Image description
টিসিবি’র ট্রাকের পেছনে মধ্যবিত্তরাও

বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা। বাংলামোটর মোড়ে টিসিবি’র ট্রাকের পেছনে শতাধিক নারী-পুরুষের জটলা। লাইন বললে ভুল হবে। কারণ লাইন মানে কয়জনে। তবু জটিল এ লাইন থেকে কিছুটা দূরে হতাশ আর ক্ষোভে দাঁড়িয়ে মধ্যবয়সি রোজিনা বেগম (ছদ্মনাম)। সঙ্গে থাকা সহকর্মী ফটো সাংবাদিক ক্যামেরার লেন্স তাক করতেই হাতের আড়ালে মুখ ঢাকেন তিনি। নিচুস্বরে বলে ওঠেন ‘প্লিজ, ছবি তুলবেন না।’

মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত। ছবি স্টপ। এরপর প্রতিবেদককে তিনি যা বলছেন, তা রীতিমতো স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। তার মতো মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের লোকজনও কেন এখন টিসিবি’র লাইনে। এমন প্রশ্নের উত্তরে চোখে পানি ছলছল। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘ভাই সবকিছুর দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে আর কুলিয়ে উঠতে পারছি না। বলতে পারেন-দিশেহারা। স্বামী নির্ধারিত বেতনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। কিন্তু বেতন তো বাড়ছে না। বাসা ভাড়া দিয়ে যা থাকে, তা দিয়ে বাচ্চাদের লেখাপড়ার খরচই সামাল দেওয়া কঠিন। বাজার তো পরের কথা। এর বেশি আর বলতে পারছি না।

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে রোজিনার সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে থেকে আরেক নারী বলেন, আজিমপুর থেকে অটোরিকশায় তারা চারজন এসেছেন। ভাড়া ৪০ টাকা। ফিরে যেতে আরও ৪০ টাকা লাগবে। ভাড়া বাবদ খরচ একেকজনের ভাগে ২০ টাকা। কিন্তু এরপরও টিসিবি’র ৪৮০ টাকার প্যাকেজে (২ লিটার তেল, ১ কেজি চিনি এবং ২ কেজি ডাল) অন্তত ১৫০ টাকার মতো বাঁচে। তিনি বলেন, ‘এ টাকা বাঁচাইয়া বাচ্চাগুলার জন্য কয়টা ডিম কিনব।’ তিনি বলেন, ‘যেহেতু পরিচয় প্রকাশ করবেন না, তাই বলছি-একবার ভাবেন, আমরা কত কষ্টে দিন পার করছি। এভাবে টাকা বাঁচিয়ে আমাদের ডিমও কিনতে হয়।’

দেখা যায়, লাইনে নারীদের সংখ্যাই বেশি। তাদের বড় অংশই নিুবিত্ত এবং বস্তিবাসী। প্রচণ্ড গরমে গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছেন সবাই। কে কার আগে নিতে পারবেন টিসিবি’র পণ্য। এটাই প্রতিযোগিতা। এজন্য পণ্য পাওয়া নিয়ে ঠেলাঠেলি বেশি। সঙ্গে চিৎকার, চেঁচামেচি তো আছেই। এক কথায়, কষ্টের কোনো শেষ নেই। এর মধ্যে পড়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের নতুন মুখগুলো কিছুটা বিব্রত।

কাঁঠালবাগান এলাকার জনৈক নাসিরুল্লাহর বস্তিতে থাকেন জুলেখা বেগম। তিনি তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে কোলে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে। এভাবে সন্তান কোলে ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে তার হিমশিম অবস্থা।

এ সময় জুলেখা বেগম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘দ্যাখেন লাইন কিন্তু কমতাছে না। একেকজন তিন-চারবার কইরা নিতাছে। যান গিয়া দ্যাখেন। ওই সামনের গলিতে ব্যাগ লুকাইয়া রাখতাছে। সরকারের নিয়মকানুনের আদৌ কোনো ঠিক নাই।’

এমন অভিযোগ শুনে কয়েকজন নারীকে তাৎক্ষণিক লাইন থেকে বের করে দেন ট্রাকের বিক্রয়কর্মীরা। কিন্তু তারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে পণ্য দেওয়ার অনুরোধ করেন। ভুল স্বীকার করে এক বৃদ্ধা হাত জোড় করে বলেন, ‘আইজক্যার মতো দিয়া দ্যান স্যার। আর আসুম না। কী করুম কন, অভাব তো।’ দেখা যায়, পণ্য বিতরণে অনিয়ম রোধে ক্রেতাদের আঙুলে কালি লাগিয়ে দেওয়ার নিয়ম সেভাবে কাজে আসছে না। পণ্য পাওয়ার পরও ফের কালি মুছে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন অনেকে।

বিটিসিএল (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি) এর পরিচয়পত্র গলায় এক সরকারি কর্মচারী দাঁড়িয়েছেন লাইনের শেষদিকে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের দাম অনেক। টিসিবি’র ট্রাক থেকে কিনলে কিছুটা সাশ্রয় হয়। সুযোগমতো আফিসের আশপাশে টিসিবি’র ট্রাক দেখলে তিনি মাঝে মধ্যে দাঁড়িয়ে যান।

লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে দেখে পাশ থেকে গুটি গুটি পায়ে প্রতিবেদকের কাছে এসে দাঁড়ান গৃহবধূ ইয়াসমিন বেগম। সঙ্গে তার ৩ বছরের ছেলে আলামিন। নিচু স্বরে তিনি বলেন, ‘ভাই আর বেশিক্ষণ তো এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। আমি গর্ভবতী। শরীর কাঁপছে। মাথা ঘুরছে। মনে হচ্ছে পড়ে যাব।’ তার এমন অবস্থা দেখে ট্রাকের বিক্রয়কর্মীদের অনুরোধ করলে দ্রুত তার হাতে পণ্য দেওয়া হয়।

এ সময় দুধের শিশু কোলে নিয়ে বেশ কয়েকজন নারীকে দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। প্রচণ্ড গরম আর ভিড়ের চাপে মা ও শিশু সন্তানসহ কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের কোলে শিশুদের চিৎকার ও কান্নাকাটিতে ভিন্ন এক পরিবেশ। কিন্তু মধ্যবিত্তের সংসারে অভাব যখন বড় প্রশ্ন, তখন শিশুদের কান্না মায়েদের মেনে নিতেই হবে। যত কষ্টই হোক পণ্য নিয়ে তাদের ফিরতে হবে।

বেলা তখন ১টা। কিন্তু লাইনে ভিড় কমার কোনো লক্ষণ নেই। ক্রমেই আরও অনেক নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে পেছনে। এর মধ্যেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে পণ্য আর বেশি নেই। অতঃপর হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। লাইন ভেঙে একজন আরেকজনকে ডিঙিয়ে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়। এ সময় কয়েকজন রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষমতা দেখান। পেছনে থাকা এক নারী লাইন ভেঙে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকে বাধা দেওয়া হয়। এতে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, ‘এই তোরা চিনস আমাকে। আমি কবির ভাইর বইন।’ এতে সবাই যেন চুপসে যান। কবির ভাইয়ের পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে পাশ থেকে কেউ একজন বলেন, ‘কবির ভাই কাঁঠালবাগান এলাকার জনৈক নেতা। তার নাম করে অনেকেই এভাবে লাইন ভেঙে পণ্য নিয়ে যায়।’