মইনুল হক
ইতিহাসে তিনটি বড় অভ্যুত্থান আমাদের রাষ্ট্রজীবনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে—১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান, এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান। তিনটির প্রেক্ষাপট আলাদা, চরিত্র আলাদা, নেতৃত্ব আলাদা, রক্তপাতের ধরন আলাদা; কিন্তু একটি জায়গায় এসে তিনটি ঘটনার মধ্যে আশ্চর্যজনক মিল দেখা যায়। তিনবারই জনগণ বা রাষ্ট্রের ভেতরের বিদ্রোহী শক্তি পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙেছে, তিনবারই গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, এবং তিনবারই সেই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হয়েছে জিয়া পরিবার।
প্রথমবার জিয়াউর রহমান।
দ্বিতীয়বার তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া।
তৃতীয়বার তাঁদের সন্তান তারেক রহমান।
এবং আমার মূল্যায়নে—তিনবারই বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।
এই লেখাটি কোনো পত্রিকার তৈরি করা ন্যারেটিভ নয়। এটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত বা কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পক্ষের মুখস্থ ভাষাও নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসকে আমি দলীয় প্রচারণার চোখে দেখি না। আমি দেখার চেষ্টা করি, জনগণ কী চেয়েছিল, ক্ষমতাসীনরা কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় গিয়ে তারা কী করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত কারা লাভবান হয়েছে। কারণ ইতিহাসের আসল প্রশ্ন কখনো শুধু “কে ক্ষমতায় এলো” নয়; আসল প্রশ্ন হলো—যে রক্ত, যে বিদ্রোহ, যে গণআকাঙ্ক্ষা ক্ষমতার দরজা খুলে দিল, সেই দরজা দিয়ে ঢুকে ক্ষমতাসীনরা জনগণের সঙ্গে কেমন আচরণ করল?
বাংলাদেশের তিনটি অভ্যুত্থানকে এই প্রশ্নে বিচার করলে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অত্যন্ত অস্বস্তিকর আলোতে দাঁড়ায়।
১. ১৯৭৫: বাকশাল থেকে মুক্তির সম্ভাবনা, কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণ নয়
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টকে নিয়ে বাংলাদেশে দুই ধরনের প্রচলিত ন্যারেটিভ আছে। একদল এটিকে শুধু হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখে, আরেকদল এটিকে বাকশালী স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির ঘটনা হিসেবে দেখে। আমি এই লেখায় সেই নৈতিক বিতর্কে ঢুকতে চাই না। হত্যাকাণ্ড ঠিক না বেঠিক—এই বিতর্ক আলাদা। আমি এখানে দেখতে চাই: ১৫ আগস্টের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলো, সেটি কি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ খুলেছিল? আর যারা সেই ঘটনার নেপথ্য বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছিল, তাদের সঙ্গে পরবর্তী ক্ষমতার কেন্দ্র—বিশেষত জিয়াউর রহমান—ন্যায়সংগত আচরণ করেছিলেন কি না?
প্রথমেই বলা দরকার, ১৫ আগস্টের সঙ্গে সঙ্গেই জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেননি। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হন। জিয়া তখন সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধান নন। কিন্তু ইতিহাসে সরাসরি ক্ষমতায় না আসা আর ঘটনার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী না হওয়া এক কথা নয়। ১৫ আগস্টের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, যে সামরিক-প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়, এবং যে ক্ষমতার করিডর খুলে যায়—সেখান থেকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—জিয়া ১৫ আগস্ট করেছেন কি করেননি। প্রশ্নটি হওয়া উচিত—১৫ আগস্টের ফল তিনি কীভাবে ব্যবহার করেছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার: জিয়া ছিলেন ১৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতার অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী।
বাকশাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনকে শ্বাসরুদ্ধ করেছিল। একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক বহুত্বের দমন—এসবের ফলে রাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে গভীর ক্ষোভ জমেছিল। সুতরাং ১৫ আগস্ট-পরবর্তী অনেক মানুষ সত্যিই মনে করেছিল, বাংলাদেশ হয়তো একদলীয় শাসনের অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসবে।
কিন্তু সেই প্রত্যাশা কি পূরণ হলো?
জনগণের হাতে কি রাষ্ট্র ফিরে গেল?
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কি পুনর্গঠিত হলো?
সেনাবাহিনী কি রাজনীতি থেকে সরে গেল?
আইনের শাসন কি প্রতিষ্ঠিত হলো?
না। বরং এক ধরনের সামরিক-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস শুরু হলো।
যারা ১৫ আগস্টে ঝুঁকি নিয়েছিল, তারা ক্ষমতার দরজা খুলেছিল, কিন্তু সেই দরজার মালিক হলো অন্য শক্তি। জিয়া তাদের সঙ্গে কী করলেন? তিনি তাদের বিচার করলেন না। আবার রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত অংশীদারও করলেন না। তিনি তাদের রক্ষা করলেন, বিদেশে পাঠালেন, দায়মুক্তির কাঠামো বজায় রাখলেন, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখলেন না। এই আচরণকে সুবিচার বলা যায় না; এটিকে বলা যায় ক্ষমতা-সংরক্ষণমূলক ব্যবহার।
১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর Indemnity Ordinance জারি করা হয়, যার মাধ্যমে ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পথ বন্ধ করা হয়; পরে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতিত্বকালে সেই অধ্যাদেশ আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং পঞ্চম সংশোধনী ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৯ এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনামলের ঘোষণা ও অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়—এই ইতিহাস প্রামাণ্যভাবে নথিভুক্ত।
এখানেই জিয়ার দ্বৈততা ধরা পড়ে। তিনি যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণ চাইতেন, তাহলে ১৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাকে আইনের শাসনের মুখোমুখি দাঁড় করাতেন। তিনি যদি অভ্যুত্থানকারী সেনা অফিসারদের রাজনৈতিক অংশীদার মনে করতেন, তাহলে তাদের ভূমিকা ও দায় নিয়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতেন। তিনি এর কোনোটাই করেননি। তিনি নিয়েছিলেন তৃতীয় পথ—দায়মুক্তি, ব্যবহার, দূরত্ব, এবং নিজের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ।
এই কারণে ১৫ আগস্টের সেনা অফিসারদের দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগের ভিত্তি আছে। তারা ঝুঁকি নিয়েছিল, তারা রাষ্ট্রের পুরোনো কাঠামো ভেঙেছিল, কিন্তু রাষ্ট্রের নতুন মালিকানা তাদের হাতে যায়নি। জিয়া তাদের বিচার করেননি—এটি সত্য। কিন্তু তিনি তাদের ন্যায়সংগত রাজনৈতিক মর্যাদাও দেননি। তিনি তাদের নিরাপদে সরিয়ে রেখে নিজে ক্ষমতার কাঠামো নির্মাণ করেছেন।
জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকেও ১৯৭৫ ছিল এক অপূর্ণ সম্ভাবনা। বাকশালের শ্বাসরোধ থেকে মুক্তির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনে রূপ নিল না। বহুদলীয়তার কিছু দরজা খোলা হলো, কিন্তু সেই দরজার ওপরে সামরিক শাসনের ছায়া রইল। জনগণের সার্বভৌমত্বের বদলে এল নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি। রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির বদলে এল দায়মুক্তির সংস্কৃতি।
অতএব, আমার মূল্যায়নে ১৯৭৫-এর প্রথম বিশ্বাসভঙ্গ ছিল এই: বাকশাল থেকে মুক্তির সম্ভাবনাকে জিয়াউর রহমান গণতান্ত্রিক উত্তরণে পরিণত করেননি; তিনি সেটিকে নিজের সামরিক-রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি বানিয়েছিলেন।
২. ১৯৯০: গণঅভ্যুত্থান, তিন জোটের রূপরেখা, এবং খালেদা জিয়ার অসম্পূর্ণ গণতন্ত্র
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল গণ-জাগরণ। এরশাদের সামরিক-স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ যে সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল, তার ফলেই স্বৈরাচারের পতন ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু এরশাদের পতনে নয়; এর আসল গুরুত্ব ছিল—বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।
এই সুযোগের ভিত্তি ছিল তিন জোটের রূপরেখা বা যৌথ ঘোষণা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট এবং বামপন্থী পাঁচদলীয় জোট—সবাই মিলে স্বৈরাচার-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই ঘোষণায় প্রতিনিধিত্বশীল সরকার, আইনের শাসন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, সার্বভৌম সংসদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার রক্ষা—এসব অঙ্গীকার ছিল। তিন জোট ১৯৯০ সালের ২০ নভেম্বর যৌথ ঘোষণা দেয় এবং এরশাদ পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর কী হলো?
খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেন। জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, বিএনপির নেতা, এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে তাঁর সামনে ছিল এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। তিনি চাইলে ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি বানাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
অনেকে বলেন, খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন—এটাই প্রমাণ করে যে বিএনপি তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নে আন্তরিক ছিল। এই কথাটি আংশিক সত্য, কিন্তু গভীরভাবে অসম্পূর্ণ। সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বিএনপি কি শুরু থেকেই সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে ছিল? বাস্তবতা তা বলে না।
বিএনপির ঐতিহাসিক প্রবণতা ছিল রাষ্ট্রপতি-শাসিত পদ্ধতির পক্ষে। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারই ছিল প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতা, সামরিক-প্রশাসনিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্রীকরণ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি প্রথমে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরতে আগ্রহী ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগের সংসদীয় পদ্ধতির দাবি জনমনে জনপ্রিয় ছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর রাষ্ট্রপতি-শাসিত পদ্ধতি অনেকের কাছে সামরিক কর্তৃত্বের স্মৃতি বহন করছিল। বিএনপি বুঝতে পারে, তারা যদি রাষ্ট্রপতি-শাসিত পদ্ধতির পক্ষে জেদ ধরে, তাহলে গণভোটে বা জনমতের আদালতে হেরে যেতে পারে।
গবেষণা-নথিতে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে, কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি; জামায়াতের ১৮ জন সংসদ সদস্যের সমর্থনে সরকার গঠন করতে হয়। একই সূত্রে বলা হয়েছে, দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরার আগে খালেদা জিয়ার প্রাথমিক অনীহা ছিল, কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপির নিজস্ব ব্যাকবেঞ্চার এবং রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের চাপের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত সম্মত হন। ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোটে সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন বিপুলভাবে অনুমোদিত হয়।
তাহলে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফেরা কি খালেদা জিয়ার মহৎ গণতান্ত্রিক আত্মসমর্পণ ছিল? না। এটি ছিল জনমত, বিরোধী চাপ, সাংবিধানিক বাস্তবতা এবং ক্ষমতা রক্ষার রাজনৈতিক হিসাবের ফল। তিনি সংসদীয় পদ্ধতিতে সম্মত হয়েছেন—এটা তাঁর কৃতিত্ব; কিন্তু এটিকে তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের পূর্ণ প্রমাণ বানানো ইতিহাসের সরলীকরণ।
কারণ তিন জোটের রূপরেখা শুধু সংসদীয় পদ্ধতি ছিল না। সেটি ছিল গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করার রূপরেখা। সেই রূপরেখা চাইছিল স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি। খালেদা জিয়ার সরকার এসবের কোনোটাকেই পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করেনি।
বরং যা হলো, তা হলো রাষ্ট্রপতি-কেন্দ্রিক ক্ষমতার বদলে প্রধানমন্ত্রী-কেন্দ্রিক ক্ষমতার জন্ম। একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো বদলালো না; শুধু কেন্দ্র বদলালো। রাষ্ট্রপতির জায়গায় প্রধানমন্ত্রী। সামরিক শাসনের জায়গায় দলীয় সরকার। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জায়গায় দলীয় আনুগত্য। জনগণের সার্বভৌমত্বের জায়গায় দলীয় ক্ষমতা।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে এটিই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বাসভঙ্গ।
খালেদা জিয়ার সরকার জনগণকে গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ রূপ দেয়নি; দিয়েছে গণতন্ত্রের ফর্ম। সংসদীয় পদ্ধতি ছিল, কিন্তু সংসদ কার্যকর হলো না। নির্বাচন হলো, কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর স্থায়ী আস্থা তৈরি হলো না। বিচার বিভাগ ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্ত হলো না। বিরোধী দল ছিল, কিন্তু বিরোধী দলের মর্যাদা রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির অংশ হলো না।
এর ফলে বাংলাদেশ ১৯৯০-এর পর সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে না গিয়ে পালাক্রমে ক্ষমতা ভোগের রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ রাজপথে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপি রাজপথে। গণঅভ্যুত্থানের রক্তে লেখা প্রতিশ্রুতি দলীয় ক্ষমতার দরকষাকষিতে হারিয়ে গেল।
আমার মূল্যায়নে, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বিশ্বাসভঙ্গ ছিল এই: খালেদা জিয়া তিন জোটের রূপরেখাকে পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসংস্কারের ভিত্তি বানাননি; তিনি শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ছাড় দিয়ে গণতন্ত্রের গভীর অঙ্গীকারকে অসম্পূর্ণ রেখে দেন।
৩. ২০২৪: জুলাই অভ্যুত্থান, জুলাই সনদ, এবং তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা
এবার আসি তৃতীয় অভ্যুত্থানে—২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান। আমার কাছে এই অংশটি সবচেয়ে ব্যক্তিগত, সবচেয়ে তাজা, এবং সবচেয়ে বেদনাদায়ক। কারণ এটি কোনো বইয়ের ইতিহাস নয়; এটি আমাদের সময়ের ইতিহাস। অনেক কিছু আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে। অনেক যোগাযোগ, অনেক প্রতিশ্রুতি, অনেক আস্থা—মিডিয়া জানুক বা না জানুক, আমরা যারা হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির বৃত্তে ছিলাম, আমরা জানি কে কী বলেছিল, কারা কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, কারা আন্দোলনের শক্তিকে নিজের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে দেখছিল।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন হলো। তিনি ভারতে পালিয়ে গেলেন। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ যে দমবন্ধ করা কর্তৃত্ববাদী শাসনের নিচে ছিল, সেই শাসনের পতনে ছাত্র-জনতা রক্ত দিল। এই অভ্যুত্থান বিএনপির একক আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল ছাত্রদের, তরুণদের, সাধারণ মানুষের, নাগরিক সমাজের, অসংখ্য নির্দলীয় মানুষের, নতুন রাজনৈতিক শক্তির, এবং রাষ্ট্রীয় অপমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জনগণের অভ্যুত্থান।
কিন্তু এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী কে হলো?
তারেক রহমান ও বিএনপি।
খালেদা জিয়া মুক্ত হলেন। তারেক রহমান লন্ডনের নির্বাসিত জীবন শেষ করে দেশে ফেরার সুযোগ পেলেন। বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে এল। রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা তাদের জন্য খুলে গেল। কিন্তু যে জুলাই অভ্যুত্থান তাদের এই সুযোগ দিল, সেই জুলাইয়ের সনদ, সেই রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার, সেই তরুণ প্রজন্মের রক্তের দাবি—ক্ষমতায় এসে তারেক রহমানের বিএনপি সেই দাবিকেই অস্বীকার করতে শুরু করল।
জুলাই সনদ ছিল ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের ন্যূনতম রূপরেখা। প্রায় সব দল এতে অংশ নেয়, গণভোট হয়, জনগণ সংস্কারের পক্ষে অবস্থান জানায়। কিন্তু নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েই বিএনপি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়ায়। সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তাদের আচরণ দেখিয়ে দিল—তারা সরকার গঠনের ম্যান্ডেট নিতে প্রস্তুত, কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট নিতে প্রস্তুত নয়।
সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো দ্বিতীয় শপথ না নেওয়া। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপি সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেয়নি। প্রথম আলো জানিয়েছে, সংসদ সচিবালয় দুই শপথের প্রস্তুতি রেখেছিল; জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুই শপথ নিলেও বিএনপি সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।
এটি কোনো ছোটখাটো প্রক্রিয়াগত আপত্তি নয়। এটি ছিল গণভোটের ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করার রাজনৈতিক মুহূর্ত। জনগণ শুধু সরকার গঠনের জন্য ভোট দেয়নি; তারা রাষ্ট্র সংস্কারের দিকেও ম্যান্ডেট দিয়েছিল। বিএনপি সরকার গঠনের ম্যান্ডেট গ্রহণ করল, কিন্তু ক্ষমতা সীমিতকারী সংস্কার-প্রক্রিয়ার ম্যান্ডেট থেকে সরে গেল। এটিই আমার কাছে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।
এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য সন্দেহকে আরও পরিষ্কার করে দেয়। যুগান্তরের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য এসেছে—“সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা না হতে দেয়, সেজন্য আমরা সব কিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি... নির্বাচনের স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলি নাই।”
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক অর্থ ভয়াবহ। এর অর্থ দাঁড়ায়, জুলাই সনদে স্বাক্ষর ছিল নীতিগত অঙ্গীকার নয়; ছিল নির্বাচনে পৌঁছানোর কৌশল। অর্থাৎ তারা জানত, জুলাই সনদকে অস্বীকার করলে তরুণ সমাজ, জুলাইয়ের শক্তি, সংস্কারপন্থী জনমত তাদের বিরুদ্ধে যাবে। তাই তারা সই করল। গণভোটে শেষ পর্যন্ত “হ্যাঁ”র আবহে গেল। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বলল—আমরা আসলে নির্বাচনের স্বার্থে আপস করেছিলাম।
এটি কি প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ নয়?
এটি কি জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা নয়?
এটি কি সেই একই পুরোনো কৌশল নয়—আগে আন্দোলনের ভাষা ধার করো, পরে ক্ষমতায় গিয়ে ভাষার অর্থ বদলে দাও?
আমার কাছে তারেক রহমানকে benefit of doubt দেওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এই বিশ্বাসঘাতকতা শুধু মিডিয়ার রিপোর্টে ধরা পড়া বিষয় নয়; আন্দোলনের প্রথম বৃত্তে যারা ছিল, আমরা জানি কেমন যোগাযোগ ছিল, কী ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে আন্দোলনের শক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। মিডিয়া সব জানে না। ইতিহাসের অনেক কিছু সংবাদপত্রে লেখা থাকে না। কিন্তু যারা ঘটনার ভেতরে থাকে, তারা নীরব প্রতারণার শব্দ শুনতে পায়।
তারেক রহমানের বিশ্বাসঘাতকতা শুধু জুলাই সনদে সীমাবদ্ধ নয়। এখন দেখা যাচ্ছে, তিনি ও তাঁর দল জুলাইয়ের শক্তিকেই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ওপর ঝিনাইদহে হামলার অভিযোগ এসেছে ছাত্রদল-যুবদলের বিরুদ্ধে। প্রথম আলো জানিয়েছে, ঝিনাইদহ পৌর কালেক্টরেট জামে মসজিদের সামনে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে; তাঁর ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদল-যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের উপস্থিতিতে ডিম, ইট-পাটকেল ও হকিস্টিক দিয়ে হামলার অভিযোগ করা হয়।
এরপর তারেক রেজাকে গ্রেপ্তার করা হলো। তিনি শুধু একজন এনসিপি নেতা নন; জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতীকী চরিত্র। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে নিহতদের মাগফেরাত কামনায় গায়েবানা জানাজায় তিনি ইমামতি করেছিলেন—এই পরিচয় তাঁকে জুলাইয়ের নৈতিক স্মৃতির অংশ করে তুলেছে। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস জানিয়েছে, ছাত্রদলের মামলায় গ্রেপ্তারের পর তাঁর ইমামতির ছবি আবার আলোচনায় আসে।
অর্থাৎ, যারা জুলাইয়ের শহীদদের জানাজা পড়িয়েছে, যারা জুলাইয়ের রক্তের স্মৃতি বহন করছে, যারা হাসিনার পতনের আন্দোলনের অংশ ছিল—ক্ষমতায় এসে তাদের ওপরই হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি শুরু হচ্ছে। এটাই তো হাসিনা মডেল। আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অবৈধ করো, তারপর দলীয় ক্যাডার দিয়ে হামলা করো, তারপর রাষ্ট্রীয় যন্ত্র দিয়ে মামলা দাও, তারপর বলো—আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই বিপজ্জনক প্রবণতাকে আরও পরিষ্কার করেছে। তিনি জামায়াতকে “রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি নির্মূল” করার আহ্বান জানিয়েছেন বলে আমার বার্তা ও নয়া দিগন্ত—দুই সংবাদমাধ্যমেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে হারানোর কথা বলা যায়। নীতিগতভাবে পরাজিত করার কথা বলা যায়। নির্বাচনে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলা যায়। কিন্তু “নির্মূল” শব্দ গণতান্ত্রিক শব্দ নয়। এটি ফ্যাসিবাদী মানসিকতার শব্দ। নেতা হয়তো বলবেন “রাজনৈতিকভাবে নির্মূল”; কিন্তু মাঠের ক্যাডার শুনবে—ওদের দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না। এই ভাষা থেকেই হামলার সংস্কৃতি জন্ম নেয়। এই ভাষা থেকেই মামলা-গ্রেপ্তারকে নৈতিক অনুমতি দেওয়া হয়। এই ভাষা থেকেই রাষ্ট্রদলীয় সহিংসতা জন্ম নেয়।
এখানে বিএনপি দ্রুত হাসিনার পথ অনুসরণ করছে—এ কথা বলা আর অতিরঞ্জন নয়। হ্যাঁ, তারা এখনো হাসিনা আমলের মতো পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছে—এ কথা বলা হয়তো সময়ের আগে হয়ে যাবে। কিন্তু তারা যে পথে হাঁটছে, সেই পথের দিকনির্দেশ স্পষ্ট। জুলাই সনদ থেকে সরে যাওয়া, দ্বিতীয় শপথ না নেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূলযোগ্য হিসেবে ভাষায় আনা, এনসিপি নেতৃত্বের ওপর হামলার অভিযোগ, তারেক রেজার গ্রেপ্তার, সারা দেশে দলীয় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগ—এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একসঙ্গে একটি রাজনৈতিক চরিত্র তৈরি করছে।
এই চরিত্রের নাম—ক্ষমতায় এসে মুক্তিদাতাদের শত্রু ভাবা।
৪. তিন প্রজন্ম, একই প্যাটার্ন
এখন তিনটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে ছবিটি অত্যন্ত স্পষ্ট।
১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমান ১৫ আগস্টের সরাসরি ঘোষিত নেতা না হলেও সেই অভ্যুত্থানের বড় সুবিধাভোগী হন। বাকশাল থেকে মুক্তির সম্ভাবনা গণতান্ত্রিক উত্তরণে না গিয়ে সামরিক-রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পথে যায়। যারা অভ্যুত্থানের নেপথ্যে ছিল, তাদের তিনি বিচারও করেননি, প্রকৃত অংশীদারও করেননি; রক্ষা করেছেন, ব্যবহার করেছেন, দূরে সরিয়েছেন।
১৯৯০ সালে খালেদা জিয়া গণঅভ্যুত্থানের ফল ভোগ করে ক্ষমতায় আসেন। তিন জোটের রূপরেখা ছিল গণতন্ত্রের গভীর অঙ্গীকার। কিন্তু তিনি রূপরেখাকে পূর্ণ রাষ্ট্রসংস্কারের ভিত্তি বানাননি। সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরেছেন, কিন্তু তা ছিল চাপের মুখে কৌশলগত ছাড়। গণতন্ত্রের ফর্ম এসেছে, কিন্তু গণতন্ত্রের আত্মা আসেনি।
২০২৪ সালে তারেক রহমান জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হন। হাসিনার পতন, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিজের দেশে ফেরা, বিএনপির ক্ষমতায় আসা—সবকিছু জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তিনি জুলাই সনদের বাস্তবায়ন থেকে সরে যান, দ্বিতীয় শপথ নেন না, সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেন, এবং জুলাইয়ের শক্তিকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দমন করতে শুরু করেন।
এই তিনটি ঘটনা আলাদা নয়। এগুলো জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের তিনটি অধ্যায়।
প্রথম অধ্যায়: জিয়া—অভ্যুত্থানের সুবিধা, কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণের অসম্পূর্ণতা।
দ্বিতীয় অধ্যায়: খালেদা—গণঅভ্যুত্থানের সুবিধা, কিন্তু তিন জোটের রূপরেখার অপূর্ণতা।
তৃতীয় অধ্যায়: তারেক—জুলাই অভ্যুত্থানের সুবিধা, কিন্তু জুলাই সনদের প্রত্যক্ষ অস্বীকার।
এই ধারাবাহিকতাকে আমি কাকতালীয় বলতে রাজি নই। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এটি ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের পারিবারিক-দলীয় মনস্তত্ত্ব। তারা আন্দোলনের সময়ে গণতন্ত্রের ভাষা নেয়, ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে। তারা জনগণের রক্তের ওপর উঠে দাঁড়ায়, তারপর জনগণের অঙ্গীকারকে “বাস্তবতা”, “প্রক্রিয়া”, “সংবিধান”, “কৌশল”, “নির্বাচনের স্বার্থ”—এসব শব্দে আটকে দেয়।
৫. জনগণ দরজা খোলে, জিয়া পরিবার ঘরে ঢোকে
বাংলাদেশের এই তিন অভ্যুত্থানের সবচেয়ে করুণ শিক্ষা হলো—যারা দরজা ভাঙে, তারা ঘরে ঢোকার অধিকার পায় না; যারা ঘরে ঢোকে, তারা দরজা ভাঙা মানুষদের ভুলে যায়।
১৯৭৫-এ বাকশালবিরোধী ক্ষোভ দরজা খুলেছিল; জিয়া ঘরে ঢুকেছিলেন।
১৯৯০-এ ছাত্র-জনতার আন্দোলন দরজা খুলেছিল; খালেদা ঘরে ঢুকেছিলেন।
২০২৪-এ জুলাইয়ের তরুণরা রক্ত দিয়ে দরজা খুলেছিল; তারেক রহমান ঘরে ঢুকেছেন।
তারপর তিনবারই সেই দরজা বন্ধ হয়েছে সাধারণ মানুষের মুখের ওপর।
এই ইতিহাস শুধু জিয়া পরিবারের নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক শ্রেণিরও ব্যর্থতা। আওয়ামী লীগও এই ব্যর্থতার অংশ। তারা গণতন্ত্রের ভাষায় ক্ষমতায় এসে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বানিয়েছে। কিন্তু এই লেখার আলোচ্য হলো জিয়া পরিবার, কারণ তিনটি অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় তাদের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা বারবার ইতিহাসের মোড়ে সুবিধাভোগী হয়েছে, কিন্তু বারবার গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার ভেঙেছে।
তাই আমার কাছে “জিয়া পরিবার গণতন্ত্রের ধারক”—এই ন্যারেটিভ ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না। বরং ইতিহাস বলছে, জিয়া পরিবার গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ভাষা ব্যবহার করেছে, কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় রূপ দিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে—এবং বর্তমান তারেক রহমানের ক্ষেত্রে তা আর শুধু ব্যর্থতা নয়; এটি সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।
৬. তারেক রহমান: benefit of doubt নয়, বর্তমান কর্মকাণ্ডের বিচার
অনেকে বলবেন—তারেক রহমানের সরকার তো মাত্র কয়েক মাসের। এখনই চূড়ান্ত রায় কেন? আমি এই যুক্তি বুঝি। কিন্তু রাজনীতিতে সব রায় সময়ের দৈর্ঘ্যে হয় না; কিছু রায় হয় প্রথম সিদ্ধান্তের চরিত্র দেখে। Morning shows the day—সকালের আলোই দিনের চরিত্রের ইশারা দেয়।
তারেক রহমান ক্ষমতায় এসে কী করলেন?
তিনি কি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সময়সূচি দিলেন?
না।
তিনি কি দ্বিতীয় শপথ নিয়ে সংস্কার পরিষদকে কার্যকর করলেন?
না।
তিনি কি বললেন—জুলাইয়ের রক্তের প্রতি আমরা বাধ্য?
না।
বরং তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, নির্বাচনের স্বার্থে তারা সনদে আপস করে সই করেছিলেন। তাঁর দলের মহাসচিব প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলকে “রাজনৈতিকভাবে নির্মূল” করার ভাষা ব্যবহার করলেন। মাঠে এনসিপি নেতার ওপর হামলার অভিযোগ উঠল। জুলাইয়ের গায়েবানা জানাজার ইমাম তারেক রেজা ছাত্রদলের মামলায় গ্রেপ্তার হলেন।
এইসবের পরও যদি কেউ বলে—অপেক্ষা করুন, benefit of doubt দিন—তাহলে আমি বলবো, বাংলাদেশের জনগণ benefit of doubt দিতে দিতে বহুবার প্রতারিত হয়েছে। ১৯৯০-এর পরও মানুষ অপেক্ষা করেছিল। ফল কী হয়েছিল? গণতন্ত্র শক্ত হয়নি; দলীয় রাষ্ট্র শক্ত হয়েছিল। ২০২৪-এর পর আবার যদি আমরা অপেক্ষা করি, তাহলে জুলাইয়ের রক্তও হয়তো পোস্টার, দিবস, বক্তৃতা আর স্মৃতিচারণের মধ্যে বন্দি হয়ে যাবে।
আমার অবস্থান পরিষ্কার: তারেক রহমানকে আমি benefit of doubt দিই না। কারণ তাঁর বর্তমান কর্মকাণ্ডই তাঁকে মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট। তিনি জুলাইয়ের শক্তির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি জুলাই সনদের নৈতিক অঙ্গীকার ভেঙেছেন। তিনি ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে ক্ষমতা সংরক্ষণের রাজনীতি শুরু করেছেন। আর যদি এই পথ চলতে থাকে, তাহলে তিনি শুধু জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার অসম্পূর্ণ উত্তরাধিকার বহন করবেন না; তিনি হাসিনার ফ্যাসিবাদী পদ্ধতির নতুন সংস্করণ হয়ে উঠবেন।
৭. নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাস জানা দরকার। কারণ ইতিহাস ভুলে গেলে প্রতিটি প্রজন্ম নতুন করে প্রতারিত হয়।
তাদের জানা দরকার—অভ্যুত্থান মানেই মুক্তি নয়। স্বৈরাচার পতন মানেই গণতন্ত্র নয়। একটি সরকার পড়ে গেলে রাষ্ট্র বদলায় না; রাষ্ট্র বদলাতে হলে ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে হয়। আর ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে হলে যারা ক্ষমতায় আসে তাদের ক্ষমতা সীমিত করতে হয়। যে দল নিজের ক্ষমতা সীমিত করতে রাজি নয়, সে দল যতই গণতন্ত্রের ভাষা বলুক, শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের বীজ বহন করে।
১৯৭৫ শেখায়—একদলীয় শাসন ভাঙলেও যদি সামরিক ক্ষমতা আসে, গণতন্ত্র আসে না।
১৯৯০ শেখায়—স্বৈরাচার পতনের পর যদি রূপরেখা বাস্তবায়িত না হয়, গণতন্ত্র কাগজে থাকে, রাষ্ট্রে নয়।
২০২৪ শেখাচ্ছে—ফ্যাসিবাদ পতনের পর যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে নতুন ক্ষমতা পুরোনো ফ্যাসিবাদের ভাষা শিখে নেয়।
নতুন প্রজন্মকে আরও একটি কথা জানা দরকার: রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের সময়ে জনগণের সঙ্গে থাকে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে জনগণের ওপর দাঁড়াতে চায়। তাই শুধু আন্দোলন করলেই হবে না; আন্দোলনের পর চুক্তি, সনদ, প্রতিষ্ঠান, সময়সীমা, জবাবদিহি—এসব বাধ্যতামূলক করতে হবে। নইলে অভ্যুত্থানকারীরা ইতিহাসের ফুটনোট হয়ে যায়, আর সুবিধাভোগীরা রাষ্ট্রের মালিক হয়।
উপসংহার: তিনটি অভ্যুত্থান, তিনটি বিশ্বাসভঙ্গ
বাংলাদেশের তিনটি বড় অভ্যুত্থানের দিকে তাকালে আমি একটি নির্মম ধারাবাহিকতা দেখি।
১৯৭৫ সালে বাকশাল-পরবর্তী মুক্তির সম্ভাবনা জিয়ার হাতে সামরিক-রাজনৈতিক ক্ষমতায় বন্দি হলো।
১৯৯০ সালে গণতান্ত্রিক রূপরেখা খালেদা জিয়ার হাতে অসম্পূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ হলো।
২০২৪ সালে জুলাই সনদ তারেক রহমানের হাতে নির্বাচনী কৌশলের কাগজে পরিণত হলো।
তিনবারই জনগণ বা বিদ্রোহী শক্তি ইতিহাসের দরজা খুলেছে।
তিনবারই জিয়া পরিবার সেই দরজা দিয়ে ক্ষমতার ঘরে ঢুকেছে।
তিনবারই গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার ভেঙেছে।
তাই এই ইতিহাসকে আমি শুধু ঘটনাপঞ্জি হিসেবে দেখি না। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতারণার ধারাবাহিকতা। এটি দেখায়, ক্ষমতাসীন পরিবার ও দলগুলো জনগণের রক্তকে ব্যবহার করে, কিন্তু জনগণের অঙ্গীকারকে ভয় পায়। কারণ সত্যিকারের গণতন্ত্র মানে ক্ষমতা ভাগ করা, ক্ষমতা সীমিত করা, জবাবদিহির সামনে দাঁড়ানো। জিয়া পরিবার তিনবারই সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
আর তারেক রহমানের ক্ষেত্রে আমি ব্যর্থতা শব্দটিও যথেষ্ট মনে করি না। কারণ তিনি পূর্বের ইতিহাস জানতেন। তিনি ১৯৭৫ ও ১৯৯০-এর শিক্ষা জানতেন। তিনি জানতেন জুলাই অভ্যুত্থান কেবল সরকার বদলের আন্দোলন ছিল না; এটি রাষ্ট্র বদলের আন্দোলন ছিল। তারপরও তিনি ক্ষমতায় এসে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন থেকে সরে গেছেন, দ্বিতীয় শপথ নেননি, সংস্কার প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করেছেন, এবং জুলাইয়ের শক্তির ওপরই রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছেন।
এটি ভুল নয়।
এটি দুর্ঘটনা নয়।
এটি কৌশল নয়।
এটি বিশ্বাসঘাতকতা।
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান—অভ্যুত্থানের স্মৃতি শুধু আবেগ দিয়ে রক্ষা করা যায় না। রক্ষা করতে হয় রাজনৈতিক সতর্কতা দিয়ে। যারা আন্দোলনের সময় আপনার পাশে দাঁড়ায়, ক্ষমতায় গিয়ে তারা আপনার বিপক্ষে দাঁড়াতে পারে। যারা আপনার রক্তের কথা বলে, তারা আপনার সনদ ছিঁড়ে ফেলতে পারে। যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ভাষণ দেয়, তারা ক্ষমতায় গিয়ে একই ফ্যাসিবাদের কৌশল ধার করতে পারে।
তাই ইতিহাস মনে রাখুন।
১৯৭৫ ভুলবেন না।
১৯৯০ ভুলবেন না।
২০২৪ ভুলবেন না।
কারণ বাংলাদেশের তিনটি অভ্যুত্থানের ইতিহাস আমাদের শেখায়—স্বৈরাচার পতন করাই যথেষ্ট নয়; স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীদেরও চিনতে হয়। আর জিয়া পরিবারের ইতিহাস সেই কঠিন সত্যের এক নির্মম দলিল: তারা তিনবার অভ্যুত্থানের সুবিধা নিয়েছে, তিনবারই মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
মইনুল হক
ডেট্রয়েট, মিশিগান।