দেশে হূদেরাগ, ক্যানসার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, কিডনির অসুখ, স্থূলতাসহ নানা অসংক্রামক রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে এসব রোগে মৃত্যুর সংখ্যা। এসব রোগ বৃদ্ধির পেছনে অনেক কারণের সঙ্গে ট্রান্স ফ্যাটকেও (মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর চর্বি) দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এসব রোগে আক্রান্তদের মধ্যে ৭০ ভাগই মারা যায়। অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর ৮০ ভাগই স্ট্রোকের কারণে হয়। সম্প্রতি তেজগাঁও বিএসটিআইর প্রধান কার্যালয়ে হূদেরাগসহ অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি কমাতে খাদ্যপণ্যে শিল্পোত্পাদিত ‘ট্রান্সফ্যাটি এসিড (টিএফএ)’ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে নতুন উদ্যোগে মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক আলোচনাসভায় বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এসব তথ্য জানান।
সভায় জানানো হয়, ট্রান্স ফ্যাট মানবদেহে খারাপ কোলেস্টোরেল (এলডিএল) তৈরি করে। ভালো কোলেস্টোরেল (এইচডিএল) কমায়। রক্তনালির ক্ষতি করে। হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস এবং ব্রেস্ট ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বাড়ায়। বিশ্ব সংস্থার গাইড লাইনের বাইরে এর ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই খাদ্যসামগ্রীতে ট্রান্স ফ্যাট ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে এর ব্যবহার বাড়ছেই।
আইসিডিডিআরবি,র সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, ‘একই তেলে বার বার রান্না করলে ট্রান্স ফ্যাট বেড়ে যায়। এই তেলযুক্তখাবার খেলে পাকস্থলীসহ শরীরে ক্যানসারসহ যে কোনো ধরনের মরণব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। ভোজ্য তেল, বনস্পতি, ঘিসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী তৈরির কারখানাতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে।’
প্রখ্যাত হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ‘ট্রান্স ফ্যাটের কারণে হজম ক্ষমতা একেবারে কমে যায়। শরীরও দুর্বল হয়ে যায়। হার্ট ব্লক হয়ে যায়। আর্টারি বন্ধ এবং পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়ে মারাত্মক জটিলতা নিয়ে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তার মতে, তেলসহ খাদ্যপণ্যে ট্রান্স ফ্যাট থাকলে হূদেরাগ হওয়ায় ঝুঁকি সর্বাধিক।’
হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘২০২১ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী ট্রান্স ফ্যাট ব্যবহার ২ ভাগের নিচে থাকতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে বেশির ভাগই এই গাইডলাইন মানে না। তাদের ইচ্ছামতো তেল, ঘি, ডালডা ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যসামগ্রী উত্পাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের গ্যাসট্রো-এন্ট্রোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. গোলাম কিবরিয়া বলেন, ভোজ্য তেলে কী পরিমাণ ট্রান্স ফ্যাট কতটুকু থাকে তার মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। এসব তেল ব্যবহারে লিভার সিরোসিস ও ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। শিশুদের জন্যও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি রয়েছে বলে তিনি জানান। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ও গাইনি বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মুসাররত সুলতানা সুমি বলেন, ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার খেলে গর্ভবতী মায়ের ও তার সন্তানের স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেশি। জন্মগত হার্টের সমস্যা নিয়ে শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, শিশুদের জন্য ট্রান্স ফ্যাট বিপজ্জনক। লিভার ক্যানসার, কিডনিসহ জটিল রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে কিংবা জন্মের পর হতে পারে। শতকরা দুই ভাগ ট্রান্স ফ্যাটও শিশুর জন্য বিপজ্জনক বলে তিনি জানান।
ন্যাশন্যাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআইয়ের যৌথ উদ্যোগ আয়োজিত এ আলোচনাসভায় বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক প্রধান অতিথি ছিলেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীমও বক্তব্য রাখেন। ভোজ্য তেল ও নন-ডেইরি ভেজিটেবল ঘি উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাগণ সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় ট্রান্স ফ্যাট নির্মূল ও ক্ষতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এর দুই শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার সহনীয় বলে উল্লেখ করেন বক্তারা।
উল্লেখ্য, ট্রান্স ফ্যাট হলো এক ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি। যা মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক। এ কারণে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এ চর্বি খাদ্যসামগ্রীতে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু দেশে ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী উত্পাদনে ও তৈরিতে ব্যাপক হারে ব্যবহার হচ্ছে ট্রান্স ফ্যাট। ট্রান্স ফ্যাট যুক্ত অন্যান্য খাদ্যের মধ্যে রয়েছে: লাচ্ছা সেমাই, ডেকোরেটেড কেক, চিপস, চানাচুর, পিজ্জা, বার্গারসহ বিভিন্ন ফাস্ট ফুড।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, খাদ্যে ভেজাল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে রোগীর সংখ্যা কমতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সচেতনতা থাকতে হবে। অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত লোকের সংখ্যা বেশি। আর্থিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভেজাল খাদ্যসামগ্রী উত্পাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না বলে তিনি জানান।