Image description
জুলাই কৃতিত্ব নিয়ে কাড়াকাড়ি উপেক্ষিত জনসংকট ইস্যু

চার ইস্যুতে সংসদে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারদলীয় জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট। এগুলো হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ ও সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাবিত বিশেষ কমিটি গঠন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা হয়েছে ১২ মার্চ। সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই এসব নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিতে দেখা গেছে দুই জোটকে। এরই মধ্যে দুই দফা ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। তীব্র বাগ্বিতণ্ডা ও হট্টগোলও হয়েছে। ‘ক্রেডিট’ লড়াইয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে দেশের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চলমান জ্বালানিসংকট, হামের প্রাদুর্ভাব ও জননিরাপত্তার মতো ইস্যুগুলো আলোচনায় গুরুত্ব পায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ নাগরিকরা।

অধিবেশনের শুরু থেকেই সরকারি দল ও তাদের শরিকরা জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে নিজেদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল হিসেবে দাবি করে আসছে। তাদের দাবি, আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপদান এবং মাঠপর্যায়ে সংহতি স্থাপনে তাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। অন্যদিকে বিরোধী জোটের নেতারা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সরকার পতনের এ আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের কর্মীরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

সরকার পতনের আন্দোলনের সঙ্গে বিরোধের মূল বিষয় হিসেবে যুক্ত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ইস্যু। এ ইস্যুতে এরই মধ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দুটি মুলতবি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে-বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ। তাই সংসদের কার্যক্রম মুলতবি করে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনার দাবি জানান। গত ১ এপ্রিল বুধবার সংসদের কার্যক্রম মুলতবি করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চেয়ে নোটিস দেন নোয়াখালী-২ আসনের সরকারদলীয় এমপি জয়নুল আবদিন ফারুক। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করেন এবং আজ রবিবার আলোচনার জন্য দুই ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করেন। এর আগে জুলাই সনদ নিয়ে ২৯ মার্চ নোটিস দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। নোটিসের বিষয় ছিল-জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নম্বর ০১,২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের আহ্বান। এ নিয়ে ওইদিন দুই জোটের এমপির মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও হট্টগোল হয়। পরে নোটিসটি নিয়ে ৩১ মার্চ দুই ঘণ্টা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারি দলের মনোযোগ নেই বলে অভিযোগ করা হয়। পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে চলতে চায় বলে মন্তব্য করেন তারা। অন্যদিকে সরকারি জোটের এমপিরা পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, আমরাও জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী জোটের প্রস্তাবের পক্ষে নয়। জুলাই আন্দোলন শুধু বিরোধী জোট করেছে এমন দাবি করাটা অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তারা।

বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সারা দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে বিএনপি সংস্কার চায় না বা জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। কিন্তু আমরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ধারণ করি। আমরা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলের ভিত্তিতে সংস্কার চাই, কোনো অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে নয়। বিরোধীদলীয় সদস্য জামায়াতের ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, এখন আমরা দেখছি, আমাদের নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে আমরা আবার ‘জুলাই সনদ’টাকেই ভুলিয়ে দিতে বসেছি। আমাদের সন্তানরা বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে, চোখ হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি প্ল্যাকার্ডে লিখেছিল যে, আমরা একটা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দাঁড়িয়েছি? তারা লিখেছিল রাস্তা সংস্কারের কাজ নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে। তিনি বলেন, আমরা সংস্কারের পরিবর্তে এখন সংশোধনীর দিকে যাচ্ছি। এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আলোকে সংবিধান সংস্কার ইস্যুতেও মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই জোট। সরকারি জোটের পক্ষ থেকে এ নিয়ে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ওই কমিটিতে সরাসরি না থাকার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী জোট। উল্টো রাজপথে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে রাজধানীতে কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে।

গণভোট অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপিত হচ্ছে না। ফলে এ অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত আকারে পাস করার জন্য সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। অবশিষ্ট ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে এবং ৪টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার এড়িয়ে সংসদে যেকোনো ইস্যুতে একটি সমতাভিত্তিক সমাধানে পৌঁছাতে উদাত্ত আহ্বান জানান।

দুই জোটের এই ‘ক্রেডিট’ লড়াইয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে দেশের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলেও এ নিয়ে সংসদে কোনো জোরালো আলোচনা বা সমাধানের পথ খুঁজতে দেখা যায়নি। চলমান জ্বালানিসংকট, হামের প্রাদুর্ভাব, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বেকারত্ব নিয়ে কার্যকর কোনো প্রস্তাব উত্থাপিত না হওয়ায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করতে দেখা গেছে। টেলিভিশনের টকশোগুলোতেও বিশ্লেষকরা দুই জোটের সমালোচনা করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি ঐতিহাসিক অর্জনের কৃতিত্ব নেওয়া নিয়ে এই কাদা ছোড়াছুড়ি সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়। তাদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে।