ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপির জন্য অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সংখ্যার বিবেচনায় সংসদের পুরো কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকার ও সরকারি দলের হাতে। এমপিদের নিয়ে হর্স ট্রেডিং হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নাই। আইন প্রণয়ন, বিল উত্থাপন ও পাস করতে লাগে সিম্পল মেজরিটি। তাতে তো সরকারের কোনো অসুবিধা হবেই না। সংবিধান সংশোধনীতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে। সরকারের সেটি থাকার কারণে বিরোধী দল বা জোটের কোনো মুখাপেক্ষী হতে হবে না। সবকিছুতেই সরকার সংসদে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংবিধানের যেকোনো সংশোধনী অনায়াসে পাস করতে পারবে সরকার।
বিএনপি এবারই প্রথম সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে এমনটি নয়। তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে আরো দু’বার বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দলটি সত্তর দশকের শেষের দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল, যদিও ঐ সরকার পদ্ধতি ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। আবার সংসদীয় পদ্ধতিতেও ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০০১ সালে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সময় বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল ছিল ঐ চারদলীয় জোটের অংশ এবং তৎকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় তাদের দুজন সদস্য ছিলেন।
ত্রয়োদশ সংসদের বিরোধী দল হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। আসন সংখ্যা ৭৭ হলেও তাদের প্রাপ্ত ভোটের পরিসংখ্যান হচ্ছে শতকরা ৩৮.৫ ভাগ। আসন সংখ্যার বিবেচনায় অনেক ছোট আকারের বিরোধী দল দেখালেও প্রাপ্ত ভোট তারা ছোট নয়। তাছাড়া মাঠের সুসংগঠিত ক্যাডার ভিত্তিক দল ও গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া তরুণরা বিরোধী জোটে থাকার কারণে তাদেরকে অবজ্ঞা করা সরকারের ঠিক হবে না। সংসদে ও মাঠে অতি সহজেই তারা মারমুখী হতে পারে ও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। প্রথম অধিবেশনের প্রথম সেশনে তারা তা দেখিয়েছি।
লক্ষ্য করার বিষয়, কয়েকজন ছাড়া বিরোধী জোটের প্রায় সবাই নবীন সাংসদ। অর্থাৎ তারা প্রথম বারের মতো নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে এসেছেন। স্বয়ং বিরোধী দলের নেতা এবারই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বিরোধী দল উপনেতার সংসদ সদস্য হিসেবে পূর্বের অভিজ্ঞতা থাকলেও তাদের চীফ হুইপ, হুইপ ও সংসদীয় কমিটির সদস্য ও সভাপতি হবেন বা হয়েছেন তারা সবাই নবীন সাংসদ। সবকিছু মিলিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদের বিরোধী দলের পূর্বের অভিজ্ঞতার অভাব আছে এবং সংসদে অনাগত দিনগুলোতে তা প্রতিফলিত হবে। প্রথম অধিবেশনের প্রথম শেসনে কিছুটা দৃশ্যমানও হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে বিএনপিতে অভিজ্ঞ সাংসদের সংখ্যা বেশি। অতীতে একাধিকবার তারা সরকার চালিয়েছেন, সরকার গঠন করেছেন একাধিকবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। তাই স্বভাবতই তাদের অভিজ্ঞ সাংসদের সংখ্যা বেশি। তবে ত্রয়োদশ সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নবীন সাংসদ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকারসহ বহু এমপি ও মন্ত্রী এবারই প্রথম বারের মতো নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন। সুতরাং অভিজ্ঞতার অভাব ট্রেজারি বেঞ্চেও আছে এবং অনাগত দিনগুলোতে সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতার অভাব আরো দৃশ্যমান হবে।
সাংসদরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে ও (ট্রেজারি বেঞ্চের ক্ষেত্রে) সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতা থাকতেই হবে সংসদীয় গণতন্ত্রে এমন কোন বাঁধাধরা নিয়ম নেই। আর পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলেই যে দায়িত্ব পালনে ও পারফরম্যান্সে ভালো হবেন - এমন নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে নবীন ও কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাংসদরা কঠোর অধ্যবসায় ও অনুশীলনের মাধ্যমে অনেক সময় অভিজ্ঞদের চেয়ে ভাল পারফরম্যান্স করেছেন বা করতে পেরেছেন। দ্রুত শিখা (quick learning) ও দ্রুত গ্রহণ (quick adopt) করার স্কিল যাদের আছে তারা সংসদে অপেক্ষাকৃত ভাল পারদর্শিতা দেখাতে পারেন। তবে সাংসদদের ভূমিকা, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে প্রারম্ভেই ইন্টেনসিভ ও এক্সটেনসিভ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার দলমত নির্বিশেষে খোদ রাষ্ট্রের উদ্যোগে, যেমনটি আমরা বৃটেনে দেখে থাকি। এখানে পার্লামেন্ট তো বটেই এমনকি আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকারের এসেম্বলি বা বারা কাউন্সিল নির্বাচনের পর দলমত নির্বিশেষে নির্বাচিতদেরকে ইন্টেনসিভ ও এক্সটেনসিভ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয় সরকারি উদ্যোগে যাতে করে তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করতে পারেন।
সংসদীয় গণতন্ত্র সঠিকভাবে কার্যকর করতে হলে সংসদে নির্বাচিত সব সাংসদদের ভূমিকা (role) কি তা তাদের ভালোভাবে জানা ও বুঝা অত্যাবশ্যকীয়। না জানলে বা না বুঝলে বরং নিজের অজান্তে তারা সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতি বিরোধী কাজে জড়িত হয়ে যেতে পারেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের নেতার পক্ষ থেকে সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা যায় না বা করা হয় না। এটা সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণা (concept) ও দর্শনের (philosophy) সাথে যায় না। ভালো করে না জানার কারণে হয়তো সংসদের বিরোধী দল সূচনাতেই হোঁচট খেয়ে সমালোচিত হলো।
এরশাদের আমলে “গৃহপালিত বিরোধী দল” বা শেখ হাসিনার আমলের “ডামি বিরোধী দল” বা “সরকার দলীয় বিরোধী দল” বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা সংসদীয় গণতন্ত্রকে হাসির পাত্র বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। অতীতের সরকারগুলো তাদের শাসনকালে বিরোধী দলকে দাঁড়াতেই দেয়নি। ফলে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্র বার বার হোঁচট খেয়েছে। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন তথাকথিত বিরোধী দলের নেতা এরশাদকে তার বিশেষ দূত পর্যন্ত বানিয়েছিলেন! এমনকি বিরোধী দলের নেতা কে হবেন তাও ঠিক করে দিতেন স্বয়ং শেখ হাসিনা! এগুলো যে সংসদীয় গণতন্ত্রে একেবারে বেমানান এই বোধশক্তিও তার ছিল না। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে - ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিলেন যার পরিণামে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা স্বৈরাচার সৃষ্টি করে এবং নব্বই দশকের এরশাদের স্বৈরশাসনের যাতাকলে নিষ্পেষিত হয়ে প্রধান দুটি দল নব্বই দশকের গোড়ার দিকে সংবিধান সংশোধন করে (দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে) বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করলেন। সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের চেক এন্ড ব্যালেন্স নিশ্চিত করার প্রধান উপাদান হলো সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা ও বিরোধী দলের যথাযথ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করা। দু:খজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে তেমনটি গড়ে উঠেনি বিভিন্ন সময়ে সরকারের একগুঁয়েমি ও বিরোধী দলের হঠকারী তৎপরতার কারণে।
সরকার তাদের নির্বাচনি ম্যান্ডেট ও মেনিফেস্টো অনুযায়ী দেশ চালাবে, সরকার পরিচালনা করবে। বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের নীতি ও পরিচালনা পদ্ধতির বিরোধীতা করা ও সমালোচনা করা এবং তার সাথে সাথে বিকল্প নীতি ও পদ্ধতি জাতির সামনে উপস্থাপন করা। জনগণ সরকারের নীতি ও সরকার পরিচালনা পদ্ধতি পাঁচ বছর দেখবে। তার পাশাপাশি বিরোধী দলের বিরোধীতা, সমালোচনা ও উপস্থাপিত বিকল্প নীতি ও পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করবে। পাঁচ বছর পর জনগণ সুযোগ পাবে তাদের মূল্যবান রায় দেয়ার। সরকারের নীতি ও পরিচালনা পদ্ধতি ভালো লাগলে সরকারি দলকে পূণরায় নির্বাচিত করবে দেশ পরিচালনার জন্য। আবার বিরোধী দলের সমালোচনা, বিরোধিতা ও উপস্থাপিত বিকল্প নীতি ও পদ্ধতিতে যদি জনগণ কনভিন্স হোন তাহলে সরকারে থাকা দলের পরিবর্তে বিরোধী দলকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য তাদের রায় দিয়ে ক্ষমতায় বসাবে দেশ পরিচালনার জন্য। এটাই হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কথা। এজন্য সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে অপেক্ষমান সরকার (government in waiting) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিরোধী দলের বিরোধিতা মানে সরকারের সবকিছুতেই একগুঁয়েমির মতো বিরোধীতা বা সমালোচনা করতে হবে - এমনটি নয়। জাতীয় স্বার্থে ও জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে সরকার ও বিরোধী দল কিছু কমন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়। গণতন্ত্রের সুতিকাগার বৃটেনের পার্লামেন্টে আমরা দেখি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা “কেট এন্ড মাউস” ফাইট করেন কিন্তু জাতীয় ইস্যু ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তারা অনেকটা সীসা ঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৃটেনের সশস্ত্র বাহিনী যখন যুদ্ধে জড়ায় তখন সরকারি দল ও বিরোধী দল এক হয়ে একসুরে কথা বলে। ডানব্লেইন শহরের এক স্কুলে জনৈক আততায়ীর গুলিতে বহু শিক্ষার্থী মারা যাবার পর তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতা একসাথে হেলিকপ্টার করে ঘটনাস্থলে গিয়ে একসুরে কথা বলে জাতিকে আশ্বস্থ করেছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ বাংলাদেশে এমন দৃশ্য তো আমরাও দেখতে চাই।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের নীতির ও কাজের প্রতিবাদ ও সমালোচনা করা। খোদ সংসদের ভিতর করতে পারে তারা সরকারের নীতি ও পরিচালনা পদ্ধতির তুমুল ও কঠিন প্রতিবাদ। তবে তা হতে হবে সংসদের রীতিনীতি ও কার্যপ্রণালী বিধি মেনে। জোরালো প্রতিবাদ, সঠিক ও যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপন, রাইট ট্যু রিপ্লাইয়ের অধিকার প্রয়োগ, বিবৃতি প্রদান, সংসদীয় কমিটিতে জোরালো ভূমিকা, মোশন টেবিল করা, পয়েন্ট অব অর্ডার, বিভিন্ন বিধিতে বক্তব্য দিতে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ইত্যাদি সংসদের স্বীকৃত পদ্ধতিতে বিরোধী দল তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে। এক্সট্রিম সিচুয়েশনে বিরোধী দলের সাংসদরা ওয়াক আউট করতে পারেন। তবে ওয়াক আউট একটি এক্সট্রিম পদক্ষেপ। তাই এটি হওয়া উচিত শেষ অবলম্বন (last resort) হিসেবে, মোটেই first resort হিসেবে নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংসদে কথা কাটাকাটি, চিৎকার, এমনকি হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। আমাদেরও এক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। পাকিস্তান আমলে খোদ সংসদ নেতার আঘাতে দায়িত্ব পালনরত ডেপুটি স্পিকারের মৃত্যুও হয়েছে! তবে এগুলো অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। সভ্য দুনিয়ায় এগুলো কল্পনাতীত।
সংসদ বর্জন সংসদীয় গণতন্ত্রে একেবারে বেমানান। জনগণ নির্বাচিত করে সাংসদদের সংসদে পাঠায় সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য, বর্জন করতে নিশ্চয়ই নয়। পৃথিবীর সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সংসদ বর্জন দেখতে পাওয়া যায় না। অথচ এমন আত্মঘাতী ও সংসদীয় গণতন্ত্রে কুড়াল মারার পদক্ষেপসমূহ আমরা আমাদের জাতীয় সংসদে অতীতে দেখে এসেছি। মজার ব্যাপার ছিল যারা সংসদ বর্জন করতেন তারা কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের সব ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিতে কার্পণ্য করতেন না। এমনকি তাদের সংসদ সদস্য পদ ধরে রাখতে বেঁধে দেয়া মেয়াদের মধ্যে স্বাক্ষরের জন্য চুপিসারে হলেও এসে স্বাক্ষর দিয়ে যেতেন! আর এজন্যই তো আমাদের সংসদ কখনোই কার্যকর ছিল না, সাংসদরা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেননি, করতে পারেননি বা করতে চাননি।
তবে সংসদকে শক্তিশালী ও কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্ব থাকলেও সরকারের ভূমিকা মূখ্য। বিশেষ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করার কারণে সংসদকে কার্যকর রাখতে ও বিরোধী দলকে আস্থায় নিতে সরকারের দায় বরং আরো বেড়ে গেছে। সরকারের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধী দল বা জোটের মুখাপেক্ষী হতে হবে না। ফলে বিরোধী দলকে এড়িয়ে (bypass) চলা বা অবজ্ঞা (ignore) করার প্রবণতা (tendency) গড়ে উঠতে পারে। অতীতে আমরা এমনটিই দেখে আসছি। আর এটিই সরকারকে কর্তৃত্বপরায়ণ ও ফ্যাসিবাদি করে তুলে। এমনটি হলে তা হবে জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
সংসদীয় ব্যবস্থায় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে ও সংসদ কার্যকর হয় সরকারি দল ও বিরোধী দলের যৌথ আগ্রহে, সমন্বিত প্রচেষ্টায় ও উদ্যোগে। এক পক্ষ যতই চান না কেন তা সম্ভব নয়। তাই সরকারকে জাতির প্রয়োজনে সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও বিরোধী দলকে অনেক কিছুতে ছাড় দিতে হবে। বিরোধী দলকেও আবার সরকারের নীতি ও পলিসির ক্ষেত্রে সমালোচনার পাশাপাশি বিতর্কহীন (undisputed) জাতীয় ইস্যুতে সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল হলো দ্বিচক্র (দুই চাকার) যানের মতো যার একটি চাকা বিকল হলে পূরো যানই অচল হয়ে য়ায়!
নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।