Image description

এবার পোলট্রির ফিডের বাজারে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে ফিডের দাম ৯ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই বাড়তি দাম সরাসরি খামারিদের ঘারে পড়েছে। তারা এখন অনেকটা দিশেহারা। অনেক খামারি লোকসান গুনতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। অনেকে আবার কমিয়েছেন উৎপাদন। এতে বাজারে ডিম ও মুরগির সরবরাহ কমে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিডের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সংকটে পড়বে দেশের পোলট্রি খাত। ভোক্তাকে টানতে হবে বাড়তি দামের ঘাটতি।

সোমবার বাজার পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফিড তৈরির প্রধান উপাদানগুলোর প্রায় সবকটির দাম বেড়ে গেছে। ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টা সোমবার বিক্রি হয় কেজিপ্রতি ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা দরে। এক মাস আগে ছিল ৩১ টাকা ৩০ পয়সা। মাসের ব্যবধানে ডিওআরবির (ডি-অয়েলড রাইস ব্রান) দাম কেজিপ্রতি ২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈল বিক্রি হচ্ছে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সা, যা এক মাস আগে ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা ছিল। সয়াবিন মিলের দাম ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হয়েছে।

এছাড়া ফিড উৎপাদনে ব্যবহৃত অন্যান্য প্রোটিন উৎসের দামও বেড়েছে। এর সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামার কারণেও আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে পরিবর্তন হচ্ছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত মার্চ-এপ্রিল ও মে মাসে প্রতি কেজি ভুট্টা ২৮ থেকে ২৯ টাকায় পাওয়া গেলেও জুন-জুলাই ও আগস্টে তা বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও ভুট্টার দাম প্রতি টন প্রায় ২৯০ ডলার, যা আগে ২৩৫ থেকে ২৪০ ডলার ছিল। পাশাপাশি ফিডের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ভুট্টার এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফিডের দামে। ফিডের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশু উৎপাদনের খরচও।

দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির পোলট্রি খামারি মো. হাসান যুগান্তরকে বলেন, আমার খামারে প্রতি মাসে ব্রয়লার মুরগির জন্য ৭০ বস্তা খাবার দরকার। দুই দফায় ফিডের দাম বাড়ার পর এখন আর সে পরিমাণ খাবার দিতে পারছি না। খরচ কমাতে ৬০ বস্তা খাবার দিচ্ছি। এতে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন হচ্ছে না। বাজারে ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যে খামার বন্ধ করে দিতে হবে। তিনি বলেন, ফিডের দাম বাড়ার পাশাপাশি গত কয়েক মাসে ওষুধ, ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের দামও বেড়েছে।

অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়লেও ডিম-মুরগির দাম সবসময় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে লোকসান গুনে অনেক খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ডিম ও ব্রয়লার মুরগি সরবরাহ কমে যাবে। বাজারে বেড়ে যাবে দাম। তাই ফিডের দাম কমাতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান বলেন, দেশে ফিডের কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের সরবরাহ দেশের চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে এসব পণ্যের রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া যেতে পারে। সঙ্গে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়াতে হবে। তিনি জানান, ফিডের দাম কমাতে পারলে খামারির উৎপাদন ব্যয় কমবে। এতে বাজারে ডিম-মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শফিকুর রহমান শিশির বলেন, ডিওআরবি ও রাইস ব্রানের মতো স্থানীয় কাঁচামালের ক্ষেত্রে আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা উচিত। তবে রপ্তানির সুযোগও পুরোপুরি বন্ধ না করে উৎপাদক ও স্থানীয় শিল্পের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে আমদানি পর্যায়ের কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে হলেও সমন্বয় করা যেতে পারে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খামারিরা যাতে কম খরচে পোলট্রি উৎপাদন করতে পারেন, সে জন্য ফিডসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ ব্যয় কমানোর বিষয়ে সরকার কাজ করছে। দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে পোলট্রি পণ্য নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন পর্যায়ের ব্যয় কমানো জরুরি। তিনি বলেন, ফিডসহ পোলট্রি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণের ব্যয় কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। খামারি ও উদ্যোক্তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।