Image description
ঝকঝকে ইউনিফর্মের আড়ালে ‘মেগা স্ক্যাম’

ফ্লাইট ল্যান্ড করল। রানওয়ে ছুঁয়ে নামল বিমানের চাকা। গ্রিন চ্যানেল পার হচ্ছেন ক্রু। হুট করে থমকে দাঁড়াল গোয়েন্দা দল। শুরু হলো তল্লাশি। ব্যাগে মিলল ডলার, দিরহামসহ বৈদেশিক মুদ্রা। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা হাতবদল হয়েছে দুবাইয়ে। এক চেকেই পাচার পৌনে ১০ লাখ দিরহাম। এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী হুন্ডি চক্র। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। শুরু করে অভ্যন্তরীণ তদন্ত। এতে উঠে আসে ঝকঝকে ইউনিফর্মের আড়ালে আকাশপথে হুন্ডি চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য। জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের দুবাই স্টেশনে সংঘটিত হয়েছে নজিরবিহীন এই আর্থিক অপরাধ ও অর্থ পাচারের ঘটনা। কেবিন ক্রুদের বৈদেশিক বা ওভারসিজ ভাতা উত্তোলনের প্রচলিত নিয়মকানুন সম্পূর্ণ অমান্য করে এক জালিয়াতচক্র হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত শতকোটি টাকা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ডিজিএফআই এবং বিমানের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি গৌরব হারাবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রুদের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার বা হুন্ডির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কেবিন ক্রুরা বিমানবন্দরের নিয়মকানুন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থাকেন। তাই কেউ এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বহন করলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে অর্থ সংগ্রহ ও হস্তান্তর হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ কোনো সহযোগিতা ছিল কি না, তা তদন্ত করতে হবে। বিশেষ করে দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক হাব থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতবদলের অভিযোগ থাকলে পুরো আর্থিক লেনদেনের চেইন অনুসন্ধান জরুরি।’

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, এ ঘটনায় কারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে-যে কোনো ধরনের দুর্নীতি, রাষ্ট্রের অর্থ লুটপাট বা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিয়ম বা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রচলিত ব্যবস্থায় বিদেশে কর্মরত বিমানের প্রত্যেক কেবিন ক্রুর ওভারসিজ বা বহির্গমন ভাতা তাদের নিজ নিজ নামে পৃথকভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যাংক থেকে উত্তোলনের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হিসাবের স্বচ্ছতা রক্ষা করা এবং কোনো ধরনের হুন্ডি বা অবৈধ অর্থ পাচারের সুযোগ বন্ধ করা। কিন্তু দুবাই স্টেশনে সেই সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়মকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে। ১৪ মে জনতা ব্যাংক পিএলসি (দুবাই শাখা) থেকে একটি মাত্র একক চেকের (চেক নং-৯৪১৩২৬) মাধ্যমে ১৯৬ জন কেবিন ক্রুর বকেয়া ও ওভারসিজ ভাতা বাবদ ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম (প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা) একবারে উত্তোলন করা হয়। চেকটি ইস্যু করা হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইমপ্রেস্ট অ্যাকাউন্ট থেকে, ফ্লাইট স্টুয়ার্ড এফএস শাকুর (পিএন নং-৫১৫৪০)-এর নামে। অভিযোগ রয়েছে, বিমানের অর্থ বিভাগের তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রচলিত পদ্ধতি উপেক্ষা করে এই সম্মিলিত অর্থ একজনের নামে উত্তোলনের অনুমোদন দেন। আর দুবাই স্টেশনের ফাইন্যান্স ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, একক চেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের পরপরই তা বিমানে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট ক্রুদের হাতে না দিয়ে দুবাইয়েই রেখে দেওয়া হয়। একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে যে, উত্তোলিত ওই নগদ অর্থ দুবাইয়ে অবস্থানরত একজন অবৈধ হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর জালিয়াতির নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেন কেবিন ক্রু ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত এফএস শাকুর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার উত্তরার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের (মুরা/মৃদুলা মানি এক্সচেঞ্জ) এজেন্ট নাজমুলের সঙ্গে অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে জড়িত। দুবাইয়ে উত্তোলিত অর্থ অবৈধ হুন্ডিতে বাংলাদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে চক্রটিকে ব্যবহার করা হয়।

শাহজালালে তল্লাশি ও থলের বিড়াল : দুবাইয়ে অর্থ হস্তান্তরের গোপন সংবাদ পাওয়ার পরপরই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রহণ করা হয় বিশেষ সতর্কতা। ১৫ মে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে বিজি-২৪৮ নম্বর ফ্লাইটে এফএস শাকুর ঢাকায় পৌঁছান। তিনি যখন গ্রিন চ্যানেল অতিক্রম করছিলেন, তখন ডিজিএফআই ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে আটক করে তল্লাশি চালান। এ সময় শাকুরের কাছে মাত্র ১০ হাজার মার্কিন ডলার এবং ২ হাজার দুবাই দিরহাম পাওয়া যায়। আর তার সঙ্গে থাকা অন্য ক্রুদের কাছে থেকে উদ্ধার করা হয় আরও কিছু বৈদেশিক মুদ্রা, যা হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজার ৩৬০ দিরহাম সমপরিমাণ। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, উত্তোলিত ১৩ লাখ ৪৬ লাখ ৮৪৭ দিরহামের বিপরীতে ঢাকায় এত সামান্য পরিমাণ অর্থ উদ্ধার হলো কেন?

এ বিষয়ে প্রথমে এফএস শাকুর বাকি প্রায় ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৭ দিরহাম (প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা)-এর বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। পরে স্বীকার করেন যে, ওই অর্থ তিনি দুবাইয়ে অবস্থানরত হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করেছেন। জানা যায়, ওই অর্থ ঢাকার উত্তরায় পূর্বনির্ধারিত স্থানে জমার মাধ্যমে দেশে আনার পাঁয়তারা চলছিল।

১০০ কোটি টাকার মেগা স্ক্যাম : বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে গত দুই বছরের কারসাজির ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। দেখা যায়, এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনের ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের সুসংগঠিত একটি পাচারচক্র। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এফএস শাকুর ছাড়াও এই কেবিন ক্রু সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছেন আবু সালেহ, অংকুর, শফিউল্লাহসহ অনেকে। তারা নিয়মিতভাবে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ রুটে ফ্লাইট শিডিউল হাতিয়ে নিতেন। মাসিক আউট-স্টেশন ভাতা প্রস্তুতের সঙ্গে সঙ্গে শিডিউলিং বিভাগ থেকে কৌশলে তাদের নাম সুবিধামতো ফ্লাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হতো। গত দুই বছরে এই চারজন অথরিটি বিলের মাধ্যমে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন, যার সিংহভাগ লোপাট হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে এফএস শাকুর যুগান্তরকে বলেন, আমার পেছনে অনেকেই লেগেছে। তারা আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। তবে ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এদিকে ১৪ মের ঘটনার আগে ২২ এপ্রিল একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে। সেদিন ১৬০ জন কেবিন ক্রুর ওভারসিজ অ্যালাউন্সের প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার দিরহাম একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। বিলশিট প্রস্তুত করা হয়েছিল বাংলাদেশ বিমান কেবিন ক্রু ইউনিয়নের নামে এবং চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল ফ্লাইট স্টুয়ার্ড ইফতেখার আলমের নামে। অভিযোগ রয়েছে, এভাবে বহু ক্রুর বিল একত্রে একজনের নামে অর্থ উত্তোলনের পর তা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আনা এবং পরে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এটি একদিনের বা একক ব্যক্তির ঘটনা নয়। গত প্রায় দুই বছরে কেবিন ক্রুদের একটি প্রভাবশালী অংশ নিয়মিতভাবে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ রুটের ফ্লাইটে নিজেদের শিডিউল নিশ্চিত করার সুযোগ নিয়েছে।