হাম প্রতিরোধে দেশব্যাপী দেড় মাস চলা বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হয়েছে। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি (১০৪ শতাংশ) টিকা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনুযায়ী হামের টিকা গ্রহণের পর বা প্রাকৃতিক উপায়ে শিশুর দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে গড়ে ১ থেকে ৩ সপ্তাহ লাগে। সেই হিসাবে টিকা পাওয়া শিশুদের শরীরে এতদিনে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এছাড়া যেসব শিশু তীব্র অপুষ্টি ও ডায়রিয়ায় ভুগছে, তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে না। এ কারণে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছেই।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে নিশ্চিত হাম ও উপসর্গে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ৬৩১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা চলতি বছরে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক আক্রান্ত। ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ২৭৯ জন। ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ২৭৫ জন। ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ৪০৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২১ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় এপ্রিলে টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হয়। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়া। ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু হয়। সারা দেশসহ বাকি সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া শুরু হয় ২০ এপ্রিল। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, ২০ মে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শেষ হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭০ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে জানান, মাসাধিককাল হামের টিকাদান কার্যক্রম চলছে। এতদিনে টিকা নেওয়া শিশুদের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু আক্রান্ত ও মৃত্যু না কমায় অনেকের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বলা যায়, দেশে অনেক শিশু তীব্র মাত্রায় অপুষ্টিতে ভুগছে। ফলে টিকা নিলেও শরীরে প্রোটিন বা আমিষের অভাব থাকায় তাদের শরীরে ঠিকমতো এবং প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে না। এজন্য টিকার পাশাপাশি শিশুদের এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং, পরিমিত মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসে গুরুত্ব দিতে হবে। টিকা বিশেষজ্ঞ ও সরকারের ইপিআই কর্মসূচির সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি বলেন, ‘যে কোনো ভাইরাস সংক্রমণের পর প্রাকৃতিকভাবে অথবা সংশ্লিষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে মানবদেহে অ্যান্টিবডি তথা রোগ প্রতিরোধ তৈরি হয়। মিজেলস ভাইরাসের (হাম) ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রাকৃতিকভাবে অ্যান্টিবডি (রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা) তৈরি হলে রোগটি সারা জীবনে আর হয় না। শিশু এটি মায়ের পেটে থাকাকালে গর্ভফুলের (প্লাসেন্টা) মাধ্যমে এবং জন্মের পর এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংসহ নানা মাধ্যমেও পেয়ে থাকে। যেটিকে প্যাসিভ ইমিউনিটি বলে।’
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, কেউ মিজেলস ভাইরাস বা কোনো ব্যাকটেরিয়া দ্বারা রোগাক্রান্ত হলে সেগুলো প্রতিরোধের জন্য ৫ ধরনের অ্যান্টিবডি আছে। এগুলো হলো-আইজিএম, আইজিজি, আইজিএ, আইজিই ও আইজিডি। অ্যান্টিবডিগুলো প্রাকৃতিকভাবে এবং টিকা নেওয়ার মাধ্যমে শরীরের মধ্যে থাকা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে। পাঁচটি অ্যান্টিবডি শরীরে পাঁচ ধরনের কাজ করে। এগুলো ‘ইমিউনিগ্লোবিউলিন’, তথা একধরনের প্রোটিন।
হাম সংক্রামিত হওয়ার পর টিকা গ্রহণ বা প্রকৃতিগতভাবে শরীরে প্রথম যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, সেটি আইজিএম। আক্রান্তের এক সপ্তাহের মধ্যে মানবদেহে এটি তৈরি হয়। অন্যদিকে আইজিজি শরীরে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে। সবচেয়ে কার্যকর এবং একমাত্র অ্যান্টিবডি, যা গর্ভফুলের মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। এটি হামজনতি নিউমোনিয়াসহ বিভিন্নভাবে শরীরের ভেতরে সৃষ্ট প্রদাহের বিরুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদে সুরক্ষা দেয়। সাধারণত আইজিজি অ্যান্টিবডি শিশুর দেহে ৯ মাস পর্যন্ত উচ্চমাত্রায় থাকায় এ সময় পর্যন্ত হামের টিকা বেশি কার্যকর হয় না। ফলে এ বয়স পর্যন্ত হামের টিকা দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়। আর আইজিএ অ্যান্টিবডি হামের টিকা ছাড়া এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডংয়ের মাধ্যমে শিশুর শরীরে তৈরি হয়। এটি হামজনিত রোগে শিশুর চোখ ও নাকি দিয়ে পানি পড়া, কাশি ও মিউকাস মেমব্রেনের প্রদাহ হতে দেয় না। আইজিই অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে র্যাশ ও অ্যালার্জি, পরজীবীজাতীয় সংক্রমণ থামিয়ে দেয়। সবেশষ আইজিডি ওপরের চারটি অ্যান্টিবডিকে সব ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধী কোষগুলো সক্রিয় করে তোলে। ফলে শিশুদের টিকা দেওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না এবং সুরক্ষিত মাত্রায় হয়েছে কি না দেখতে রক্ত পরীক্ষা করা দরকার।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে বছরে ৩৪ লাখ শিশু জন্ম নিচ্ছে, যারা হাম সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত হচ্ছে না। কারণ, এই শিশুদের মায়েরা হামের টিকা পাননি। সরকারের উচিত হবে প্রত্যেক বিবাহিত নারীর গর্ভধারণের অন্তত এক বছর আগে হামের টিকা দেওয়া। তাতে মায়েদের সন্তানরা গর্ভ থেকে ম্যাটারনাল ইমিউনিটি নিয়ে জন্ম নেবে। এছাড়া ৬ ও ৯ মাস বয়সে শিশুদের হামের টিকা দিলে আরও বেশি সুরক্ষিত হবে। মায়েদের টিকা না দিলে তাদের সন্তানরা হামে আক্রান্ত হতেই থাকবে। বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শেষ না করে শিশুদের পাশাপাশি মায়েদের টিকা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। টিকার অ্যান্টিবডি মানবদেহে তৈরি হতে ন্যূনতম এক মাস লাগে।’
হামের টিকা নিয়েও মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেসব শিশু তীব্র অপুষ্টি ও ডায়রিয়ায় ভুগছে, তাদের শরীরে টিকা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারছে না। অনেক শিশুর আইসিইউ প্রয়োজন হলেও সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না।’