দেশে ছড়িয়ে পড়েছে হামের সংক্রমণ। গতকাল বিভিন্ন হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭৮৭ শিশু। হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে চার শিশুর। তাই হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় আজ ৩০টি উচ্চ ঝুঁঁকিপূর্ণ উপজেলা ও পৌর এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম শুরু করছে সরকার।
গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি সব শিশুকে এ টিকার আওতায় আনা হবে। তারা আগে টিকা নিয়ে থাকুক বা না থাকুক, সবাই টিকা পাবে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রথম পর্যায়ে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ এলাকায় কর্মসূচি শুরু হবে। পরে রোগের পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ভিত্তিতে তা ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত করা হবে। মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য, ২১ মের মধ্যে এ জরুরি কার্যক্রম শেষ করা।
হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে। তবে টিকা নিতে আসা সুস্থ শিশুদের এটি দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘যাদের হাম হয়েছে তাদের আমরা সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ খাইয়ে দেব। ভিটামিন ‘এ’ প্রত্যেক হাসপাতালে, যেখানে রোগী আছে এটা খাইয়ে দেওয়া হবে এটা আমাদের কর্মসূচির ভিতরে। কিন্তু মনে রাখবেন যাদের টিকা দেওয়া হচ্ছে সুস্থ, তাদের কিন্তু ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হবে না।’’ তিনি বলেন, ‘এই টিকাটা নিলে পরে কোনো ক্ষতি হয় না, এটা আমাদের তারা (বিশেষজ্ঞরা) বলেছেন। কাজেই এটা নিয়ে চিন্তা করা তো কোনো ক্ষতি হয় নাই, ‘সাইড রিঅ্যাকশন’ নাই, কাজেই টিকা দেওয়া যায়, আমরা দিয়ে যাব।’
সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জিয়া হায়দার বলেন, ‘বাংলাদেশে সর্বশেষ এই হামের টিকা ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২০-এর ডিসেম্বর মাস থেকে ২০২১-এর জানুয়ারি পর্যন্ত। সুতরাং এরপর যে আমরা ছয় মাস থেকে নিচের বাচ্চা কনসিডার করি, এরা সবাই জন্মগ্রহণই করেছে আমাদের শেষ ক্যাম্পেইনের পরে’। শিশু হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউ সংকট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোগী বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। আইসিইউ সংকট বলতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, যা আইসিইউ তো প্রতিদিন বাড়ানো যায় না। ২০২৫ সালে টিকাদান কমে যাওয়া নিয়ে তদন্ত হবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন কাজ করতে চাই। ওই অতীতের তদন্ত করে কাউকে ফাঁসি কাষ্টে ঝুলিয়ে আমার লাভ নাই, আমাকে আমার মানুষকে বাঁচাতে হবে, আমার শিশুদের বাঁচাতে হবে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তালিকা অনুযায়ী, ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ২৭৫ জন। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু ২২৪ জন, পাঁচ বছর থেকে ১০ বছরের কম বয়সি ২৩ জন এবং ১০ বছরের বেশি বয়সি ২৮ জন। তালিকায় বরগুনা পৌরসভা ও সদর, পাবনা পৌরসভা ও সদর, চাঁদপুর পৌরসভা ও সদর, কক্সবাজারের মহেশখালী, গাজীপুর সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ও সদর, পাবনার ঈশ্বরদী, নেত্রকোনার আটপাড়া, ময়মনসিংহ সদর ও ত্রিশাল, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, যশোর সদর, নাটোর সদর, মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, কক্সবাজারের রামু, চাঁদপুরের হাইমচর, মাদারীপুর সদর, ঢাকার নবাবগঞ্জ, ঝালকাঠির নলছিটি, শরীয়তপুরের জাজিরা ও মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরসহ আরও কয়েকটি এলাকা রয়েছে।
এদিকে রাজশাহী থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরও তিনজনের মৃত্যু এবং নতুন করে ২৫ রোগী ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, শুক্রবার দুপুর থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২৫ জন ভর্তি হয়েছে।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আট মাস বয়সি ইব্রাহিম ও আফরান এবং পাঁচ মাস বয়সি আইজা নামের তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. হোসেন ইমাম এই তিন শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় গোপালগঞ্জে ২৭ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে সদর উপজেলায় ১০ জন, কোটালীপাড়ায় ৭ জন, কাশিয়ানীতে ৪ জন ও মুকসুদপুরে ৬ জন রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় ৭ শিশু নতুন করে ভর্তি হয়েছে। হাম-সংক্রান্ত শিশুদের জন্য হাসপাতালে আলাদা করে আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। সেখানে রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।