রাজধানীর গুলিস্তানের সড়ক ও ফুটপাতে নেই আগের সেই চিরচেনা ঘিঞ্জি অবস্থা! নেই হাজার রকমের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে থাকা শত শত হকারের সেই হাঁকডাক। সড়কের যে জায়গায় পা ফেলাই ছিল কষ্টকর, সেখানে এখন মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। আগে সড়কের যে পয়েন্টগুলোতে দীর্ঘ সময় যানজট লেগে থাকত, একই স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন স্থবির হয়ে থাকত এখন সে পয়েন্টগুলো ফাঁকা। যানজটের এ পয়েন্টগুলো সহজেই পার হতে পেরে খুশি চালকরা। ফুটপাত ফাঁকা হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করছেন পথচারীরাও। এমন চিত্র শুধু গুলিস্তানের রাস্তায় নয়, রাজধানীর অন্যান্য সড়কেও স্বস্তি ফিরিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের পরিচালিত ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত অভিযান।
অভিযানের চতুর্থ দিন গতকালও একযোগে রাজধানীর পান্থপথসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। অভিযানে জরিমানা, কারাদণ্ড ও মালামাল জব্দ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বুধবার থেকে টানা পরিচালিত এ অভিযানের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘অভিযান শুরুর পর বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকার সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। প্রথম ধাপের পাঁচ দিনের অভিযান আগামীকাল (আজ রবিবার) শেষ হবে। এরপর সাত দিনের কাজ হবে দখলমুক্ত জায়গা যাতে পুনরায় দখল না হয় সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা। এ সাত দিন পর আবার পাঁচ দিনের দখলমুক্ত অভিযান শুরু হবে। এতে নতুন নতুন এলাকা দখলমুক্ত হবে। এভাবে অভিযান চালানো এলাকা দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি নতুন এলাকা দখলমুক্ত করার অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘কোনো লোকদেখানো অভিযান এবার পরিচালিত হচ্ছে না। মানুষ যখন বুঝতে পারবে সড়ক দখল করা সম্ভব না, তখন আর পুনরায় দখলের বিষয়টি কারও মাথায় আসবে না। এতে সড়কে চলাচল আরও স্বস্তিদায়ক হবে।’
ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশের রেস্টুরেন্ট, গাড়ির সার্ভিসিং সেন্টার, ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ, পোশাক ও আসবাবের দোকানগুলো তাদের নিজস্ব সীমানার বাইরে অবৈধভাবে ফুটপাত ও রাস্তায় ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। রেস্টুরেন্টের রান্নার চুলা, গ্রিল বা কাবাব তৈরির যন্ত্র, ওয়ার্কশপের পুরোনো টায়ার ও যন্ত্রপাতি ফুটপাতে ফেলে রাখা হচ্ছে। এমনকি মোটরগাড়ির ওয়ার্কশপগুলো প্রায়ই রাস্তার এক লেন দখল করে গাড়ি মেরামত করছে। এতে ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের হাঁটার সুযোগ থাকছে না। বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পথচারীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি সড়কে তৈরি হচ্ছে যানজট। এ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য একযোগে পুরো ঢাকা শহরে অভিযান শুরু করা হয়েছে।
চতুর্থ দিনে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা : ডিএমপি জানিয়েছে, উচ্ছেদ অভিযানের চতুর্থ দিনে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা ও ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালি নর্থ সাউথ রোড, বংশাল ও নয়াবাজার এলাকায় পরিচালিত অভিযানে আইন অমান্য করায় চারটি প্রতিষ্ঠান ও একজনকে ৭ হাজার টাকা জরিমানা ও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় বিভিন্ন মালামাল জব্দ করা হয়। যাত্রাবাড়ী গোলাপবাগ মোড় থেকে ধলপুরে রাস্তার পাশে অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা হয়। আইন অমান্য করায় ১৬ ব্যবসায়ীকে ৩১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা এবং অন্যদের সতর্ক করা হয়। পান্থপথ থেকে গ্রিন রোড পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে অবৈধভাবে পার্কিং করা বাইকের বিরুদ্ধে ৩৫টি ভিডিও মামলা ও চারটি তাৎক্ষণিক মামলা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৬২ হাজার টাকা জরিমানা এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সনি স্কয়ার ঈদগাহ্ মাঠ, রাইনখোলা ও চিড়িয়াখানা রোড এলাকায় পরিচালিত অভিযানে চারটি দোকানকে ৬৭ হাজার টাকা জরিমানা, একজনকে গ্রেপ্তার, চারজনের কাছ থেকে মুচলেকা গ্রহণ, অন্যান্য ধারায় চারটি ও চারটি ভিডিও মামলা করা হয় । মালিবাগ রেলগেট থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে ৩০টি দোকান থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া টাউন হল, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড ও বছিলায় অবৈধভাবে দখল করা ফুটপাত ও সড়ক থেকে মালামাল অপসারণে অভিযান পরিচালনা করে তিনটি দোকানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মহাখালী কাঁচাবাজারসংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার দায়ে নয়টি দোকানকে ৪৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। উত্তরায় অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করার অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেপ্তার এবং একজনকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। উল্লেখ্য, ১ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনের অভিযানের জন্য নির্দিষ্ট ছক নিয়ে অভিযান শুরু করে ট্রাফিক বিভাগ।