Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ বর্জন করে কক্ষ ত্যাগ করলেও সেই ভাষণের ওপরই ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। রবিবার (১৫ মার্চ) সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এ তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভাষণ দিয়েছেন। আমাদের বিরোধীদলীয় বন্ধুরা সেই ভাষণ শুনতে চাননি, তারা চলে গিয়েছেন। ভালো কথা। কিন্তু সেই ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য তারা ৫০ ঘণ্টা বরাদ্দ করার প্রস্তাব করেছেন। যদি রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা হয়— তবে সংখ্যানুপাতে আমরা সময় বরাদ্দ করবো। একে আমরা এপ্রিশিয়েট করি।” 

 

বিরোধী দলের অবস্থান ও যুক্তি 

বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন পিরোজপুর-১ আসনের এমপি মাসুদ সাঈদ। তিনি জানান, ভাষণের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো তুলে ধরা যায় বলেই তাদের দলীয় আমির এমন সময়ের পক্ষে মত দিয়েছেন।

তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন ভিন্ন সুর প্রকাশ করেছেন। 

রংপুর-৪ আসনের এমপি আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রথমত আমরা এই রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই। কারণ জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা আমাদের ছাত্র জনতাকে হত্যা করলেও রাষ্ট্রপতি কোনও ধরনের ভূমিকা রাখেননি। তিনি ফ্যাসিবাদের অন্যতম সহযোগী। ক্ষমতাসীন বিএনপি সংবিধানের দোহাই দিয়ে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।” 

তিনি আরও বলেন, “রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। ভাষণ নিয়ে সংসদে ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব কে দিয়েছে, সেটি বড় কথা নয়। আলোচনায় কী থাকবে সেটিই বিবেচ্য বিষয়। আমরা মনে করি আলোচনায় তার ভাষণের সমর্থন বা স্তুতিবাদের কোনও সুযোগ নেই।” 

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাষ্ট্রপতি ফ্যাসিস্টের দোসর ছিল। তাই সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে তার ভাষণের সময় আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। এখন কার্য উপদেষ্টার বৈঠকে তার ভাষণের ওপর আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। আমরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করলেও ফ্যাসিবাদের সব অপকর্ম তুলে ধরবো।”

স্ববিরোধিতা ও দ্বিচারিতার অভিযোগ 

গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ বিষয়টিকে ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যেই ভাষণ প্রত্যাখ্যান করা হলো, সেই ভাষণ নিয়ে ৫০ ঘণ্টা আলোচনার প্রস্তাব স্ববিরোধী। বর্তমান রাষ্ট্রপতির কাছেই বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ শপথ নিয়েছিলেন, তখন তিনি ভালো ছিলেন আর এখন খারাপ—আসলে এটি এক ধরনের দ্বিচারিতা।”  

সংসদীয় রীতি ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন 

বিরোধী দল যে বক্তব্যের জেরে ‘ওয়াকআউট’ করেছেন, সেই ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। হিসাব করলে দেখা যায়, এতে একেকজন সংসদ সদস্য ১২ মিনিট করে কথা বলতে পারবেন। তার মানে, সর্বোচ্চ ১২০০ শব্দ উচ্চারণ করতে পারবেন তারা। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর রিপোর্ট অনুসারে, ১১তম সংসদের প্রথম ২২ অধিবেশনের (জানুয়ারি ২০১৯ থেকে এপ্রিল ২০২৩ পর্যন্ত) পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংসদীয় কার্যক্রমে প্রতি মিনিটে ব্যয় হয় গড়ে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা। দশম সংসদ (২০১৪-১৮) চলাকালে খরচ হতো প্রতি মিনিটে প্রায় ১ লক্ষ ৬৩ হাজার টাকা। 

এই হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনায় রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ হবে। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, যে ভাষণ নিয়ে খোদ সংসদে আপত্তির ঝড় উঠেছে, তার পেছনে এত সময় ও অর্থের অপচয় কতটুকু যৌক্তিক। 

তবে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল মনে করেন, এটি সংসদের দীর্ঘদিনের রীতিনীতি। মাসুদ কামালের মতে, “রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে আবার ৫০ ঘণ্টার প্রস্তাবনা স্ববিরোধিতা। তবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন তো নিজের কথা বলেননি, তিনি সরকারের কথা বলেছেন। ক্যাবিনেটে যা পাস হয়েছে তিনি সেসব কথা বলেছেন। সেসব কথা নিয়েই সংসদে আলোচনা হবে। এটাই সংসদেরই রীতিনীতি।” 

শাহাদাত হোসেন সেলিমও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনার জন্য ৫০ ঘণ্টা বরাদ্দ হয়েছে সংসদীয় কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে। এটি সংসদের রীতি। সেখানে শুধু ধন্যবাদ প্রস্তাবের জন্য নয়, সামগ্রিক বিষয়েই আলোচনা করবেন সংসদ সদস্যরা। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে মূল্যায়নের সুযোগ নেই।” 

উল্লেখ্য, সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনা ও ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপনের বিধান রয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নেন— যেখানে সাধারণত সরকারের নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও বিভিন্ন খাতের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে মতামত তুলে ধরা হয়।