ধরা যাক, ইরান মেক্সিকোতে কিছু অপারেটিভ পাঠালো। তারা টেক্সাস সীমান্ত থেকে একটি আমেরিকান সামরিক ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লো। কিন্তু অসাবধানতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে সেই ক্ষেপণাস্ত্র পাশের একটি আমেরিকান স্কুল ধ্বংস করে দিলো এবং ১৭৫ জন মানুষ নিহত হলো।
এরপর যদি তারা জ্বালানি ডিপো উড়িয়ে দেয়, যার ফলে বাসিন্দাদের ওপর রাসায়নিক বৃষ্টির মতো বিষাক্ত পদার্থ ঝরে পড়ে। তারপর যদি তারা বাড়িঘর, স্কুল ও ক্লিনিকে হামলা চালায়- আর ইরানের নেতা ঘোষণা করেন যে ‘মৃত্যু, আগুন ও তাণ্ডব’ এমনভাবে আমেরিকাকে ধ্বংস করবে যে দেশটি আর কখনো পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে না। এমন হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং আমাদের সবারই নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর এই ভয়াবহ হামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ উঠতো এবং সেটাই হতো সঠিক প্রতিক্রিয়া।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ এক ভয়াবহ শিল্পায়িত নিষ্ঠুরতায় পৌঁছেছিল। টোকিওতে অগ্নিবোমা হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র গর্ব করে বলেছিল, মাত্র ছয় ঘণ্টায় তারা হয়তো ইতিহাসে এর আগে কখনো এত মানুষ হত্যা করেনি- সম্ভবত এক লাখের কাছাকাছি।
যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশ গভীর আত্মসমালোচনায় নেমেছিল এবং যুদ্ধের নৃশংসতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। বিশেষ করে বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করার জন্য। উদাহরণস্বরূপ, জেনেভা কনভেনশনসের অতিরিক্ত প্রটোকলে বলা হয়েছে, বেসামরিক মানুষ যেসব অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে- যেমন পানির উৎস, তা ধ্বংস করা বৈধ নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সভ্যতার মুখোশ যেন খুলে যাচ্ছে।
ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়া বেসামরিক এলাকায় বোমা হামলা চালিয়েছে এবং মানুষের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রেখেছে ইসরাইল, শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। এমন অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের একটি কমিশন।
সুদানে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত একটি মিলিশিয়া বেসামরিক মানুষকে অনাহারে রেখেছে এবং গণহত্যা ও গণধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িত হয়েছে। গাজায় ব্যবহৃত অস্ত্রের বড় অংশ সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার আমিরাতের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও তারা তেমনভাবে করেনি। তবু যুক্তরাষ্ট্র এখনো- কখনো দ্বিধাগ্রস্তভাবে যুদ্ধের আইন রক্ষার দাবি করে। কিন্তু ইরানে চলমান যুদ্ধে আমরা হয়তো সেই নীতিগুলো থেকেও আরও পিছিয়ে যাচ্ছি। একসময় যে মানবিক নীতির কথা আমরা বলতাম, তা যেন এখন শিথিল হয়ে যাচ্ছে।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ উনা হ্যাথাওয়ে, যিনি আমেরিকান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল’-এর নির্বাচিত সভাপতি তিনি বলেছেন- ইরানের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে। কারণ এটি না জাতিসংঘের অনুমোদন পেয়েছে, না তা তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার জন্য অপরিহার্য ছিল। তিনি আরও বলেন, কিছু মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নও তুলতে পারে।
মেয়েদের একটি স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার খবর এসেছে। সেখানে প্রায় ১৭৫ জন নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি এটি সত্যিই একটি ভুল হয়, তবে তা যুদ্ধাপরাধ নাও হতে পারে। কিন্তু যদি লক্ষ্য নির্ধারণে পুরনো তথ্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং তা অসাবধানতার ফল হয়, তাহলে এটি যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি পানিশোধন কেন্দ্রেও হামলা করেছে, যা ৩০টি গ্রামে পানি সরবরাহ করতো, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দায় অস্বীকার করেছে। ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, হামলায় ১৭ হাজারের বেশি বাড়ি, ৬৫টি স্কুল ও ১৪টি চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশে এ পর্যন্ত ১১০০-এর বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে।
মার্কিন আইন বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক যুদ্ধাপরাধ প্রসিকিউটর ডেভিড ক্রেন বলেন, যদি কোনো স্থাপনা প্রধানত বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়, যেমন পানিশোধন কেন্দ্র, তাহলে সেটিতে হামলা করা যুদ্ধাপরাধ। তিনি সতর্ক করেছেন, আমরা এখন ‘আইনহীন যুদ্ধের যুগে’ প্রবেশ করছি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও এই প্রবণতাকে উস্কে দিচ্ছে।
আমি আশঙ্কা করি, যদি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েন এবং লক্ষ্যবস্তুর তালিকা ফুরিয়ে আসে, তাহলে তিনি হয়তো বিদ্যুৎব্যবস্থা, সড়ক বা সেতুর মতো দ্বৈত ব্যবহারের অবকাঠামোতে হামলার প্রলোভনে পড়তে পারেন, যাতে ইরানকে শাস্তি দেয়া যায় এবং এমন দুর্ভোগ সৃষ্টি করা যায় যা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ উস্কে দেবে।
আসলে প্রেসিডেন্ট ও তার ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যেই এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা তাদের এমনভাবে আঘাত করবো যে তারা বা তাদের সাহায্যকারী কেউই ওই অঞ্চলকে আর পুনর্গঠন করতে পারবে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘বোকা ধরনের যুদ্ধের নিয়ম’ বলে সমালোচনা করেছেন এবং পেন্টাগনের সেই দপ্তর বন্ধ করে দিয়েছেন, যা যুদ্ধের সময় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করতো।
সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, আমরা তাদের ওপর ভয়াবহভাবে হামলা চালাবো। সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানকে এমনভাবে ধ্বংস করবে যে, দেশ হিসেবে পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে- মৃত্যু, আগুন ও তাণ্ডব নেমে আসবে।’ মার্কিন সামরিক কৌশল বিশ্লেষক ফিলিপস ও’ব্রায়েনের ভাষায়, এটা যেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যুদ্ধাপরাধগুলোর একটির হুমকি।
অন্যান্য দেশও বিষয়টি লক্ষ্য করছে। কিছু নেতা ইরানের ওপর হামলাকে সমর্থন করলেও স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধকে বেপরোয়া ও অবৈধ বলেছেন। সুইজারল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, মার্কিন হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডোমিনিক দ্য ভিলপাঁ বলেছেন, এই যুদ্ধ অবৈধ, অযৌক্তিক, অকার্যকর এবং বিপজ্জনক। তিনি নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিছু মানুষের চোখে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে একটি ‘নিয়ন্ত্রণহীন রাষ্ট্রে’ পরিণত করার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এই যুদ্ধের বিরোধিতার আরও বাস্তব কারণ আছে।
এটি ইরানের একনায়কতন্ত্রকে পতন ঘটাতে পারেনি; বরং নতুন ও সম্ভবত আরও কঠোর নেতা মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় এনেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং সার সরবরাহও হুমকির মুখে পড়েছে। অসংখ্য প্রাণহানি ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও আপাতত আমেরিকান ও ইরানি- উভয় জনগণই আগের চেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। অবসরপ্রাপ্ত চারতারকা জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্ক আমাকে বলেছেন, এই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন হলো ভবিষ্যৎ।
জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা সীমিত করার জন্য যে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল তা এখন ভেঙে পড়ছে। জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর লার্স ক্লিংবাইল বলেছেন, আমরা এমন এক পৃথিবীর দিকে এগোচ্ছি যেখানে আর কোনো নিয়ম থাকবে না। আর দুঃখজনকভাবে, সেই পথ দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই।
সংক্ষেপে বলা যায়, এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরও আমরা হয়তো এটিকে মনে রাখবো এমন এক সময় হিসেবে, যখন মানবিক যুদ্ধনীতি সীমিত করার যে ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা একসময় আমরা নেতৃত্ব দিয়েছিলাম, তা থেকে আমরা সরে এসেছি। যদি সত্যিই তা ঘটে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো মানবজাতি।