Image description

জ্বালানি তেলের পর এবার বাজারে আলোচনায় ভোজ্যতেল। রাজধানীর অনেক বাজারে সয়াবিন তেল খুঁজে পাচ্ছেন না ভোক্তারা। এতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। অভিযোগ উঠেছে, দাম বাড়ার আশায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সয়াবিন তেল মজুত করে রাখছেন। ফলে সপ্তাহখানেক ধরে পাইকারি ও খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের ঘাটতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

তবে সরকারের দাবি, দেশে ভোজ্যতেলের কোনও ঘাটতি নেই এবং দাম বাড়ারও আশঙ্কা নেই। বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।

খুচরা বিক্রেতারা জানান, মার্চ মাসের শুরু থেকেই ডিলারদের কাছ থেকে তারা নিয়মিত সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না। কখনও তেল পাওয়া গেলেও ডিলাররা বাড়তি দাম চাইছেন বলে অভিযোগ তাদের।

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা—বিশেষ করে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলগেট থেকে ডিও অনুযায়ী তেল সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের দাবি, আমদানিতে জটিলতা তৈরি হওয়ায় ডিও পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে।

তবে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী মিলমালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, নির্ধারিত দামের বেশি ডিলার দাবি করলে তার ডিলারশিপ বাতিল করা হবে।

মজুত আছে, তবু সংকট কেন

বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন ভোজ্যতেল মজুত রয়েছে। পাশাপাশি আমদানি প্রক্রিয়ায় বা পাইপলাইনে রয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন। নতুন করে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কাজও চলমান।

এত মজুত থাকার পরও বাজারে সংকট কেন—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর কেউ দিতে পারছে না। পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোম্পানির পক্ষ থেকে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। অন্যদিকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

সম্ভাব্য কারণ কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করতে পারে। এগুলো হলো—

কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি: কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় তেল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করছেন।

আতঙ্কিত কেনাকাটা: গুজব ছড়িয়ে পড়ায় অনেক ভোক্তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে রাখছেন।

ডিলার ও খুচরা পর্যায়ের কারসাজি: সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে তেল না পৌঁছানোর অভিযোগ উঠছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সরবরাহ ও তদারকির দুর্বলতা: ডিলার পর্যায়ে সঠিকভাবে তেল না পৌঁছানো এবং বাজার তদারকি কম থাকাও পরিস্থিতি জটিল করছে।

সরকারের অবস্থান

গত সপ্তাহে সচিবালয়ে ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং এক ফোঁটাও দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই।

তিনি বলেন, কিছু এলাকায় সাময়িক সরবরাহ চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ভোক্তা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে রাখায় কিছু দোকানে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

বাজারে ভিন্ন বাস্তবতা

তবে রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দোকানেই বিক্রির মতো সয়াবিন তেল নেই। কাওরানবাজারের একাধিক দোকানদার জানান, তাদের কাছে বোতলজাত সয়াবিন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সীমিত সরবরাহ থাকলেও তা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আমদানিনির্ভর বাজার

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদা প্রায় ২৪ থেকে ৩২ লাখ টন। এর মধ্যে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ১২ থেকে ১৯ শতাংশ। ফলে চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

দেশে মাসিক ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন। রমজান মাসে এই চাহিদা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ টনে পৌঁছে যায়।

দাম কোথায় দাঁড়িয়েছে

গত বছরের ডিসেম্বরে সরকার সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৬ টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। তখন বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করা হয় লিটারপ্রতি ১৯৫ টাকা।

তবে বর্তমানে বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ২১০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। অনেক পাড়ার দোকানেই বোতলজাত সয়াবিন পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।

কাওরানবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “গত ১৫ দিন ধরে আমরা সয়াবিন তেলের সরবরাহ পাচ্ছি না। ডিলাররা বলছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই দাম বাড়তে পারে।”

তবে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “অনুমোদিত ডিলাররা তেল পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমাদের পক্ষ থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।”