Image description

ড. বদরূল ইমাম

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বর্তমানে এক চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। দেশীয় গ্যাসের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসা এবং আমদানিনির্ভর এলএনজি’র (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আকাশছোঁয়া দাম—এই দুইয়ের চাপে দেশের শিল্প ও অর্থনীতি যখন ধুঁকছে, তখন নতুন একটি সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীর সাথে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের এক সৌজন্য সাক্ষাতে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে। মিয়ানমারও এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের বাস্তবতায় এই উদ্যোগ কতটা যৌক্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের প্রকৃত সমাধানই বা কোথায়?

প্রথমেই মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির সম্ভাব্যতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করা যাক। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দূরপ্রাচ্য বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজে করে এলএনজি আনার চেয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আনা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানিতে পরিবহন খরচ ও রিগ্যাসিফিকেশনের যে বিপুল ব্যয় রয়েছে, পাইপলাইনের ক্ষেত্রে তা অনেকটাই কমে যাবে। টেকনাফ থেকে মিয়ানমারের নিকটতম গ্যাস পাইপলাইনের দূরত্ব মাত্র ৭০ কিলোমিটারের মতো। নাফ নদীতে সাবসি বা সাবমেরিন পাইপলাইন অথবা স্থলভাগের ওপর দিয়ে আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইন নির্মাণ করা হলে এর মোট দৈর্ঘ্য রুটভেদে ৬০ থেকে ১০০ কিলোমিটার হতে পারে। কারিগরি ও বাণিজ্যিক দিক থেকে এটি একেবারেই একটি বাস্তবসম্মত এবং লাভজনক প্রকল্প হতে পারে।

তবে এই আলোচনার শুরুতেই যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় তা হলো—মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা। অনেকেই মনে করতে পারেন, যে দেশের সাথে আমাদের রোহিঙ্গা সংকটের মতো এত বড় একটি অমীমাংসিত মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট চলছে, তাদের ওপর জ্বালানির মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে নির্ভর করা কতটা নিরাপদ? আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের বাস্তবতা হলো, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক বা মানবিক সংকটকে সবসময় এক পাল্লায় মাপা যায় না। রোহিঙ্গা ইস্যুটি একটি মানবিক ও রাজনৈতিক সংকট, এর সাথে দু'দেশের জ্বালানি বাণিজ্যের সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ার কোনো কারণ নেই।

 

আমদানি কখনোই কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হতে পারে না। টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার পাশাপাশি বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকেও (আইওসি) বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে।

 

সীমান্তে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বা পাইপলাইনের নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের, তবে আধুনিক প্রযুক্তিতে পর্যাপ্ত সিকিউরিটি ও মিটিগেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। এছাড়া, সম্প্রতি প্রস্তাবিত 'চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর' বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলে একটি নতুন অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হবে, যা ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা উভয়ই বৃদ্ধি করবে।

মিয়ানমারের দিকে আমাদের হাত বাড়ানোর মূল কারণটি লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের ব্যর্থতার ভেতরে। একসময় আমরা মোট জ্বালানি চাহিদার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নিজস্ব গ্যাস দিয়ে মেটাতাম। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র ভয়াবহ। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা যেখানে প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে মাত্র দুই বছর আগেও আমাদের উৎপাদন ছিল প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু অভাবনীয় হলেও সত্য, বর্তমানে তা কমতে কমতে ১৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুটে এসে ঠেকেছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো শুকিয়ে আসছে, কিন্তু সেই তুলনায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি।

এটাই আমাদের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। বাংলাদেশ একটি গ্যাস-সমৃদ্ধ ব-দ্বীপ হওয়া সত্ত্বেও এখানে গ্যাস অনুসন্ধানের হার চরম হতাশাজনক। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলে, সারা বিশ্বে গড়ে দশটি কূপ খনন করলে একটিতে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। আর বাংলাদেশে পাঁচটি কূপ খনন করলে একটিতে সাফল্য আসে। অর্থাৎ আমাদের সাফল্যের হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্বিগুণ! এত বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অনুসন্ধান চালাইনি।

সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে এক ধরনের ঝুঁকি এড়ানোর মানসিকতা কাজ করে। অনেকেই মনে করেন, একটি কূপ খনন করলেই সেখান থেকে গ্যাস পেতে হবে। কিন্তু তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিজ্ঞান সে কথা বলে না। এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু অতি লাভজনক বিনিয়োগ। হয়তো পরপর তিনটি বা চারটি কূপে গ্যাস পাওয়া যাবে না, কিন্তু পঞ্চম কূপে যে বিশাল মজুত পাওয়া যাবে, তা আগের সব ক্ষতি পুষিয়ে দশটি কূপের সমান লাভ এনে দেবে। এই ঝুঁকি নেওয়ার মতো ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছার অভাবেই আজ আমাদের এই পরনির্ভরশীলতা।

বর্তমান সংকট মোকাবিলার জন্য মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও চমৎকার বিকল্প। পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে এলএনজি আমদানি বা দীর্ঘমেয়াদে জলবিদ্যুৎ আমদানির যে প্রস্তাবনাগুলো এসেছে, তা নিয়েও কারিগরি কমিটির মাধ্যমে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, আমদানি কখনোই কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হতে পারে না। টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার পাশাপাশি বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকেও (আইওসি) বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে। মিয়ানমারের গ্যাস আমাদের সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু আমাদের প্রকৃত মুক্তি লুকিয়ে আছে আমাদেরই মাটির নিচে থাকা অনাবিষ্কৃত গ্যাসসম্পদ যথাযথভাবে উত্তোলনের ওপর। দুইয়ের সঠিক সমন্বয়েই কেবল নিশ্চিত হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা।

  • ড. বদরূল ইমাম: ভূতত্ত্ববিদ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ