মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে বিশ্বরাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়ার এক কঠোর সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল অভিযান চালায়, তবে এর “ভয়াবহ পরিণতি” হবে—এমন ভাষায় সতর্ক করেছে মস্কো।
এই বার্তাটি নিছক কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সংকেত—যেখানে একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আধুনিক যুদ্ধের ধরন গত দুই দশকে অনেক বদলেছে। ড্রোন, সাইবার হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র—এসব এখন যুদ্ধের প্রথম সারির অস্ত্র। কিন্তু স্থল অভিযান এখনো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল সামরিক পদক্ষেপ।
ইরানের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কয়েকগুণ বেশি দেশটির বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি, পাহাড়ি ও নগর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নেটওয়ার্ক এবং
আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় উপস্থিতির জন্য।
অর্থাৎ, এতে কোনো “আকস্মিক আঘাত করে লক্ষ্য অর্জন' হবে না; বরং দীর্ঘস্থায়ী, জটিল এবং অনিশ্চিত যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হবে—যার সাথে অনেক বিশ্লেষক ইরাক যুদ্ধের তুলনা করছেন।
রাশিয়ার সতর্কবার্তাটি কয়েকটি স্তরে কাজ করছে।
মস্কো সরাসরি যুদ্ধের হুমকি না দিলেও, যুক্তরাষ্ট্রকে নিরুৎসাহিত করতে চায়। “dire consequences” শব্দটি মূলত একটি কৌশলগত চাপ।
রাশিয়া ও ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘনিষ্ঠ সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। আর রাশিয়ার সীমান্তে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ইরান নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে যা মস্কোর কাম্য হবে না।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইউক্রেন ও ইউরোপে তার মনোযোগ বিভক্ত হবে—যা রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা হতে পারে। কিন্তু এরপরও রাশিয়া কেন “ভয়াবহ পরিণতির” কথা বলছে। কারণ ওয়াশিংটন নিয়ন্ত্রিত ইরান আরো বেশি বিপজ্জনক হতে পারে। রাশিয়ার সতর্কবার্তাটি অস্পষ্ট হলেও, এর সম্ভাব্য বাস্তবতা বেশ পরিষ্কার।
এতে আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তার ঘটতে পারে। আর ইরান একা নয়। এর সাথে যুক্ত হতে পারে: হিজবুল্লাহ (লেবানন), হুথি (ইয়েমেন), ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন মিলিশিয়া। সাথে রাশিয়ার স্বার্থ যুক্ত হলে সংঘাত দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এতে হরমুজ প্রণালী সংকটও জটিল হবে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডরগুলোর একটি।
যদি এটি অবরুদ্ধ হয় বিশ্ব তেলের বড় অংশ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে, তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাবে আর
বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়বে।
রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে না নামলেও: অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা সহায়তা, কূটনৈতিক সমর্থন দেবে ইরানকে।
এর ফলে একটি “proxy war” দ্রুত বড় শক্তির সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
স্থল অভিযান ব্যর্থ হলে পরমাণু হামলার ঝুঁকি বাড়বে। এ ধরনের হামলা অথবা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে তা শুধু সামরিক নয়, পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে আনতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় ঠেলে দিতে পারে।
প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই এমন ঝুঁকি নেবে?
বাস্তবতা বলছে: সীমিত হামলা (airstrike, drone, cyber) সম্ভাব্য। পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান অত্যন্ত অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ: ইরানের ভৌগোলিক জটিলতা, দীর্ঘ যুদ্ধের রাজনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সতর্ক করে তুলেছে।
বর্তমান সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করছে—যুদ্ধ এখন আর শুধু ভূখণ্ড দখলের নয়,এটি ডেটা, ড্রোন ও প্রযুক্তির লড়াই। তবুও, স্থল অভিযান শুরু হলে যুদ্ধ আবার “পুরনো রূপে” ফিরে যেতে পারে—যেখানে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ও দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্বই প্রধান বাস্তবতা হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে এক বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে পরিস্থিতি। রাশিয়ার সতর্কবার্তা মূলত একটি বড় সত্য তুলে ধরছে— এই সংঘাত আর শুধু ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র নয়। এটি ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক যুদ্ধ বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। প্রক্সি সংঘর্ষ সুপারপাওয়ারগুলোকে মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব এখন এমন এক সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত—বিশেষ করে স্থল অভিযান—পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে। আমেরিকার অধিকাংশ নীতি প্রণেতা না চাইলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সেটিই চাইছে বলে মনে হয়।#