বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক (ইউনিফর্ম) পরিবর্তন নিয়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন 'আয়রন গ্রে' রঙের ইউনিফর্ম নিয়ে খোদ পুলিশ সদস্যদের মধ্যেই দেখা দিয়েছে তীব্র অনীহা। এই পরিস্থিতিতে পুরনো সেই চিরচেনা নীল রঙের পোশাকে ফিরে যাওয়ার জোরালো দাবি উঠেছে।
ইতোমধ্যে পুরোনো পোশাকে ফেরার জন্য পুলিশের শতভাগ সদস্য মতামত দিয়েছেন। পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে মতামত চাওয়া হলে মাঠপর্যায় থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপাররা (এসপি) পোশাক পরিবর্তনের পক্ষে সদর দপ্তরে বার্তা পাঠানো শুরু করেছেন বলে এশিয়া পোস্টকে একাধিক ইউনিট প্রধান নিশ্চিত করেছেন।
বাহিনীটির পোশাকের রং পরিবর্তন নিয়ে এখন শুধু প্রশ্ন নয়, ‘আয়রন গ্রে’ শার্ট ও ‘চকলেট ব্রাউন’ প্যান্ট চালুর জন্য ইতোমধ্যেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। আবার পুরোনো নীল পোশাকে ফিরতে হলে নতুন করে আরও শতকোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন। সবকিছু মিলিয়ে পুরোনোতে ফিরতে হলে হিসাব মেলাতে হবে ২০০ কোটি টাকার।
তবে মোটা অঙ্কের এত পরিমাণ অর্থ গচ্চা কোনো বিষয় না বলে মনে করেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) খোদা বকশ চৌধুরী। কয়েক মাস আগে তড়িঘড়ি করে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন আবার বাহিনীর সদস্যরাই সেই পোশাকের পরিবর্তনের দাবি তুলছেন।
রাষ্ট্রের জনমত উপেক্ষা করে পোশাক পরিবর্তনের কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, এমন প্রশ্ন করা হলে খোদা বকশ চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে পোশাক পরিবর্তন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া হয়। নতুন পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি নই। একটা পোশাক কত দিন যায়? সে সময় সবার পোশাক পরিবর্তন হয়নি। কিছু পরিবর্তন বাকি আছে। এটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। পোশাক পরিবর্তন হতেই পারে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশ ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এখন অর্থ ও প্রশাসনিক দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ‘আয়রন গ্রে’ শার্ট ও ‘চকলেট ব্রাউন’ প্যান্ট চালুর জন্য ইতোমধ্যে সরকারের শতকোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সদস্যদের অসন্তোষ এবং জনমতের চাপের কারণে আবার পুরোনো নীল রঙের পোশাকে ফিরতে হলে নতুন করে আরও শতকোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। পোশাকের আরাম নিয়ে যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি আর্থিক বাজেটও মাথায় রাখা হয়েছে।
সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে পুলিশের জনবল প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার। চলমান নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হলে সদস্য সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার। একজন সদস্যের এক সেট ইউনিফর্মে গড়ে ৪ গজ কাপড় লাগে। বাহিনীর সবার জন্য এক সেট পোশাক হিসেবে প্রয়োজন হবে ৯ লাখ ২০ হাজার গজ কাপড়। বছরে দুই সেটের হিসাব করলে দরকার ১৮ লাখ ৪০ হাজার গজ কাপড়। প্রতি সেট খরচ ধরলে (২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা), পুরো বাহিনীর জন্য নতুন করে ব্যয় হতে পারে ১০০ থেকে ১৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে ২০০ থেকে ২৩০ কোটি টাকার হিসাব দাঁড়ায়।
নারী পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত খরচও রয়েছে। বর্তমানে বাহিনীতে নারী সদস্য রয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার ২৭৬ জন। তাদের জন্য বিশেষ কাটিং ও ডিজাইনের ইউনিফর্ম তৈরি করতে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। সরকার পরিকল্পনা অনুযায়ী নারী পুলিশের সংখ্যা ৩০ হাজারে উন্নীত করলে খরচ আরও বাড়বে।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন নতুন ইউনিফর্মের রং ও কাপড়ের মান নিয়ে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরে পুরোনো পোশাকে ফেরার দাবি জানায়। বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর আমলে নিয়ে সারা দেশের পুলিশ সুপারসহ ইউনিট প্রধানদের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠায়। পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানার পর পুলিশ সুপাররা নিজ জেলার কল্যাণ সভার মাধ্যমে মতামত চান।
এ বিষয়ে যশোর জেলার কল্যাণ সভার বিষয় তুলে ধরে পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার জেলার পুলিশ সদস্যরা শতভাগ পুরোনো পোশাকে ফেরত যেতে মত দিয়েছে।’
নতুন পোশাকে আপত্তি ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যশোর জেলায় নতুন পোশাক এখনো আসেনি। তা ছাড়া নতুন পোশাকের থেকে পুরোনো পোশাক দেখতে সুন্দর ও আরামদায়ক। তাই পুরোনো পোশাকের পক্ষে শতভাগ মতামত এসেছে।’
সিরাজগঞ্জ জেলার কল্যাণ সভার মতামত সম্পর্কে পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু জানান, তার জেলায় ৮০ ভাগ পুলিশ সদস্য পুরোনো পোশাকে ফেরত যেতে চান। তারা নতুন পোশাকে দায়িত্ব পালন করতে চাচ্ছেন না।
তখন কেন পুলিশ পোশাক পরিবর্তনের মতামত দিতে পারেননি, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এসপিদের অনলাইনে রেখে পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সে সময় বর্তমান পরিস্থিতিতে খোলা মেলা মতামত জানানোর সুযোগ ছিল না।’ এশিয়া পোস্ট