Image description

টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় মিলেছে। কাজ শেষে হতাহতরা ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘুমন্ত অবস্থায় চালক ব্রেক কষার ফলেই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। ভাড়া বাঁচাতেই জীবন বিলিয়ে দেয় তারা। নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।

তারা হলেন- নওগাঁর মান্দা উপজেলার সাকিম মিয়ার ছেলে মো. সাগর মিয়া (২০), একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), রাজশাহীর তানোর উপজেলার আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১৯), নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার সাইদুলের ছেলে সারিকুল (২৫), নওগাঁর মান্দা উপজেলার আব্দুর রশিদের ছেলে মো. বারী (২১), একই উপজেলার আব্দুর রহিমের ছেলে বাদশা (৩২), নওগাঁর পাকুরিয়া গ্রামের রশিদের ছেলে গিয়াস (২০), একই এলাকার রশিদের ছেলে মাইনুল (২৮), রাজেন্দ্রবাটি এলাকার একাব্বর আলীর ছেলে ইয়াকুব, একই এলাকার সুলতানের ছেলে তারেক (২০), নাটোররে লালপুর উপজলোর ইব্রাহীম মোল্লার ছেলে আলাল মোল্লা (২৭) কুষ্টিয়া দৌলতপুর উপজলোর হবিবুর প্রামাণিকের ছেলে হাসান আলী (২৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল (৬০) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মামুন (৪৫)। বাকি একজনের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। আহতরা হলেনÑ নওগাঁর মান্দা উপজেলার মজিবরের ছেলে বাবু (৩৫), একই উপজেলার আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুল রহমান (৩৫), নাটোরের নয়ন বিশ্বাস (৩২), দশপাড়া গ্রামের নজরুলের ছেলে তুহিন, মান্দা উপজেলার সফেদ আলীর ছেলে আলমগীর (৪০), একই উপজেলার সোরহাব আলীর ছেলে সিদ্দিক আলী (৪০), মৃত সাহেব আলীর ছেলে খোরশেদ (২৬), শহিদুলের ছেলে সমেজ।

ট্রাকের যাত্রী ও স্থানীয়রা জানান, ট্রাকটিতে চট্টগ্রামের অলংকার থেকে বেশ কয়েকজন যাত্রী কম ভাড়ায় নওগাঁর মান্দা উপজেলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরে ফেনী থেকে আরও বেশ কয়েকজন ওঠেন। ভোর ৪টার দিকে ট্রাকটি ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের জোগারচর এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি উল্টে যায়। এতে রড ও ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। পরে পুলিশ সদস্যরা ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহত ও নিহতের উদ্ধার করেন। রবান্নী নামে এক যাত্রী জানান, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ করেই দেখি ট্রাকটি উল্টে গেছে। এরপর আর কিছুই বলতে পারবো না। আমরা ট্রাকে ২২ জন যাত্রী ছিলাম।

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ভোরের দিকে আমরা হঠাৎ করে বিকট আওয়াজ শুনতে পাই। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ট্রাক উল্টে পড়ে আছে। আমরা তড়িঘড়ি করে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও রডের নিচে যারা পড়েছিলেন তারা ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ বিষয়ে যমুনা সেতু পূর্ব থানার এসআই আব্দুল হান্নান বলেন, ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে। মূলত চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাকটি উল্টে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান বলেন, হাসপাতালে ১৫ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। এ ছাড়া আহত অবস্থায় ৯ জন ভর্তি হন। এদের মধ্যে ৫ জন ছুটি নিয়ে চলে যায়। এ ছাড়া মুমূর্ষু অবস্থায় ৪ জন ভর্তি রয়েছেন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদিকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা দেবেন বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন

 

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে নিহতের মধ্যে ১০ জনের নাম ও পরিচয় শনাক্ত হওয়া গেছে। তারা সবাই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই সাতজন রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা সবাই ফেরিওয়ালা ছিলেন। তারা সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। পাশাপাশি নারীদের চুল ও পুরনো মোবাইল ফোন সংগ্রহের কাজও করতেন। জীবিকার তাগিদে তারা দীর্ঘদিন ধরে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে ভাড়া বাসায় থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তারা রাজশাহীগামী একটি রডবোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। একই সময়ে সাতজনের মৃত্যুর খবরে ভারশোঁ ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি ও বুকফাটা কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে।

দুর্ঘটনায় নিহত রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের নিহত ফেরিওয়ালা আব্দুল বারিকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্ত্রী বারিকের মা ও স্ত্রী অবিরাম কেঁদে চলেছেন সঙ্গে তাদের বুকফাটা আর্তনাদ। তাদের কান্না দেখে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। মাত্র এক বছর আগে বিয়ে হয় বারিক-মারুফার। মারুফা (২০) বলেন, গতকাল বিকালে সবশেষ তার স্বামীর সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। এরপর কোনো যোগাযোগ হয়নি। সকালে জানতে পারেন স্বামী মারা গেছেন।

মান্দা থানার ওসি খোরশেদ আলম বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত সবার পরিচয় এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে পুলিশ। মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী বলেন, আমরা নিহত স্বজনদের খোঁজখবর রাখছি। তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের প্রতি পরিবারে নগদ ২৫ হাজার টাকা, শুকনো খাবার বিতরণের ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ছাড়া মরদেহ দাফনসহ নিহতদের পরিবারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার কথা বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী। তবে মরদেহগুলো বাড়িতে না আসায় তাদের জানাজা আজ (মঙ্গলবার) সকালে হতে পারে বলেও জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার আখতার জাহান সাথী।