Image description

সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই প্রথম ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে চারটিতে খ্রিস্টান মুখ্যমন্ত্রী শাসনভার পরিচালনা করছেন৷ তামিলনাড়ুতে জোসেফ বিজয়, মিজোরামে লালডুহোমা, নাগাল্যান্ডে নেফিউ রিও, মেঘালয়ে মুখ্যমন্ত্রী কনরাম সাংমা। ভারতের রাজনৈতিক আঙিনায় সংখ্যাগুরু বাদে অন্য কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য এটিকে আপাতদৃষ্টিতে একটি বড় অর্জন মনে হতেই পারে। তবে এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে উল্লাস করার মতো তেমন কোনো রসদ খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়—মুসলিমদের মধ্য থেকে আজ ভারতের কোনো রাজ্যেই একজনও মুখ্যমন্ত্রী নেই। শুধু রাজ্যস্তরেই নয়, নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ৭২ সদস্যের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদেও কোনো মুসলিম মুখ নেই। ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের সবাই হিন্দু বা জৈন সম্প্রদায়ের। রাষ্ট্রমন্ত্রী বা জুনিয়র মিনিস্টার হিসেবে কেবল দুজন শিখ, দুজন বৌদ্ধ এবং একজন খ্রিস্টান স্থান পেয়েছেন। জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে অটল বিহারী বাজপেয়ী—ভারতের ইতিহাসের বিগত সব প্রধানমন্ত্রীর সরকারেই প্রভাবশালী মুসলিম মন্ত্রীদের দেখা গেছে, যারা শিক্ষা বা পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সামলেছেন। এমনকি জাকির হুসাইন এবং ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের মতো ব্যক্তিত্বরা দেশের রাষ্ট্রপতির আসনও অলঙ্কৃত করেছেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বর্তমান ভারতের মানচিত্রে পঞ্জাবে একজন শিখ মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। আর তামিলনাড়ুসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের মিজোরাম, মেঘালয় এবং নাগাল্যান্ডে খ্রিস্টান মুখ্যমন্ত্রীরা দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু ভারতের মূল ভূখণ্ড, বিশেষ করে বিশাল গাঙ্গেয় ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা কিংবা মধ্য ভারতের হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোতে সংখ্যালঘুদের এই প্রতিনিধিত্ব একেবারেই অদৃশ্য। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি মুসলিম এবং ২ কোটি ৮০ লাখ খ্রিস্টান ভোটার ও করদাতা হিসেবে সমান ভূমিকা পালন করলেও, নীতিনির্ধারণী পর্যায়, আইনসভা বা রাজভবনগুলোতে তাদের উপস্থিতি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। জাতীয়ভাবে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৪.২ থেকে ১৫ শতাংশ এবং খ্রিস্টান জনসংখ্যা ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ছয়জন ভারতীয়ের মধ্যে একজন সংখ্যালঘু। তা সত্ত্বেও, ২০২৪ সালে নির্বাচিত অষ্টাদশ লোকসভায় ৫৪৩ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে মাত্র ২৪ জন মুসলিম, যা শতাংশের হিসেবে মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৫২ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন মুসলিম প্রতিনিধিত্বের রেকর্ড। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একজনও মুসলিম সাংসদ নেই। খ্রিস্টানদের প্রতিনিধিত্বও ভৌগোলিক মানচিত্রে কেবল উত্তর-পূর্ব ভারত এবং দক্ষিণের কয়েকটি রাজ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

কেরালার মতো রাজ্যে যেখানে খ্রিস্টানদের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত রয়েছে, সেখানে ১৪০ আসনের বিধানসভায় সব দল মিলিয়ে ৩৪ জন খ্রিস্টান এবং জনসংখ্যার অনুপাতে ৩৫ জন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু আসল বিপর্যয় দৃশ্যমান উত্তর ভারতে। ভারতের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার রাজ্য উত্তর প্রদেশে (যেখানে ৪০ কোটি মানুষের ১৯ শতাংশের বেশি মুসলিম), ২০২২ সালের নির্বাচনে ৪০৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ৩৪ জন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হতে পেরেছেন, যা তাদের জনসংখ্যার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। যোগী আদিত্যনাথের সরকারে কোনো মুসলিম মন্ত্রী নেই। বিহারে ২০১৫ এবং ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ১১ জনে ঠেকেছে। ২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভায় ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ২০২ জন বিধায়কের মধ্যে কোনো মুসলিম মুখ নেই। মধ্যপ্রদেশের ২৩০ আসনের বিধানসভায় বিজেপির বিশাল জয়ের পর সেখানে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা মাত্র দুইজনে এসে ঠেকেছে।

সংখ্যালঘুদের এই রাজনৈতিক প্রান্তিককরণের জন্য কেবল ডানপন্থী বা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে দায়ী করলে সম্পূর্ণ সত্য আড়াল হয়ে যাবে। ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিদার বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও এক্ষেত্রে কম হতাশাজনক নয়। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ধর্মনিরপেক্ষ ‘ইন্ডিয়া’ জোট মাত্র ৭৮ জন মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছিল, যা ২০১৯ সালের তুলনায় অনেক কম। উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টি মাত্র চারজন মুসলিমকে প্রার্থী করেছিল। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলোতে কংগ্রেস মুসলিম প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো মুসলিমদের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করতে মুখিয়ে থাকলেও, ‘তোষণ’-এর তকমা পাওয়ার ভয়ে এবং হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কায় মুসলিমদের নেতৃত্ব দিতে দ্বিধাবোধ করছে। পশ্চিমবঙ্গ এর একটি ব্যতিক্রমী আঞ্চলিক উদাহরণ ছিল, যেখানে বিধানসভায় ৪০ জন মুসলিম বিধায়ক ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপি সেখানে ক্ষমতা দখল করার পর সেই সমীকরণও বদলে গেছে।

২০০৬ সালের বিচারপতি রাজিন্দর সাচার কমিটির রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে, মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনগ্রসরতার সাথে সরাসরি জড়িত। আজ দুই দশক পর সেই ব্যবধান আরও প্রকট রূপ ধারণ করেছে। আইনসভায় বা মন্ত্রী পরিষদে সংখ্যালঘুদের পক্ষে কথা বলার মতো বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের অভাবের কারণে তাদের কল্যাণের জন্য বরাদ্দ কমছে। একই সাথে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বুলডোজার সংস্কৃতি, ধর্মান্তরবিরোধী কঠোর আইন এবং এনজিওগুলোর ওপর বিদেশি অনুদানের বিধিনিষেধের মতো পদক্ষেপগুলো প্রতিরোধহীনভাবে কার্যকর হচ্ছে। ১৯৮০ সাল থেকে সংসদে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ১০% থেকে কমে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে, অথচ এই সময়ে তাদের জনসংখ্যা বেড়েছে। গণতান্ত্রিক আদর্শ অনুযায়ী সংসদে যেখানে অন্তত ৭৫ থেকে ৮০ জন মুসলিম সাংসদ থাকা উচিত ছিল, সেখানে আছেন মাত্র ২৪ জন।

বিশ্বজুড়ে যেকোনো সফল গণতন্ত্রের মূল শর্ত হলো আইনসভা যেন সেই দেশের বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটায়। তা না হলে নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়াই বিকৃত হয়ে পড়ে। ২৮টি রাজ্যের একটিতেও কোনো মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী না থাকা এবং কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেটে কোনো মুসলিম মন্ত্রী না থাকা ভারতের মতো এক বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের জন্য বৈধতার সংকট তৈরি করে। গণমাধ্যম ও বিরোধী দলগুলোর নীরবতা এই বঞ্চনাকে আরও স্বাভাবিক করে তুলছে। ক্ষমতার টেবিলে সংখ্যালঘুদের জন্য ন্যায্য আসন নিশ্চিত না করা গেলে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কেবল একটি ফাঁকা স্লোগান এবং ‘গণতন্ত্র’ সংখ্যাগুরুর একাধিপত্যের মোড়ক মাত্র হয়ে থাকবে।