাইরে খাতা মূল্যায়ন, পরীক্ষার প্রাক-প্রস্তুতি ও অন্যান্য শিক্ষা কার্যক্রমও রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগকে যৌক্তিক উল্লেখ করে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে। একইসঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের বাজেট পরিকল্পনাসহ আরও কিছু কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। কর্মকর্তা ও সচিব পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সম্পন্ন করার পর কমিশন বৈঠকে চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অন্য চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।