মাওলানা মামুনুল হক
(প্রথম কিস্তি)
বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে জুলাই সনদ ও গণভোটকেন্দ্রিক আলোচনা দুটি ভাগে উপস্থাপন করা হবে। এর প্রথম ভাগে থাকবে জুলাই সনদ প্রণয়ন থেকে গণভোট আয়োজন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া। আর দ্বিতীয় ভাগে থাকবে জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে আমাদের অবস্থান—‘জুলাই কেন আমাদের লড়াই?’
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মতবিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো গণভোটের রায়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান দাবি হচ্ছে, গণভোটের এই রায় কার্যকর করা।
তাদের বক্তব্য, বর্তমান সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়; বরং এটি বাধাগ্রস্ত বা বানচাল করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের দাবি হলো, জুলাই সনদ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়ে পরিণত হয়েছে। তাই জনগণের সেই রায়কে কার্যকর করার মাধ্যমেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।
জুলাই সনদ না গণভোট?
এই পর্যায়ে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—জুলাই সনদ এবং গণভোটের মধ্যে পার্থক্য কী? সরকার আসলে কোন বিষয় বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে এবং এর বিপরীতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি কী?
উভয় পক্ষের অবস্থানের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণ করা জরুরি। আর এই পার্থক্য বুঝতে হলে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ঘটনাপ্রবাহ এবং এর অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা সংঘটিত হয়। জুলাই থেকে এ পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাগুলোর প্রকৃত স্বরূপ ও চরিত্র উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
ঘটনাপ্রবাহের একটি ধারাবাহিক তালিকা বা লাইনআপ তৈরি করলে সর্বাগ্রে আসে জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই, অর্থাৎ ৫ আগস্ট, চূড়ান্ত পর্যায়ে সেই পরিবর্তন সংঘটিত হয়।
বিপ্লব না অভ্যুত্থান?
সাধারণ ভাষায় জুলাইয়ের ঘটনাকে ‘বিপ্লব’ বলা হলেও, ‘বিপ্লব’ একটি সুনির্দিষ্ট পারিভাষিক শব্দ। কোনো ঘটনাকে বিপ্লব বলা যাবে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু মাপকাঠি বা ক্রাইটেরিয়া রয়েছে।
সেই বিবেচনায় জুলাইয়ের পরিবর্তনকে পূর্ণাঙ্গ অর্থে বিপ্লব না বলে অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লবের মধ্যকার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পার্থক্য অবশ্য ভিন্ন একটি আলোচনার বিষয়।
যদিও ব্যাপক অর্থে জুলাইয়ের ঘটনাকে বিপ্লব হিসেবেও অভিহিত করা হয়, তবে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এটি একটি গণঅভ্যুত্থান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
জুলাই থেকে আগস্ট—এই সময়কালের মধ্যেই অভ্যুত্থানের মূল ঘটনাপ্রবাহ সম্পন্ন হয়। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে এবং নতুন একটি সরকার গঠিত হয়।
নিয়মানুযায়ী, এ ধরনের পরিবর্তনের পর গঠিত নতুন সরকারকে বিপ্লবী সরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার কথা ছিল। যদি নতুন সরকার বিপ্লবী সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে জুলাইয়ের ঘটনাকে পূর্ণাঙ্গ অর্থে বিপ্লব বলা সংগত হতো।
কিন্তু পরবর্তী সরকার বিপ্লবী সরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। বরং পূর্ববর্তী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে, রাষ্ট্রের অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে সংবিধান অনুসারে পূর্বতন রাষ্ট্রপতিকে মূল কেন্দ্র বা অক্ষ ধরে পরবর্তী সরকার গঠন করা হয়েছে।
এই কারণেই জুলাইয়ের ঘটনাকে পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব না বলে অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করাই অধিক বাস্তবসম্মত।
আলোচনায় জুলাই সনদ
জুলাই অভ্যুত্থানের কিছুদিন পর থেকেই এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনার আলোচনা শুরু হয়।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাইয়ের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম জুলাই সনদ প্রণয়নের দাবি উত্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে এই দাবির ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই সনদ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশ্ন দেখা দেয়—জুলাই সনদ কীভাবে প্রণয়ন করা হবে? একপর্যায়ে সবাই উপলব্ধি করেন, দেশের সব রাজনৈতিক দলের মতামতের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন এবং সকলের সমন্বয়ের ভিত্তিতেই এই সনদ প্রণয়ন করা উচিত।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন
জুলাই সনদ প্রণয়ন, সাংবিধানিক সংস্কার এবং দেশে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠন করা হয় ‘ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশন’ বা জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
এই কমিশন দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিন দফায় মোট ৭২ দিন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ আলোচনা, মতবিনিময় ও পর্যালোচনার মাধ্যমে কমিশন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। পরবর্তীতে এসব সিদ্ধান্তের সমন্বয়েই একটি সনদ প্রণয়ন করা হয়। এটিই বহুল আলোচিত জুলাই জাতীয় সনদ।
জুলাই সনদের বুনিয়াদ কী?
জুলাই সনদের ভিত্তি নিহিত রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনার মধ্যে। এই অভ্যুত্থানের প্রধান দুটি লক্ষ্য ছিল—
১. ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ
২. বৈষম্যের বিলোপ
অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো মূল্যে ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করা এবং এর পুনরুত্থানের সব পথ বন্ধ করা। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, রাজনীতি, সংবিধানসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্যের উপাদানগুলো দূর করা।
এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই জুলাই সনদ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
জুলাই সনদ প্রণয়নের লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের খসড়া প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠায়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে মতামত প্রদান করে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে পারস্পরিক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক এবং প্রস্তাবগুলোর ভালো-মন্দ দিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি ঐকমত্যের সনদ প্রণয়ন করা হয়।
তবে এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও দেখা দেয়। যেসব বিষয়ে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেসব বিষয় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়।
সব দলের ভিন্নমতকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করেই যেসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে প্রণীত হয় জুলাই জাতীয় সনদ।
এই সনদে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল দুটি লক্ষ্য—ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ ও বৈষম্যের বিলোপ—এর চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে।
(চলবে...)