Image description

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের মাধ্যমে দলের বিভিন্ন স্তরের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে দল পুনর্গঠন এবং তৃণমূল গোছানোর কার্যক্রমে মনোযোগ দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। প্রথম ধাপে জেলা ও উপজেলা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস করে সংগঠনকে আরও কার্যকর করার কথা ভাবছে দলটি। বিএনপির হাইকমান্ড মনে করছে, মাঠের নেতৃত্বের বড় একটি অংশ মন্ত্রী-এমপি হয়ে সরকারের দায়িত্বে। তাই তৃণমূলকে নতুন করে শক্তিশালী করা না হলে স্থানীয় ভোটের মাঠে সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। ভোটের ফল যেন দলের পক্ষে থাকে, সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই দল গোছানোর চিন্তা করছে বিএনপি।

দলীয় সূত্র বলছে, রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। চলতি সপ্তাহে কেন্দ্রীয় দপ্তরে নতুন মুখ আসতে পারে। এরপর প্রতিটি বিভাগ ধরে ধরে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের নতুন কমিটি আসবে। পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদন যাচাই করে তাদের দলে ফেরানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ে পদায়ন ও দায়িত্বে রদবদল করা হবে। এভাবেই সাংগঠনিক কাঠামোয় নেতৃত্ব পরিবর্তন ও দায়িত্ব রদবদল হওয়ার পরই দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের আয়োজন করা হবে।

তৃণমূল গোছানোর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার সাংগঠনিক সফর ও তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় সূত্র জানায়, গত ৪ জুলাই থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর ও জেলা এবং চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর বিভাগের জেলার নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। পর্যায়ক্রমে খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, ময়মনসিংহসহ অন্য বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। এসব বৈঠকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করা ও তৃণমূলের কমিটি ঢেলে সাজিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী বাছাই ও দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন তারেক রহমান। পাশাপাশি কমিটিতে বিতর্কিত বা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে—এমন কেউ যেন নেতৃত্বে আসতে না পারে, সেদিকেও দৃষ্টি রাখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, আগামী চার-পাঁচ মাসজুড়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের এই মহাযজ্ঞ চলবে। সরকার থেকে দলকে আলাদা করতে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, তরুণ, মেধাবী ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের সামনে আনা। দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বে বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে মন্ত্রী ও এমপিদের জেলা, মহানগর বা উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে না রাখার চিন্তা-ভাবনা চলছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতিকে সামনে রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতাদের ভূমিকাকে মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালবেলাকে বলেন, কাউন্সিল সামনে রেখে দল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। তবে তা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। বিভিন্ন ইউনিটে নতুন কমিটি গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। সম্প্রতি বেশ কিছু জায়গায় নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোও চলমান রয়েছে। সারা দেশের ইউনিট কমিটিগুলো পুনর্গঠনের পর বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতে এরই মধ্যে রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯ সদস্য বিশিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে এখনো তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। মৃত্যু, পদত্যাগ ও বহিষ্কারের কারণে ভাইস চেয়ারম্যানের ১২টি পদও শূন্য রয়েছে। দলের প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের মাধ্যমে এসব শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ চলছে। এ ছাড়া যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স—এই তিনজনের কাউকে কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, শ্রমিক দলসহ অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে বা আগামী মাসের শুরুর দিকে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, দল ও সরকারের মধ্যে কাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবারও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নীতি অনুসরণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তার সময়ে সরকার ও দলের দায়িত্ব আলাদা রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের দায়িত্বে থাকা নেতারা সাধারণত একই সঙ্গে দলের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে থাকতেন না। সেই সময়ে অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য স্বেচ্ছায় সাংগঠনিক পদ ছেড়ে দিয়ে সরকারি দায়িত্বে মনোযোগ দিয়েছিলেন। এবারও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সাংগঠনিক দায়িত্ব সীমিত করে ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ উদ্যোগের পক্ষে রয়েছেন। তার মতে, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা একটি দায়িত্বে মনোযোগী হলে সরকার পরিচালনা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম—দুই ক্ষেত্রেই দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়বে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ৭২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯টি জেলায় আহ্বায়ক কমিটি এবং ৩১টি জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। শেরপুর জেলা বিএনপির কমিটি বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। আর চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি অনেক আগেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। শুধু খুলনা মহানগর এবং যশোর, চুয়াডাঙ্গা, পটুয়াখালী, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও নেত্রকোনা—এই ছয় জেলা বিএনপির কমিটির মেয়াদ রয়েছে। বাকি সব জেলা ও মহানগর কমিটি মেয়াদ শেষ হলেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ দুই বছর থাকলেও কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও প্রায় এক দশক ধরে একই কমিটি দিয়ে কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টি কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি বিভাগ ধরে ধরে জেলা-উপজেলা ও মহানগর কমিটি পুনর্গঠনের চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। সে অনুযায়ী দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে দলের সপ্তম কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা মাথায় রেখেই দলকে সক্রিয় করায় তৎপর হয়ে উঠেছেন বিএনপির হাইকমান্ড। এর অংশ হিসেবে সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনতে গত দুই মাসজুড়ে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, মহানগরে কমিটি পুনর্গঠন শুরু করেছে বিএনপি। এরই ধারাবাহিকতায় কোথাও নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা, কোথাও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফেরানো এবং দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ২৭ জুলাই সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ও ২৯ জুলাই গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে গত ২৬ জুলাই দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং ফুলবাড়ী উপজেলা ও পৌর বিএনপির বিদ্যমান কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তারও আগে গত ১৫ জুলাই কুমিল্লা মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও ১৩ জুলাই কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির ৮ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেয় বিএনপি। অন্যদিকে, কয়েকজনের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নাসিম হোসাইনকে ফের সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৭ জুলাই লালমনিরহাট জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মমিনুল হককে জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং রংপুর জেলা বিএনপির সদস্য অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তীকে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া গত ৬ আগস্ট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নড়াইল সদর পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. তেলাওয়াত হোসেন, লোহাগড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. আহাদুজ্জামান বাটু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী সুলতানুজ্জামান সেলিম, লোহাগড়া পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি মিলু শরীফসহ ছয়জনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে দলে ফেরানো হয়েছে।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু কালবেলাকে বলেন, দল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে, যা দলের জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে শেষ হবে। যেসব জেলা, উপজেলা ও থানায় কমিটি দেওয়া খুব জরুরি, সেগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বর্তমানে সীমিত আকারে চলছে সাংগঠনিক কাজ, যা আগামী দিনে আরও বাড়ানো হতে পারে। তবে কাউন্সিল ঘিরে সারা দেশের কাঠামোয় নতুন নেতৃত্ব আনা হবে কি না তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলের হাইকমান্ড এ ব্যাপারে কাজ করছে।

বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শরীফুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘প্রতিটি বিভাগ ধরে ধরে এগোনোর কথা আমাদের জানানো হয়েছিল। আমরা এখন দলের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও গত এক দশকে আর কোনো কাউন্সিল হয়নি। তবে এ সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে।