ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ট্রলি থেকে উদ্ধার করা কিশোরীর লাশের পরিচয় মিলেছে। তার নাম মিম আক্তার, বয়স ১৫ বছর। বাড়ি কুমিল্লার বাঙ্গরা বাজারের আন্দিকুট এলাকায়। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে স্বজনরা তার লাশ শনাক্ত এবং গতকাল শুক্রবার গ্রহণ করেন। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ।
তবে কিশোরীর লাশ ১০ দিন ধরে অজ্ঞাতপরিচয়ে পড়ে থাকল কেন, কীভাবেই বা হাসপাতালে এলো তার লাশ—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর তথ্য। পরিবার বলছে, মিম বছরখানেক ধরে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজিমিজি কান্দাপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী ফয়সাল আহমেদের গৃহকর্মী ছিল।
মিমের স্বজনদের অভিযোগ, ফয়সাল ও তার স্ত্রী রাহেমা খাতুন রেশমা মিমের ওপর প্রায়ই নির্যাতন চালাত। ফয়সাল তাকে যৌন নির্যাতন করে। নির্যাতনে অসুস্থ হলে গত ১২ আগস্ট দুপুরে ফয়সাল তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত হয়ে ট্রলির ওপর লাশ ফেলে পালিয়ে যায়।
এদিকে কিশোরীর পরিচয় পাওয়ার পর গতকাল শুক্রবার ঢাকা মহানগর পুলিশের শাহবাগ থানা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের আচরণে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কিশোরীর স্বজনরা বলছেন, ফয়সাল প্রভাবশালী। ঘটনার পর তাকে রক্ষায় দুই থানার পুলিশ উঠেপড়ে লেগেছে। মিম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও আত্মহত্যা মামলার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি লোকজন দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্যও চাপ দেওয়া হয়।
যদিও দুই থানার ঠেলাঠেলির পর মিমের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা নিয়েছে পুলিশ। ওই মামলায় গৃহকর্তা ফয়সাল, তার স্ত্রী রেশমা ও শ্বশুর এবিএম আব্দুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে তাদের রিমান্ড আবেদন না করায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও মিমের পারিবারিক সূত্র বলছে, মিমকে হত্যার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ ফেলে এসে ওই দিনই গৃহকর্তা ফয়সাল কিশোরী মিমের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেন যে, তার গৃহকর্মী ২৫ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। এরপর নিজে বাসা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। পরিবারের সদস্যরা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় বারবার গিয়ে ফয়সালকে ধরলেই মিমকে পাওয়া যাবে জানালেও পুলিশ তাতে কান দেয়নি। এরপর লাশ শনাক্তের পর শাহবাগ থানা পুলিশ ফয়সাল, তার স্ত্রী ও শ্বশুরকে গ্রেপ্তার করলেও তিনজনকে ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে মিমের মা সিপন বেগমের অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত পুলিশ হত্যা মামলা নেয়।
শাহবাগ থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, অপমৃত্যু মামলার সূত্র ধরে কিশোরীর লাশের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছিল শাহবাগ থানা পুলিশ। তবে পুনর্বয়স্ক না হওয়ায় জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারেও পরিচয় পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নম্বর নিয়ে সেটির মালিক-চালককে খুঁজে বের করা হয়। শেষ পর্যন্ত ফয়সালকে আটকের পর কিশোরীর পরিচয় শনাক্ত হলে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশের মাধ্যমে কিশোরীর স্বজনদের খবর দেওয়া হয়। কারণ ওই কিশোরী নিখোঁজের ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তার মা একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ১২ আগস্ট দুপুরে এক ব্যক্তি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ওই কিশোরীর নিথর দেহ নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আসেন। হাসপাতালের কর্মীরা কিশোরীকে ট্রলিতে করে জরুরি বিভাগে নেওয়ার সময় ওই ব্যক্তি চিকিৎসার জন্য টিকিট কাটার কথা বলে সটকে পড়েন। ততক্ষণে চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেন মেয়েটি মারা গেছে। এরপর তার মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে মর্গে ছিল।
সিপন বেগম কালবেলাকে বলেন, গত ১৪ আগস্ট শাহবাগ থানা থেকে মিমের ছবি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় গেছে। তিনি লোকজন নিয়ে থানায় গেলেও পুলিশ তা তাকে দেখায়নি। রাতভর রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অভিযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু কেন এ অভিযোগ দিলাম, এটা নিয়ে আমাদের নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ তদন্ত না করেই বলেছে মিথ্যা অভিযোগ।’ এতকিছুর পরও মেয়েটিকে খুঁজেনি পুলিশ এবং অভিযোগ দিলেও ফয়সালকে তখন ধরেনি।
সিপন বেগমের ভাষ্য, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর আসামি ফয়সালের ভাই পরিচয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের এক চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে তাদের টাকা নিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দিয়েছেন।
মিমের অন্য এক স্বজন বলেন, মিম এক বছর ধরে পাঁচ হাজার টাকা বেতনে ফয়সালের বাসায় কাজ করত। দেড় মাস আগে ওর মা মেয়ের সঙ্গে ভিডিওকলে সর্বশেষ কথা বলেন। তখন মিম বলেছিল, ফয়সাল ও তার স্ত্রী তাকে মারধর করে, অত্যাচার করে। কিন্তু এভাবে মেয়েটাকে মেরে ফেলবে তা কেউ বুঝতে পারেনি।
ওই স্বজন বলেন, তারা ধারণা করছেন, মিমকে ফয়সাল যৌন নির্যাতন করেছিল। বিষয়টি হয়তো তার স্ত্রী জেনে গিয়েছিল। এরপর মেয়েটিকে হত্যা করা হয়।
শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ঘটনাটি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হয়েছে। হাসপাতাল থেকে অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। তবে সম্পৃক্ততা পেয়ে আসামি ধরলেও এখন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ আসামি না নেওয়ায় শাহবাগ থানায় নিহত মিমের মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যা মামলা হয়েছে।
মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হতে পারে। তাকে নিয়মিত নির্যাতন করা হতো—পরিবারের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘ময়নাতদন্তের সময় আমরা ভিসেরা ও সিমেনের নমুনা সংগ্রহ করার আবেদন করেছিলাম। সেই প্রতিবেদন আসার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। মামলা নিয়ে গড়িমসি ও আসামিদের রিমান্ড আবেদন না করার বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা বলে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি। আসামি না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিদ্ধিরঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে। একই ঘটনায় দুই থানায় মামলা হয় না।
এদিকে মিমের মা অভিযোগ করেন, গত ১৪ আগস্ট তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অভিযোগ দিলে তা এসআই শামীম রেজাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি কুমিল্লা থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় এসে দিনভর অপেক্ষা করেন। ওই দিন রাত ৯টার দিকে শামীম রেজা থানায় এলে তাকে সব জানিয়ে ফয়সালকে ধরলেই মিমকে পাওয়া যাবে জানালে তিনি খারাপ ব্যবহার করেন। রাত দেড়টা পর্যন্ত তিনি থানার সামনে আমাদের বসিয়ে রাখেন।
এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই শামীম রেজা বলেন, অভিযোগ সত্য নয়। তিনি অভিযোগটা পাওয়ার পর কয়েকটি বাড়ি ঘুরেছেন। আসামি মিমের নিখোঁজের বিষয়ে করা অভিযোগে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, সেটি ভুল ছিল।