Image description

জুলাই অভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ রংপুরের আলোচিত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। 

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে আবু সাঈদের বাবা আবুল হোসেন বলেন, বড় কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে ছোট কর্মকর্তাদের সাজা দেয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতে আবু সাঈদের দুই ভাই রমজান ও আবু হোসেন হত্যাকাণ্ডে জড়িত কিছু আসামির শাস্তি কম হয়েছে বলে দাবি করেন। ওদিকে এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষও। রায় ঘোষণার পর চিৎকার-চেঁচামেঁচি করেন একজন আসামি।
রায় পড়ার শুরুতেই রায়ের কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তে সরাসরি সম্প্রচার করার অনুমতি নেন চিফ প্রসিকিউটর। এসময় ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামীমসহ অপর প্রসিকিউটররা। অন্যদিকে, আসামি বেরোবি’র তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন- এডভোকেট আমিনুল গণি টিটো, আসামি এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় ও আনোয়ার পারভেজ আপেলের পক্ষের ছিলেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। আর পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া।
কার কী সাজা হলো: বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে এই মামলায় গ্রেপ্তার ৬ আসামিকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। কাঁচের গ্লাসে মোড়ানো আসামিদের কাঠগড়ায় বসেই তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাটির রায় ঘোষণা শোনেন এই ৬ আসামি। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান রায়ের মূল অংশটি পড়ে কোন আসামির কতো সাজা হয়েছে তা বর্ণনা করেন। এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন- সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৩ জন হলেন- মো. আরিফুজ্জামান জীবন, রবিউল ইসলাম নয়ন এবং বিভূতি ভূষণ রায়। ১০ বছর করে কারাদণ্ড প্রাপ্ত ৫ জন হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মো. হাসিবুর রশীদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান বেল্টু, সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পমেল বড়ুয়া। ৫ বছর করে কারাদণ্ড প্রাপ্ত ৮ জন হলেন- রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেন টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. শাহ নুর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রফিউল হাসান রাসেল, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, একই ইউনিটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবুর রহমান ওরফে বাবু। ৩ বছর করে কারাদণ্ড প্রাপ্ত ১২ জন হলেন- সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বি ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বি, সহ-সভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহমেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুননবী মণ্ডল, নিরাপত্তাকর্মী নুর আলম মিয়া, এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমু, এবং প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে অ্যাপল।

এদিকে ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, আনোয়ার পারভেজের ৩ বছরের সাজা তিনি ইতিমধ্যে কারাগারে কাটানো সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ভোগ করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।
পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল যা বলেন: বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম ধাপ ছিল। মামলার ১০ নাম্বার আসামির পক্ষের তার আইনজীবী আমিনুল গণি টিটুর দেয়া উদ্ধৃতি টেনে তিনি বলেন, টিটু তার বক্তব্যের শেষে বলেছিলেন, আমি আমার শত্রুর জন্য ইনসাফ চাই। আমি বিশ্বাস করি যে আমাদের এই রায়ের মাধ্যমে আমরা ইনসাফ কায়েমে সমর্থন করবো।

অতঃপর ট্রাইব্যুনালের ১ নম্বর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ রায়ের বাকি অংশ পড়া শুরু করেন। তিনি বলেন, মামলাটির পুরো রায় ৫০০ পৃষ্ঠার বেশি হবে। কিন্তু আমরা সংক্ষিপ্ত রায় পড়ছি, যা ৩০০ পৃষ্ঠার বেশি। এ ছাড়া, তিনি ট্রাইব্যুনালের গঠন প্রক্রিয়া, রোম স্ট্যাটিউটসহ মামলার সাক্ষীদের বর্ণনা তুলে ধরেন। এই ট্রাইব্যুনালকে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড দেখানোর বিষয়ে তিনি বলেন, এই মামলায় প্রসিকিউশন ফরমাল চার্জ দাখিল করলো। আমরা আসামিপক্ষের আইনজীবীদের শুধু এই চার্জের কপিই দেইনি। এর সঙ্গে প্রসিকিউশনের ডকুমেন্টারি বা ওরাল এভিডেন্স, সাক্ষী কী জবানবন্দি দেবেন- তার কপিসহ সবকিছুই বিচার শুরুর প্রথমেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। আসামিদের সঙ্গে প্রিভিলেজ কমিউনিকেশনের সুবিধাও দেয়া হয়েছে যেন আসামিপক্ষের কেউ সারপ্রাইজড না হয়। ট্রায়াল ইন অ্যাবসেন্সিয়ার (আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার) বিষয়ে বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ আরও বলেন, এই আইনে ট্রায়াল ইন অ্যাবসেন্সিয়া আছে; যা প্রথম দিকে ছিল না। পরবর্তীতে অ্যামেন্ডমেন্ট হয়ে ১৯৭৩ সালে ট্রায়াল ইন অ্যাবসেন্সিয়া এলো স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের মাধ্যমে। বলা হতো যে, রোম স্ট্যাটিউট আর্টিকেল ৬৩ (২)তে অভিযুক্ত যদি কোর্টে এসে পরে না আসে কিংবা তার আইনজীবী দিয়ে সহযোগিতা না করে, সেটাও ট্রায়াল ইন অ্যাবসেন্সিয়া হবে। এটাকে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমরা পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে গিয়ে অর্ধেক উঠে নেমে পড়লাম। কারণ অভিযুক্ত এলো। পরে আসবেন না, তখন ট্রায়াল ইন অ্যাবসেন্সিয়া হবে। যেটা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড। কিন্তু আমরা বলছি যে, অভিযুক্ত যদি পালিয়ে যায় তখন কী হবে? তাই আমরা কিন্তু প্রথমে ওয়ারেন্ট দিয়েছি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি কিন্তু এরপরেও না এলে বিচার তার অনুপস্থি’তিতেই শুরু করেছি।

পরে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী রায়ের মূল অংশ পড়া শুরু করেন। প্রথমেই তিনি বলেন, আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে অকুতোভয় চিত্তে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, তার সামনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা মানুষ, তাই তার কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু তিনি তখন বুঝতে পারেননি যে, সেই মানুষগুলো অমানুষ হয়ে গেছে। অতঃপর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী, একে একে ৩০ জন আসামির কার কী সাজা- তা পড়ে শোনান। এ সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এই মামলার আসামিপক্ষ, ডিফেন্স পক্ষ, সাংবাদিক এবং যারা উপস্থিত ছিলেন- সবাইকে আমাদের আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। দ্যাটস অল।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় যা বললো দুই পক্ষ: আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১০ বছরের সাজা পাওয়া বেরোবি সাবেক উপাচার্যকে ‘হতভাগা’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বেরোবির উপাচার্য বাচ্চুকে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলামসহ মোট ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমরা এ রায়ে আপাতত সন্তুষ্ট। তবে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর তা বিশ্লেষণ করে আপিল করা হবে কিনা- তা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এদিকে, ঘোষিত রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে ৩ আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে। তিনি বলেন, আবু সাঈদের জব্দকৃত গেঞ্জিতে গুলির কোনো ছিদ্র পাওয়া যায়নি বলে আমরা যুক্তিতর্কে তুলে ধরেছিলাম। এ ছাড়া, গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্বাভাবিক কোনো চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়নি। মরদেহে এক্স-রে বা রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা না করায় গুলির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একজন মানুষ গুলিতে নিহত হলে শরীরে সুস্পষ্ট প্রভাব থাকার কথা। কিন্তু এখানে সেই ধরনের আলামত অনুপস্থিত। পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি সংগ্রহের জন্য এরইমধ্যে আবেদন করা হয়েছে। রায় হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ পরিবার ও সহযোদ্ধাদের
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে তার পরিবারের সদস্য ও সহযোদ্ধারা। গতকাল দুপুরে এ রায় প্রকাশের পর তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে রায় পুনঃবিবেচনাসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।
রংপুর পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট নই। আদালত কনস্টেবলের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু গুলি করার জন্য উপর লেভেলের যে অফিসাররা নিদের্শনা দিয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে ভালো করে তদন্ত করতে হবে। আমার ছেলেদের সঙ্গে পরামর্শ করে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার ছেলের সঠিক বিচার হয়নি। আরও মৃত্যুদণ্ড দিলো না কেন, এটি আমার দাবি। এজন্য আমার অন্তর ঠান্ডা হয়নি, মন অসন্তুষ্ট।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আবু সাঈদের সহযোদ্ধা শামসুর রহমান সুমন বলেন, শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে গুরুতর অপরাধ করা আসামিদের লঘু শাস্তি দেয়া হয়েছে। যাদের লঘুদণ্ড দেয়া হয়েছে, নিশ্চই তাদের বিষয়ে আদালত চিন্তা করবে বলে প্রত্যাশা করছি। রায়ে যাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে, তাদের রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানাচ্ছি। এ ছাড়া ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া অভ্যুত্থানের সময় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তার শাস্তি কম দেয়া হয়েছে।
আবু সাঈদের সহযোদ্ধা আশিকুর রহমান আশিক বলেন, দুঃখের সঙ্গে জানাতে হয় যে, এটি ছিল স্পষ্ট পুলিশি হত্যাকাণ্ড। পুলিশের এসি ইমরান শিক্ষার্থীদের ওপর ঢিল ছুড়েছিল, হামলার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু তাকে মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। আশা করছি আদালত এ বিষয়টি বিবেচনায় আনবে।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার সাক্ষী আরমান হোসেন বলেন, এ রায়ে ১১ , ১২ ও ১৬ই জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর যেসব আসামিরা হামলা চালিয়েছে তাদের কম সাজা দেয়া হয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী রায় ঘোষণা হয়নি। আদালত এটি আমলে নেবে ও রায় পুনঃবিবেচনা করবে প্রত্যাশা করছি।