দেশের পুনঃখনন করা সরকারি খালগুলোকে শুধু পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের কাজে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবিকা, কর্মসংস্থান, সামাজিক বনায়ন ও দুর্যোগ সহনশীলতার সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের ২০টি নির্বাচিত খালকে ‘মডেল খাল’ হিসেবে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় নেওয়া ২০টি খালের মোট দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৬০ কিলোমিটার এবং প্রাথমিক হিসাবে প্রায় দুই হাজার ৪০০ পরিবার উপকার পাবে বলে ধরা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে যাচাই শেষে খালের প্রকৃত দৈর্ঘ্য ও উপকারভোগীর সংখ্যা চূড়ান্ত করা হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একটি খসড়া ধারণাপত্রে এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের আওতায় নতুন করে খাল খনন করা হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে প্রণীত এ পরিকল্পনায় দেশের আটটি বিভাগের নির্বাচিত ২০টি ‘মডেল খালে’ পানিপ্রবাহ ঠিক রেখে সামাজিক বনায়ন, মৎস্য ও হাঁস পালন, শাক-সবজি চাষ এবং কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
৮ বিভাগে ২০ মডেল খাল : প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা বিভাগে তিনটি, চট্টগ্রামে তিনটি, রাজশাহীতে তিনটি, খুলনায় তিনটি, রংপুরে দুটি, সিলেটে দুটি, বরিশালে দুটি এবং ময়মনসিংহে দুটি—মোট ২০টি খালকে পাইলটের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এগুলো এখনো প্রাথমিক পরিকল্পনাগত বণ্টন।
সমন্বয় করবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় : ধারণাপত্র অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের মূল খননকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে না। বরং খনন-পরবর্তী সামাজিক ব্যবহার সমন্বয়, অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্তকরণ, দুর্যোগ সহনশীল জীবিকা সৃষ্টি, সামাজিক বনায়ন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় এবং পরিবীক্ষণ-মূল্যায়ন হবে মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ভূমিকা।
খাল হবে বহুমুখী সামাজিক সম্পদ : ধারণাপত্রের মূল দর্শন, ‘খাল খনন নয়; খননকৃত খালের বহুমুখী ব্যবহার’। খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, ধারণক্ষমতা, পরিবেশ ও জনসাধারণের বৈধ ব্যবহার অক্ষুণ্ন রেখে উপযুক্ত খালে সামাজিক বনায়ন, মাছ ও হাঁস পালন, খালপারে মৌসুমি সবজি চাষ এবং অন্যান্য উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড চালুর কথা বলা হয়েছে।
নৌচলাচলের সুযোগ থাকা খালে নৌপথও উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পানি সংগ্রহ, গোসল, নৌযান ওঠানামা এবং অন্যান্য বৈধ জনব্যবহার কোনো উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না।
তবে সব খালে একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে না। পানিপ্রবাহ, পরিবেশগত সক্ষমতা, জনসাধারণের ব্যবহার, নৌচলাচল ও স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে খালের ব্যবহার নির্ধারণ করা হবে।
অগ্রাধিকার পাবে অতিদরিদ্ররা : প্রস্তাবিত কার্যক্রমে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) উপকারভোগী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রাসঙ্গিক তালিকাভুক্ত ব্যক্তি, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্যসম্পন্ন দরিদ্র পরিবার এবং স্থানীয়ভাবে যাচাইকৃত অতিদরিদ্র পরিবার বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
প্রতি পরিবার থেকে একজনকে অন্তর্ভুক্ত করার এবং একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা : মডেল খালগুলোতে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, পানিপ্রবাহ, পরিবেশগত সক্ষমতা ও স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা একক নির্ধারণ করা হবে। সমবায়ে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, হিসাব সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং সরকারি সম্পদ সংরক্ষণের কাজ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি অর্থায়নকে স্থায়ী ভর্তুকি হিসেবে না দেখে প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। উৎপাদন থেকে আয় হলে তার একটি অংশ সদস্যদের মধ্যে বণ্টনের পাশাপাশি ঘূর্ণমান তহবিল, রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ : পাইলট কার্যক্রমের জন্য সর্বোচ্চ প্রায় ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রাথমিক সরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজন নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক অনুমোদনের পর প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে।
প্রস্তাবিত ব্যয়ের সম্ভাব্য খাতের মধ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সহায়তা, উৎপাদন উপকরণ, সামাজিক বনায়ন, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা, স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ, পরিবেশগত সুরক্ষা, পরিবীক্ষণ-মূল্যায়ন, পরিবহন ও প্রশাসনিক সহায়তা।
খালপারে সামাজিক বনায়ন : খালের পারে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী পানিসহিষ্ণু, ফলদ, ঔষধি ও বনজ প্রজাতির সমন্বয়ে সামাজিক বনায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু গাছ লাগানো নয়, গাছের পরিচর্যা ও টিকে থাকার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারের বৃহত্তর বৃক্ষরোপণ লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
খালপারের উপযুক্ত অংশে মৌসুমি সবজি চাষের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে এতে খালের পানিপ্রবাহ, নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা পারের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। অনিয়ন্ত্রিত সার ও কীটনাশকের প্রবাহ রোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মালিকানা বা স্থায়ী দখল দেওয়া হবে না : প্রস্তাবিত উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো কোনো উপকারভোগী বা সমবায়কে খাল, খালের পার, জলাধার কিংবা সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর ওপর মালিকানা বা স্থায়ী দখল দেওয়া হবে না।
আগে যাচাই, পরে খাল নির্বাচন : শুধু পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে—এমন বিবেচনায় কোনো খালকে মডেল খাল হিসেবে নির্বাচন করা হবে না। খতিয়ান ও জমির শ্রেণি, সরকারি মালিকানা, বর্তমান ইজারা বা ব্যবহার, দখল পরিস্থিতি, খালের সীমানা, বিদ্যমান সরকারি প্রকল্প, পানিপ্রবাহ ও ধারণক্ষমতা, জনসাধারণের ব্যবহার, নৌচলাচল, পরিবেশগত ঝুঁকি, স্থানীয় বিরোধ ও ব্যবহারগত দ্বন্দ্ব যাচাই করা হবে।
১২ মাস পর মূল্যায়ন : পাইলট কার্যক্রমের অগ্রগতি ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিবীক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে খালের ভৌগোলিক অবস্থান, জিও ট্যাগযুক্ত ছবি, উপকারভোগীর তথ্য, বৃক্ষরোপণ ও টিকে থাকার হার, উৎপাদন, আয়-ব্যয়, পানির মান, ঘূর্ণমান তহবিল এবং সরকারি সম্পদের অবস্থা সংরক্ষণ করা হবে। কোনো খাল বা কার্যক্রম অনুপযুক্ত কিংবা অকার্যকর প্রমাণিত হলে তা বন্ধ, পরিবর্তন বা পুনর্গঠন করা যাবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, পুনঃখননের পর খাল যাতে আবার ভরাট, দখল বা অব্যবস্থাপনার শিকার না হয়, সে জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে খালকে একটি উৎপাদনশীল ও সংরক্ষণযোগ্য সামাজিক সম্পদে পরিণত করার চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, খনন-পরবর্তী টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে মূল লক্ষ্য।