Image description

ঢাকায় ভূমিকম্পের বড় বিপদের ঝুঁকি দিনদিন স্পষ্ট হচ্ছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাড়াচ্ছে বিপদের শঙ্কা। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ এবং পুরাতন-জরাজীর্ণ ভবন দুশ্চিন্তার বড় কারণ। তাই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঢাকা অত্যন্ত জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরী। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এখানে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন, যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকায় ১ লাখ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তারা যেন তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেড ক্রিসেন্ট, গার্লস গাইড, আনসার-ভিডিপিসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আমাদের মাঠের তালিকা দিয়েছে। খুব দ্রুতই আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করব।’

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ভূতাত্ত্বিকভাবে ঢাকা ভূমিকম্পের মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু ২০০০ সালের পরে অপরিকল্পিত নগরায়ণে জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অনেক ভবন নির্মাণে মানা হয়নি নিয়ম, দুই ভবনের মাঝে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা রাখা হয়নি। এমনকি কোনো দুর্যোগ হলে উদ্ধারকাজ চালানোও কঠিন। কারণ রাস্তাগুলো সরু করে ফেলা হয়েছে।’

ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন ভেঙে ফেলতে হবে। যেগুলো সংস্কার করা সম্ভব সেগুলো সংস্কার করতে হবে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে ভবন নির্মাণে জোর দিতে হবে। এটা লম্বা পরিকল্পনার বিষয়। দীর্ঘমেয়াদে কাজ করলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগবিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নগরী হিসেবে চিহ্নিত করছেন নগর পরিকল্পনাবিদেরা। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যমতে রাজধানীতে প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবনের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে বলা হয়েছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অন্তত ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে দেশের ভিতরে ছোট ছোট অজ্ঞাত ফল্ট লাইন চিহ্নিত করা জরুরি।’ সম্প্রতি ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাস ও করণীয়বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, ‘গত ২১ নভেম্বর ভূমিকম্পের পর ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ৩০০ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করতে পেরেছি। নিয়ম ভেঙে এবং অনুমোদিত নকশা না মেনে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক ও ভবন মালিক উভয়েরই দায়িত্ব আছে। তবে প্রধান দায়িত্ব ভবন মালিকদের ওপরই বর্তায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়ম মেনেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিই। রাজউক নিজে ভবনের নকশা করে না। বাড়ির মালিকরা ইঞ্জিনিয়ার বা আর্কিটেক্ট দিয়ে নকশা করান এবং রাজউকের নিয়ম মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই নকশা জমা দেন। পরে যদি তাঁরা নিয়ম ভাঙেন, তাহলে শাস্তি বা জরিমানা ভবন মালিকদেরই প্রাপ্য।’ ফেব্রুয়ারিতে ১১ বার ভূমিকম্পে কেঁপেছে দেশ। প্রাণহানি না হলেও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর আগে নভেম্বরে ঘন ঘন ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের অধিকাংশ এলাকা। নিহত হয় ১০ জন, আহত হয় ৬ শতাধিক মানুষ। পরদিন তিনটি ভূমিকম্প হয়। পরবর্তী কয়েক দিনে একের পর এক ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশ।