Image description

দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে অহরহ খুনাখুনি হচ্ছে। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক কারবারি ছাড়াও অভিযান পরিচালনাকারী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য, পুলিশের সোর্স ও প্রতিবাদকারী সাধারণ মানুষও এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে।

চট্টগ্রামে মাদক কারবারের আধিপত্য ধরে রাখতে ইদানীং প্রায়ই সংঘর্ষ হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে গোয়েন্দা পুলিশের সোর্স সন্দেহেও যুবককে হত্যা করা হয়েছে। যশোরে চলতি বছর সংঘটিত ২০ হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই ঘটে মাদককে কেন্দ্র করে। ময়মনসিংহে মাদক কারবারের প্রতিবাদকারী যুবককে পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাণহানি ঘটে।
কালের কণ্ঠের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এমন পরিস্থিতির বিষয়ে জানা গেছে।

চট্টগ্রামে অহরহ খুন ও সংঘর্ষ : চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক কাজী মনজুরুল ইসলাম জানান, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে খুনাখুনি বাড়ছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুরাদ ও জসিমের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় মো. মহিউদ্দিনকে কুপিয়ে জখম করার অভিযোগ উঠেছে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে। পরে স্থানীয় লোকজন এ ঘটনায় জড়িত মুজিবুর রহমান নামের একজনের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ইয়াবা চুরির অভিযোগ তুলে নাঈম নামের এক কিশোরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মাদক কারবারি নুরুল ইসলাম ইরানকে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী।

যশোরে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাদক : যশোর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক আকরামুজ্জামান পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার বরাতে জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত যশোরে ২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

এসব ঘটনার বেশির ভাগের নেপথ্যে মাদক কারবারের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

ময়মনসিংহে প্রতিবাদ করলেই খুন-জখম : ময়মনসিংহ প্রতিনিধি আলম ফরাজী জানান, মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় জেলার বিভিন্ন স্থানে খুনের ঘটনা ঘটেছে। মাদক কারবারের প্রতিবাদ করায় মুক্তাগাছায় ফরহাদ হোসেনকে পেট্রল ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে। মুক্তাগাছা পৌর শহরের মধ্যহিস্যায় ফরহাদ হোসেন পরিত্যক্ত রাজবাড়ির পাশের একটি বাড়িতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করতেন। ওই বাড়ির পাশে প্রায়ই মাদকসেবী ও কারবারিদের আড্ডা বসত, তার নিয়মিত প্রতিবাদ করতেন তিনি। ঘটনার দিন রাতে ফরহাদ বাসা থেকে বের হয়ে কিছুটা দূরে নির্জন স্থানে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা পেছন থেকে ফরহাদের শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। মারাত্মক অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তিনি পাশের জলাশয়ে লাফিয়ে পড়েন, কিন্তু ততক্ষণে শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঝলসে যায়। পরের দিন দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

নারায়ণগঞ্জেও বিরোধিতা করলে লাশ পড়ে : নারায়ণগঞ্জ সিটি প্রতিনিধি আব্দুল ওয়াহিদ জানান, নারায়ণগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সোর্স সন্দেহে প্রাণ দিতে হয়েছে সাধারণ নাগরিক, ব্যবসায়ী ও কিশোরদেরও। গত ৫ সেপ্টেম্বর চাষাঢ়া হকার্স মার্কেট এলাকায় শুভ চন্দ্র দাসকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত শুভর কাছে ইয়াবা পাওয়া গেলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চিহ্নিত শীর্ষ মাদক কারবারি অনিকের আস্তানায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সোর্স হিসেবে কাজ করার সন্দেহেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। গত ২০ আগস্ট রাতে বন্দরের সালেহনগরে সন্ত্রাস ও মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা জাহিদ হাসান বুলবুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় কিশোর গ্যাং ‘সিফাত বাহিনী’র সদস্যদের জড়িত থাকার কথা উঠে এসেছে। এর আগে গত মে মাসে বন্দরের শান্তিনগরে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মাকসুদুর রহমান জুয়েলকে। পরে পুলিশের তদন্তে মাদক কারবারে বাধা দেওয়ার কারণে তাঁকে হত্যার তথ্য উঠে আসে। গত ২৯ মার্চ ফতুল্লায় গুম করা হয় শুভকে। তাঁর লাশ পরবর্তী সময়ে পাওয়া যায় রূপগঞ্জ কাঞ্চন ব্রিজের নিচে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফতুল্লার ইসদাইরে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

বরিশালে যখন-তখন খুন : বরিশাল থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক আজিম হোসেন জানান, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বরিশালে খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে পটুয়াখালী শহরের মুচিরপোল স্ট্যান্ড থেকে যাত্রী নিয়ে বের হন জাকারিয়া। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন সকালে সদর উপজেলার চর জৈনকাঠি ইউনিয়নের শৌলা খেয়াঘাটসংলগ্ন লোহালিয়া নদীতে তাঁর মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা ৯৯৯-এ খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি জাকারিয়ার বলে শনাক্ত করেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, জাকারিয়ার গলায় কেবল পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। জাকারিয়ার সঙ্গে খুনি সাইফুল ইসলামের পূর্বপরিচয় ছিল। মাদকদ্রব্য দেওয়ার কথা বলে জাকারিয়ার কাছ থেকে সাইফুল তিন লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়ার পর মাদকদ্রব্য সরবরাহ না করায় তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ওই বিরোধের জেরে সাইফুল ও মামুন জাকারিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।