Image description
রামিসার জন্য কাঁদছে দেশ

‘ছোট্ট যে জন ছিল রে সবচেয়ে

সেই দিয়েছে সকল শূন্য করে...’

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ছিন্নমুকুল’ কবিতার এই পঙ্ক্তিগুলো যেন আজ পল্লবীর রামিসাদের বাড়ির প্রতিটি দেওয়ালের হাহাকার। সাত বছরের ছোট্ট নিষ্পাপ শিশুটির হাসিতে সারা বাড়ি মুখরিত থাকত, সেই রামিসা আর নেই। পাষণ্ড প্রতিবেশীর বিকৃত লালসার শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিতে হলো তাকে। রামিসার শূন্য ঘরে পড়ে থাকা খেলার পুতুল আর আদরের বিড়ালছানা ‘মিনি’ আজ সঙ্গীহীন। মেয়ের শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার শুধু একটাই আকুতি-‘বিচার না পারেন না করেন, অন্তত আল্লাহর ওয়াস্তে সমাজটা বদলায়া দেন।’ রামিসার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ পুরো দেশ। খুনি সোহেলের প্রকাশ্য ফাঁসির দাবিতে বৃহস্পতিবার পল্লবীসহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথে নেমে আসে হাজারো ক্ষুব্ধ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রতিবাদের ঝড়। তাদের একটাই দাবি, এমন বর্বরতার যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়।

পল্লবীর সাত নম্বর সড়কে রামিসাদের বাসার সামনে দিনভর বিক্ষোভ করেছেন এলাকাবাসী। সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিক্ষোভ করেন রামিসার সহপাঠীরাও। পল্লবী থানায় ঢুকে এবং কালশী সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন এলাকাবাসী। তারা ধর্ষক ও খুনি সোহেল রানার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

দুপুরে রামিসাদের বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, শখানেক মানুষের জটলা। তারা খুনির বিচার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। পাঁচতলা ভবনের তৃতীয়তলায় রামিসাদের বাসা। আর ঠিক তার বিপরীত পাশেই খুনি সোহেল রানার বাসা। ওই বাসাতেই ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয় রামিসাকে।

বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা মেয়ের শোকে পাগলপ্রায়। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন রামিসার বোন রাইশা আক্তার। ভেতরের একটি রুমে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন মা পারভীন আক্তার। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার বাচ্চা তো আর ফিরায় দিতে পারবেন না। বিচার না পারেন না করেন, অন্তত আল্লাহর ওয়াস্তে এমন একটা সমাজব্যবস্থা দেন, যে ব্যবস্থায় আর কোনো বাবার বুক যেন খালি না হয়। আর কোনো মার যেন বুক খালি না হয়। আর কোনো ভাইয়ের যেন ভাই না হারায়। আমি এইটাই চাই। সমাজটাকে একটু বদলায়া দেন আল্লাহর ওয়াস্তে।’

তিনি বলেন, ‘আমার বয়স ৫৫। আমি এখনো ওরকমভাবে দেখিনি যে, আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধী কোনোভাবে বের হয়ে যায়নি। আমি শুনতে পেরেছি খুনি সোহেল নাকি আরও একটা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং জামিনে বের হয়ে আসছে। আবারও হয়তো সে জামিনে বের হয়ে আসবে এবং আরেকটা অপরাধ করবে।’

রামিসার মা বলেন, বড় মেয়ে রাইশা রামিসাকে বলেছিল, ‘তুমি ঘরে থাকো, বাসায় থাকো, আমি চাচার বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটে আসতেছি। পরে ও (রামিসা) আবার যাইতে নিছে, দরজাটা খোলামাত্রই ওরে (রামিসা) নিয়া গেছে টান দিয়া। আমি একটা চিৎকারও শুনছি। চিৎকার যে ও দিছে, সেটা আমি বুঝতে পারি নাই। ভাবছি পাশের ফ্ল্যাটের হয়তো কোনো বাচ্চা দিছে।’

দিনভর বিক্ষোভ : বৃহস্পতিবার দিনভর রামিসাদের বাড়ির সামনে মানুষ ভিড় করেন। কেউ ব্যথিত, কেউ নিজ সন্তানের কথা ভেবে শঙ্কিত, আবার কেউ ক্ষুব্ধ। খুনি সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি চান তারা। সেখানে একাত্মতা প্রকাশ করতে যান সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলিসহ আরও অনেকে। স্থানীয় এক নারী ঘাতক সোহেলের বিষয়ে বলেন, ও এক নম্বর চরিত্রহীন ছিল। ও এত খারাপ ছিল, ও এখানে দাঁড়াইয়া আমার জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত। আমি আমার স্বামীকে দুই-তিন দিন বলছি। ও ইয়াবা, গাঁজা সবই খেত।

রামিসার বাসার সামনে টানানো হয়েছে ব্যানার। সেখানে লেখা হয়েছে, রামিসা হত্যার বিচার চাই, হত্যাকারীদের জনসমক্ষে ফাঁসি চাই। তিন বছরের সন্তান কোলে নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন, চার নম্বর সড়কের বাসিন্দা রিয়া মনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশে যতগুলো ধর্ষণ, হত্যা হয়েছে আমরা কখনো সঠিক বিচার পাইনি। ১৫ দিন, এক মাস তোলপাড় হয়। পরে সবাই চুপ হয়ে যায়। কোনো শাস্তি আমরা দেখতে পাই না। পুলিশ ধরলেও এক মাস, দুই মাস জেল খেটে আবার বের হয়ে যায়।

তিনি বলেন, আমরা চাই রামিসার খুনির ফাঁসি হোক। আর সরকার যদি না পারে তাহলে খুনিকে জনতার হাতে ছাইড়া দিক। আমরা তার বিচার করব। ওর (খুনি) বাইচা থাকার কোনো অধিকার নাই। ও কীভাবে পারল একটা সাত বছরের শিশুর শরীর থেকে মাথা আলাদা করতে। দুইটা হাত কেটে দিতে। আমারও বাচ্চা কোলে। এর নিরাপত্তা কে দেবে। আমরা মেয়ে মানুষ হয়ে কি পাপ করছি।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল : মিরপুরে পপুলার মডেল হাইস্কুলের শিক্ষার্থী ছিল রামিসা। তার হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

বৃহস্পতিবার সকালে রামিসার বাসার সামনে থেকে মিরপুর এ এইচ মডেল স্কুলের ব্যানারে মিছিলটি শুরু হয়। পরে মিরপুর-১১ এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন অংশগ্রহণকারীরা। মিছিলে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ছিল ৮ থেকে ১০ বছর বয়সি। তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ও ‘জাস্টিস ফর রামিসা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এ সময় তাদের হাতে বিচারের দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। মিরপুর এ এইচ মডেল স্কুলের শিক্ষক জাবেদ বলেন, এই নৃশংস ঘটনায় আমরা সংহতি জানাতে এসেছি। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিশু এমন ঘটনার শিকার না হয়, সেজন্য খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচার দীর্ঘায়িত হলে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়বে এবং অনেকেই সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাবেন।

বিচার দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে লালমাটিয়ার এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টায় স্কুলের সামনে এই কর্মসূচির আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করেন।

পল্লবী থানায় ঢুকে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ : পল্লবী থানার ভেতরে ঢুকেও বিক্ষোভ করেন এলাকাবাসী। তারা খুনির দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান। বিক্ষোভকারীদের হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড ছিল। এ সময় পুলিশ তাদের বিচারের আশ্বাস দিয়ে থানা থেকে চলে যেতে বলেন।

গত ১৯ মে সকালে পল্লবীতে ওই নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটে। খুনি সোহেল রানা (৩২) রিকশা মেকানিক। ওইদিন সন্ধ্যায় তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে পল্লবী থানা পুলিশ। এর আগে তার স্ত্রী সম্পাকে বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।