Image description

কোমর ও হাঁটুতে ব্যথা হলেই বাড়ির পাশের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খান সোলায়মান প্যাদা (৬০)। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও কখনোই ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কোর্সের ওষুধ খাননি। সুস্থতাবোধ করলেই ছেড়ে দিতেন, ব্যথা শুরু হলে আবারও খেতেন। এমন নিয়ন্ত্রহীন ওষুধ সেবনে হঠাৎ অসুস্থতা নিয়ে সপ্তাহ খানেক আগে রাজধানীর জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে (নিকডু) ভর্তি হন তিনি। পরীক্ষায় কিডনিতে সমস্যা পেয়েছেন চিকিৎসকেরা।

 

গত ৮ মার্চ হাসপাতালের ওয়ার্ডে কথা হয় সোলায়মানের ছেলে মো. মিজানুরের সঙ্গে। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘ছয় মাস আগে হাঁটু আর কোমর ব্যথার জন্য ডাক্তার দেখানো হলেও নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো হয়নি। অসুস্থ হলে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হতো। হঠাৎ করেই রক্তের চাপ বেড়ে গেলে পটুয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তারা ঢাকায় রেফার্ড করে।

 

কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনিতে সমস্যা হয়ে থাকে। এ রোগ থেকে বাঁচতে দ্রুত শনাক্তকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি অপ্রয়োজনে যে কোনো ব্যথার ওষুধ না খাওয়া। পাশাপাশি যেসব রোগের ওষুধে কিডনি রোগের ঝুঁকি রয়েছে সেসব ওষুধেও বিশেষ চিহ্ন রাখা দরকার বলেও মনে করেন চিকিৎসকেরা।

 

এমন বাস্তবতা নিয়েই বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি রোগ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য-‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণিরে।’

 

দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা নিয়ে সরকারের হাতে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। দিবসটি উপলক্ষে গত ৮ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবে কিডনি ওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) কর্তৃক আয়োজিত গোল টেবিল বৈঠকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বৃতি দিয়ে জানানো হয়, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত, যা ডায়াবেটিস রোগীর প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যানসারের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ। শুধু আক্রান্ত নয়, মৃত্যুর হারও বাড়ছে কিডনিতে। তিন দশক আগে কিডনি রোগে মৃত্যু বিশ্বে ১৯তম থাকলেও বর্তমানে তা সপ্তম। যেভাবে রোগী বাড়ছে তাতে ২০২৮ সাল নাগাদ মৃত্যুর দিক থেকে পাঁচ নম্বরে চলে আসতে পারে কিডনি রোগ।

 

বর্তমানে দেশের প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এরমধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়। কিন্তু ডায়ালাইসিসের আওতায় আসছে মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রোগী। বাকিরা চিকিৎসার বাইরে থেকে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন।

 

আবার প্রতিবছর অন্তত পাঁচ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও হচ্ছে ৫শ’রও কম। সরকারিভাবে বর্তমানে শুধু নিকডুতে (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি) মাসে দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন হচ্ছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ২০২৪ সাল থেকে নিয়মিত প্রতিস্থাপন হলেও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। বেসরকারিভাবে কিডনি ফাউন্ডেশন বছরে ৮০টির মতো প্রতিস্থাপন করে থাকে। আর সবচেয়ে বেশি করে সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতাল। সিকেডির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রতিবছর ৩ শতাধিক কিডনি প্রতিস্থাপন করছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বোচ্চ দুই হাজার কিডনি প্রতিস্থাপনের মাইলফলক ছুঁয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

 

বিএমইউয়ের নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যথার ওষুধ থেকে আকস্মিকভাবে কিডনি রোগের ভয়াবহতা ছড়াতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক। অনেকে তীব্র ব্যথা থেকে বাঁচতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিাবয়োটিক কিনে খান। যা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেসব কিডনি রোগী আসে তার ১৫ শতাংশের বেশি পাওয়া যায় যারা নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধ ব্যবহার করতেন। এটি খুবই উদ্বেগজনক।’

 

সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের (এনআইএলএমআরসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, হাসপাতালে যেসব রোগী আসছেন তাদের প্রায় ৭২ শতাংশই চিকিৎসার অযোগ্য। যারা রোগ নির্ণয়ের আগেই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেছেন। এতে করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হচ্ছে। এমনকি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রোগীদের বড় একটি অংশের মৃত্যুর পেছনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া দায়ী বলে মত চিকিৎসকদের।

 

কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ মইনুল খোকন বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কিডনি রোগের ব্যাপক বিস্তার ঘটাচ্ছে। পাতলা পায়খানা হলেও অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া হচ্ছে। আবার অনেকেই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী পূর্ণ কোর্সের অ্যান্টিবায়োটিক খান না, এতে করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হচ্ছে। ফলে রোগীর ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণে আসছে না, রক্তে ছড়িয়ে যাওয়ায় কিডনি বিকল হচ্ছে।’

 

এই চিকিৎসক বলেন, ‘কিডনি রোগ থেকে বাঁচতে হলে প্রতিরোধের বিকল্প নেই। এজন্য দরকার দ্রুত সময়মতো শনাক্তকরণ, সহজসাধ্য ও আধুনিক চিকিৎসা। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনির ছাকনি রোগের কারণে কিডনি রোগ হয়ে থাকে। এ ছাড়াও পাঁচড়া (স্ক্যাবিস) ও টনসিলের কারণেও হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঘটে ব্যথায় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার। নারীদের ব্যথার বড় কারণ মানসিক দুশ্চিন্তা। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সবকিছু স্বাভাবিক আসলেও কোমরসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথা লেগেই থাকে। আবার পুরুষদের এমন কোনো পেশা নেই যেখানে মানসিক চাপ নেই। এটাও বড় একটি কারণ। এ থেকেও কিডনি বিকলে ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য যেসব ওষুধ খেলে কিডনি রোগের ঝুঁকি থাকে, সেগুলোতে আলাদা চিহ্ন থাকা উচিত।’

 

ডা. মঈনুল খোকন বলেন, ‘কিডনি বিকলের পাঁচটি ধাপের প্রথম দুই ধাপে কিডনি সমস্যা শনাক্ত করা গেলে প্রতিরোধ সম্ভব। এজন্য প্রাপ্ত বয়স্ক সবারই প্রস্রাব পরীক্ষা করা উচিত। এতে রক্তের চাপ কেমন ও প্রস্রাবে গ্লুকোজ যাচ্ছে কি না, সেটি জানা যাবে। একই সঙ্গে কিডনি বিকল হয়েছে কি না সেটিও উঠে আসবে। এতে খরচ হবে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। এজন্য প্রেগনেন্সি টেস্টের মতোই যাতে সহজে মানুষ নিজে থেকে জানতে পারে সেজন্য ফার্মেসিতে এই পরীক্ষার উপকরণ থাকা উচিত।’

 

একই ভাষ্য বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদের। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘রোগীরা ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিকসহ ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার করে থাকেন। কিডনি জটিলতার এটি বড় একটি কারণ। প্রাথমিক অবস্থায় থাকতে এই রোগ নির্ণয় করা গেলে প্রতিরোধের মাধ্যমে রোগী অর্ধেকে নেমে আসবে। এটি না হওয়ার পেছনে চিকিৎসকদেরও গাফিলতি রয়েছে। তারা কম টাকার পরীক্ষা দিতে চান না। এজন্য ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিককে কাজে লাগানো যেতে পারে। সেখানে ইউরিন পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনিতে আক্রান্ত কি না জানা সম্ভব।’