হঠাৎ দাম বৃদ্ধিতে এলপিজির বাজারে চলছে চরম অস্থিরতা। এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৫৮৫ টাকা সরকার নির্ধারণ করে দিলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা। এর অন্যতম কারণ সারা দেশে এই বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। এর মধ্যে মাত্র চারটি কোম্পানি এলপিজির বাজারের ৬৮ শতাংশ সরবরাহ দিচ্ছে। অথচ চালু আছে ২৯টি কোম্পানি। বাকি কোম্পানিগুলো ঋণখেলাপি বা অন্যান্য সমস্যার কারণে এলপিজির আমদানির জন্য এলসি করতে পারছে না। তাই এলপিজির বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এলসি করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-লোয়াবের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এলপিজির অপারেটরদের বলা হয়, বাজারে এলপিজির কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসির বেঁধে দেওয়া দাম অর্থাৎ ১ হাজার ৫৮৫ টাকায় কোথাও এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বৈঠকে বলা হয়, গত আগস্ট মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন। আর ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন। সুতরাং আমদানির প্রবণতা অনুযায়ী এই মাসে এলপিজির কোনো ঘাটতি হবে না।
বৈঠক শেষে জ্বালানিমন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র কৃত্রিম সংকট করে বেশি দাম আদায়ের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। ওমেরা এলপিজির চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, বাজারে এলপিজির সংকট নেই। কেন দাম বাড়ছে এটা সরকার খতিয়ে দেখতে পারে। সোমবারের বৈঠকে লোয়াবের চেয়ারম্যান আমিরুল হক অংশ নেননি। তবে তিনি যুগান্তরকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অনেক কিছুর মতো এলপিজির সরবরাহকে অস্বাভাবিক করে তুলেছে। অনেকে চাইলেও আমদানি করতে পারছেন না। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে কেন বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে তা সরকার তদন্ত করলে জানতে পারবে।
এলপিজির নিয়ন্ত্রণ কয়েক কোম্পানির হাতে : এলপিজি বিক্রির জন্য সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে ৬০টি কোম্পানি। এর মধ্যে চালু আছে মাত্র ২৯টি কোম্পানি। এর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি কেবল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানির এলসি করছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী এই সেপ্টেম্বর মাসে (এখন পর্যন্ত) ইউনাইটেড আই গ্যাস লিমিটেড ২৩ হাজার ৪৩২ হাজার টন, যমুনা স্কেটেক ২০ হাজার ৬০২ টন, পেট্রোমেক্স এলপিজি লিমিটেড ১০ হাজার ৬০০ টন, ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৪ হাজার ৩০১ টন, মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি ১৩ হাজার ৪০১ টন, সান গ্যাস (সাবেক লাফ) ৮ হাজার ৪০০ টন, টিএমএসএস এলপিজি ৩ হাজার ৩০০ টন, এসকেএস এলপিজি ৪ হাজার ১ টন, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২ টন এবং প্রিমিয়াম এলপি গ্যাস লিমিটেড ২ হাজার ৪৫০ টন এলপিজি আমদানি করেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী আগস্ট মাসেও ১৩টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা ১০টিতে নেমে এসেছে। কেন তিনটি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেনি সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে চাহিদার ৯৮ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। সুতরাং এ খাতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা না থাকলে সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মিদশা কাটবে না।
জেএমআই এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, জেএমআই বেশি করে এলপিজি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ করতে চায়। কিন্তু ব্যাংকের নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এখন এলসি করা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে এলপিজি আমদানির সুযোগ করে দিলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে। জ্বালানি বিভাগ গত কয়েক মাসের এলপিজি আমদানির পরিসংখ্যান যাচাই করে দেখেছে, ওমেরা পেট্রোলিয়াম বাজারের ১৯ শতাংশ এলপিজি সরবরাহ করে।
এরপর পেট্রোম্যাক্স ১৭ শতাংশ, মেঘনা গ্রুপ ১৬ শতাংশ এবং যমুনা স্পেসটেক ১৬ শতাংশ অর্থাৎ এই চার কোম্পানি ৬৮ শতাংশ এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরে বিএম এনার্জি ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাস ৭ শতাংশ এবং ডেল্টা মাত্র ৪ শতাংশ চাহিদার এলপিজি সরবরাহ করছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর দেশে এলপিজির চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। ২০৩৫ সালে এই চাহিদা বাড়তে পারে ৪০ লাখ টনে। দেশে এলপিজির ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় রান্নার কাজে। এরপর ১২ শতাংশ শিল্প বা বাণিজ্যিক খাতে। যানবাহনে ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ব্যবহার হয় ৩ শতাংশ।