Image description

জীবাশ্ম জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতায় বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশ বিপাকে পড়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানির ৬৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। অর্থাৎ তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কয়লা চাহিদার বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই ব্যয়বহুল পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে আপাতত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (গ্রিন এনার্জি বা সবুজ শক্তি) বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অপার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মাত্র চার বছরে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেওয়া হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ২০ হাজার কিলোমিটারের মতো উপকূল এলাকা আছে। সেখানে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের মতো বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ যুগান্তরকে বলেছেন, বিগত সরকারের সময়েও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জনপ্রিয় করা যায়নি। কোন কোন কারণে জনপ্রিয় করা যায়নি, তা যাচাই-বাছাই করে এবার আমরা সব উদ্যোগ নিয়েছি। অন্যদিকে ভারত, ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তান-এসব দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সফলতার গল্পগুলো যাচাই করে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ি বাড়ি জনপ্রিয় করতে সরকার বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে। সে অনুযায়ী বাড়ির ছাদ বা খালি জায়গা কোনো বেসরকারি প্রতিনিধি বা কোম্পানিকে দিলে অর্থ বিনিয়োগ ছাড়াই গ্রাহকরা কম দামে বিদ্যুৎ পাবেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেছেন, নেট মিটারিং সিস্টেমে (অর্থাৎ সোলার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজে ব্যবহারের পর বাকি বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রির পদ্ধতি) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জনগণ উৎসাহিত হচ্ছে। সম্প্রতি এভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ৫ হাজার ৯২৭টি আবেদন জমা পড়েছে। এর থেকে পিক আওয়ারে ৩০ লাখ কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা।

সরকারের বড় পরিকল্পনা নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে : ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করতে কৌশলপত্র ঘোষণা করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, এখন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ২০৩০ সালে এই চাহিদা ২৫ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মোট চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। এই হিসাবে আগামী চার বছরের মধ্যে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা থাকতে হবে (বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ আসছে ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো)। কারণ, সৌরবিদ্যুতের প্রকল্পে প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর (উৎপাদনের সক্ষমতা) হচ্ছে মাত্র ২০-২২ শতাংশ।

এই হিসাবে আগামী চার বছরে ছাদভিত্তিক ৫ হাজার ৫০০, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ৪ হাজার ৫০০ এবং বায়ু-বর্জ্য-পানিবিদ্যুৎ ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদনের টার্গেট নেওয়া হয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ছাদ এবং ভূমিভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে ৪২০ মেগাওয়াট, ২০২৭ সালে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, ২০২৮ সালে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট, ২০২৯ সালে ২ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে ৩ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট ধরা হয়েছে ১৫০ মেগাওয়াট, বর্জ্য থেকে ২০০ এবং অন্যান্য উৎস থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে।

বাড়ি বাড়ি সোলার প্যানেল বসাতে ভিন্ন উদ্যোগ : সারা দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক ৫ কোটি ৩ লাখ ৭১ হাজারের বেশি। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৪ কোটি ৩০ লাখের মতো। শুধু পল্লী বিদ্যুতে (আরইবি) আবাসিক গ্রাহক ৩ কোটি ৪০ লাখের মতো। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, এই আবাসিক গ্রাহকের মধ্যে বিশেষ করে মফস্বলের গ্রাহকদের সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করা গেলে দেশের চেহারা অনেকটা পালটে যাবে। তাই দেশের ৫০৯টি উপজেলায় ৪টি বেসরকারি কোম্পানির একাধিক বিক্রয় ও সেবা প্রতিনিধি নিয়োগে বিজ্ঞাপন দিয়েছে পিডিবি।

সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতি উপজেলায় অসংখ্য বেসরকারি উদ্যোক্তা তার এলাকার সম্ভাবনাময় বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে (ছাদ বা খালি জায়গায়) নিজের খরচে প্যানেল বসিয়ে দেবেন। এজন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের (এসএমই) স্বল্প সুদে ঋণ দেবে বিভিন্ন ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ওই প্রতিনিধিরা সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক বা বাসিন্দাদের গ্রিডের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব দেবে। বাকি বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ কোম্পানির কাছে বিক্রির সুযোগ পাবেন ওই প্রতিনিধিরা। বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, সরকার আমদানির ওপর শুল্ক ৫০-৬০ শতাংশ থেকে মাত্র ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য- কম দামে প্যানেল বসিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দামে বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ তৈরি করা।

সরকারের বিশেষ প্যাকেজ : নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করতে গত মাসে সরকার এক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কেউ ব্যাটারিসহ বা ব্যাটারি ছাড়া ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সরকার সেই বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকায় কিনে নেবে। ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাকে এই দাম দেবে। এই ধরনের নেট মিটারিং করে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে আগ্রহী পাওয়ার সেলের সাবেক পরিচালক মাহমুদা বেগম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সরকারের এই ঘোষণা বেশ চমকপ্রদ। কিন্তু ২০৩০ সালের পর তো আর সাড়ে ১০ টাকায় পাওয়া যাবে না। এতে তার বিনিয়োগ উসুল নাও হতে পারে। এর জবাবে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০৩০ সালের পরও সরকার ওই বিদ্যুৎ কিনবে। সেই বিদ্যুতের দাম হবে বর্তমানে নেট মিটারিংয়ের দাম অনুযায়ী।

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, নেট মিটারিং এর মাধ্যমে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুতের প্রসার ঘটাতে বড় ভূমিকা পালন করবে। কারণ, এতে বিদ্যুতের গ্রাহক তার খালি ছাদ বা নিজস্ব জায়গায় সোলার বসিয়ে নিজে ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকারের কাছে সহজে বিক্রি করতে পারছে। এতে নিজে বিদ্যুতের চাহিদা মিটিয়ে অন্য গ্রাহককেও সহযোগিতা করতে পারবে।

ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম যুগান্তরকে সরকারের এই প্যাকেজ ঘোষণাকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, সরকার শুধু প্যাকেজ ঘোষণা করলে চলবে না। এর মার্কেটিং বা সুফল জনগণকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগের উৎসের ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ এখন ৫০ শতাংশের বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নেট মিটারিং করে বিদ্যুৎ বিক্রির আবেদন পড়েছে ৫ হাজার ৯২৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আরইবিতে ৩ হাজার ৪২০টি। এছাড়া পিডিবিতে ১ হাজার ৭০১টি, ডিপিডিসিতে ৮৪, ডেসকোতে ২৯২, ওজোপাডিকোতে ২০৪ এবং নেসকোতে ২২৬টি। এর মধ্যে বাতিল হয়েছে ৯৬১টি এবং অনুমোদন করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৫৫টি। বাকি আবেদন বিভিন্ন প্রক্রিয়াধীন আছে।

বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা আসলে কত : ইউনাইটেড বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি রিচার্স বিভাগের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিনিউয়েবেল এনার্জি ল্যাবরেটারি-এআরইএলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে জরিপ করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ইউএসএআইডি। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলে সাধারণত ৫ দশমিক ৭৫ থেকে ৭ দশমিক ৭৫ মিটার প্রতি সেকেন্ড বাতাসের গতি থাকে। এই গতিতে উপকূলে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের সম্ভাবনা আছে। তবে পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা ক্ষীণ। এখন পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রাম জোনে মাত্র ৬২ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, জীবাষ্ম জ্বালানির ওপর ভর্তুকি কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বিনিয়োগ ঝুঁকি কমানো, গ্রিডকে আরও শক্তিশালী, বেশি করে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলে জনগণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সোলার প্যানেল বসিয়ে নিজের বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন।