Image description

মার্কিন-ইরান উত্তেজনা যখন আবারো পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন পাকিস্তান নিজেকে একটি কৌশলগত মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজছে। প্রশ্ন হলো, এই সুযোগ গ্রহণ কি শুধুই তাৎক্ষণিক লাভের জন্য, নাকি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ? পাকিস্তান যে ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যস্থতায় অবতীর্ণ হয়েছে, তা সূক্ষ্ম দড়ির উপর হাঁটার মতো বিপজ্জনক।

অতীতেও দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে মার্কিন পক্ষের উত্তেজনা যত বাড়ে, ততই পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সংযুক্ত। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পটভূমিতে পাকিস্তান একটি সেতু-রাষ্ট্র বা ব্রিজ স্টেট। বিশেষ করে আফগানিস্তান-পরবর্তী বাস্তবতায়, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজছে এবং পাকিস্তান সেই শূন্যস্থান পূরণে সচেষ্ট। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের প্রভাব কম নয়। সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টিও নতুন নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সৈন্য ও নৌসম্পদ প্রেরণ একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা-রাজনীতির অংশ, যাতে কয়েকটি কারণে পাকিস্তান এগিয়ে রয়েছে। উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর জন্য পাকিস্তান ‘লো-কস্ট সিকিউরিটি প্রোভাইডার’। পাকিস্তানের জন্য এটি অর্থনৈতিক সহায়তা, রেমিট্যান্স ও কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার উপায়। একইসঙ্গে, গালফ কাউন্সিলের দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করছে পাকিস্তান।

এটি নিছক সামরিক মোতায়েন নয়। ভাড়ার বিনিময়ে সামরিক সহযোগিতা (ংবপঁৎরঃু-ভড়ৎ-ৎবহঃ) মডেলের আধুনিক সংস্করণ অনুসরণ করছে পাকিস্তান, যেখানে নিরাপত্তা প্রদান করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তান সেটাই করছে।

তাছাড়া, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী। এর কারণগুলো স্পষ্ট: পাকিস্তান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নির্ভর অর্থনীতির দেশ। সীমান্তে উত্তেজনা থাকায় দেশটির সামরিক আধুনিকায়নের প্রয়োজন তীব্র। গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের জন্য দেশটির কাছে আন্তর্জাতিক বৈধতা পুনরুদ্ধার জরুরি। এমতাবস্থায়, মার্কিন-ইরান উত্তেজনা প্রশমনে এগিয়ে এসে পাকিস্তান নিজের লাভের জায়গাগুলোকেও নিশ্চিত করতে চাচ্ছে।

তবে, পাকিস্তান সরাসরি ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী না হলেও ফাসিলেটরের ভূমিকা রাখছে। এজন্য নিজের ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতিকে কাজে লাগিয়েছে দেশটি। ইসলামিক বিশ্বে নিজের গ্রহণযোগ্যতাকেও ব্যবহার করেছে ইসলামাবাদ। যার ভিত্তিতে উভয়পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেছে পাকিস্তান। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের জন্য একটি সীমাবদ্ধতা আছে। আর তা হলো, ইরান পাকিস্তানকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ মনে করে না, বিশেষ করে সৌদি ঘনিষ্ঠতার কারণে।
বহুমাত্রিক কৌশলে পাকিস্তান চলমান ইরান-মার্কিন সংঘাত থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা নিতে চেষ্টা করবে।

অর্থনৈতিক লাভের মধ্যে রয়েছে উপসাগরীয় সহায়তা আদায়, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা। কৌশলগত লাভের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া, মধ্যবর্তী শক্তির অবস্থান গ্রহণ করা ও দেশে গণতন্ত্রের সংকটকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ঢেকে রাখা। সামরিক ও কূটনৈতিক লাভের মধ্যে পাকিস্তান চাইবে নিজের সামরিক বাহিনীকে আরও সক্ষম করতে। বিশেষত, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা পেতে চাইবে দেশটি। আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতেও আগ্রহী হবে পাকিস্তান।

তবে পাকিস্তানের জন্য এই ‘অপর্চুনিস্টিক ব্যালান্সিং’-এর ঝুঁকিও রয়েছে। যেমন, কোনো পক্ষে হেলে গেলে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের একটির সঙ্গে। পাকিস্তানের অবস্থান কোনো কারণে মার্কিনপন্থি হলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির মূল্য দিতে হবে পশ্চিম সীমান্তে ও অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির মাধ্যমে। কারণ পাকিস্তানে একটি শক্তিশালী শিয়া গোষ্ঠী রয়েছে, যারা ইরানবিরোধী অবস্থান মেনে নেবে না। পাকিস্তানের ভূমিকা ভারসাম্য হারালে দেশটির বহির্নির্ভরশীলতা আরও বাড়বে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা ইস্যু জটিল আকার ধারণ করবে।

এটা ঠিক যে, পাকিস্তান অবশ্যই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চেষ্টা করছে। তবে দেশটিকে সুযোগের ফাঁদ এড়িয়ে চলতে হবে। পাকিস্তান যে মার্কিন-ইরান উত্তেজনাকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে, তা আসলে অতি উচ্চ ঝুঁকির কৌশল। যদি দক্ষতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবে পাকিস্তান নিজেকে একটি অপরিহার্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু সামান্য ভুল পদক্ষেপই তাকে একটি প্রক্সি প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত করতে পারে।

অতএব, পাকিস্তানের বর্তমান নীতি এক ধরনের সূক্ষ্ম দড়ির উপর হাঁটা- যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এটি কৌশলগত সাফল্য হবে, নাকি ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।