ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক বৃদ্ধের ফেলে যাওয়া টাকার ব্যাগ ফেরত দিয়ে সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন দরিদ্র চা বিক্রেতা জুবায়ের মিয়া (৪২)। এর ফলে বৃদ্ধ মিরাজ শেখ (৬৬) ফিরে পেলেন হারানো ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
টাকা ফেরত পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। বৃদ্ধ মিরাজ শেখ ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের শাহ মুল্লুকদী গ্রামের বাসিন্দা। গত ৯ ফেব্রুয়ারি হার্টের সমস্যার জন্য চিকিৎসক দেখাতে ভাঙ্গা উপজেলা সদরে এসেছিলেন। পরে তিনি বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার পাশে জুবায়ের মিয়ার দোকানে চা পান করেন। জুবায়ের ভাঙ্গা পৌরসভার চন্ডীদাসদী মহল্লার বাসিন্দা।
ওই বৃদ্ধ দোকান থেকে চলে যাওয়ার অনেক পরে টাকার ব্যাগটি জুবায়ের মিয়ার চোখে পড়ে। জুবায়ের মিয়া টাকার ব্যাগ পেয়ে টাকার মালিককে খোঁজার চেষ্টা করেন। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাগের মালিককে না পেয়ে একদিন পর তিনি ভাঙ্গা পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লায় নিজ খরচে মাইকিং করান। টাকার প্রকৃত মালিক যেন প্রমাণসহ টাকাটি নিয়ে যান—এটাই চাচ্ছিলেন জুবায়ের।
মাইকিংয়ের খবর শুনে মিরাজ শেখ বুঝতে পারেন, ওই দোকানেই তিনি বসেছিলেন। এর আগে টাকা কোথায় পড়ে গেছে, তা তিনি জানতেন না। তিনি ভাবতেও পারেননি কেউ টাকা পেয়ে প্রকৃত মালিককে পাওয়ার জন্য মাইকিং করবে।
এদিকে দোকানে টাকা পাওয়ার পর জুবায়ের ভাঙ্গার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট বিষয়টি জানান। প্রকৃত মালিককে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য তার সহযোগিতা চান। তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
অবশেষে আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে ভাঙ্গার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদরুল আলমের অফিস কক্ষে প্রকৃত মালিক মিরাজ শেখকে তার হারানো ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
চায়ের দোকানদার জুবায়ের মিয়া বলেন, আমি টাকার ব্যাগ পেয়ে হতবাক হয়ে পড়ি। কিন্তু পরের টাকা রাখার ক্ষমতা আমার নেই। টাকার প্রকৃত মালিককে খোঁজার জন্য আমি মাইকিং করি। এছাড়া আমি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্যারের নিকট বিষয়টি জানাই। এর মধ্যে খবর পাই এক বৃদ্ধ টাকা হারিয়েছেন। তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আমি প্রকৃত প্রমাণসহ তাকে আজ মঙ্গলবার ভাঙ্গা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহোদয়ের অফিসে আসতে বলি। সহকারী কমিশনার স্যারের তত্ত্বাবধানে হারানো টাকা প্রকৃত মালিককে দিতে পেরে আমি খুশি।
হারানো টাকা ফেরত পেয়ে বৃদ্ধ মিরাজ শেখ আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন। আনন্দাশ্রু লুকাতে লুকাতে তিনি বলেন, ওই দিন (৯ ফেব্রুয়ারি) তিনি তার চিকিৎসার জন্য ব্যাংক থেকে টাকাটি তুলেছিলেন। চিকিৎসক জানান, তার চিকিৎসা ঈদের পর হবে। এ জন্য তিনি ব্যাগে ভরে টাকাটি বাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন। বাড়ি গিয়ে দেখেন, টাকার ব্যাগটি নেই। টাকার চিন্তায় তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। তিনি ভাবেননি চায়ের দোকানে টাকার ব্যাগ ফেলে এসেছেন।
তিনি বলেন, জুবায়ের মিয়া অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি সৎ না হলে এই টাকা আজ আমি ফেরত পেতাম না। দশ–বিশ হাজার টাকা নয়—১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা, বিরাট ব্যাপার। টাকার ব্যাগের মধ্যে আমার ওষুধ ছিল। আমি সঠিক প্রমাণ দিতে পেরে আমার বৃদ্ধ বয়সের সঞ্চিত চিকিৎসার টাকা ফেরত পেয়েছি। এই টাকাগুলো না পেলে আমার চিকিৎসা করাই সম্ভব হতো না।
ভাঙ্গার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদরুল আলম জানান, কিছুদিন আগে ভাঙ্গা পৌরসভা এলাকার চায়ের দোকানদার জুবায়ের মিয়া তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, স্যার, আমি বেশ কিছু টাকা পেয়েছি। প্রকৃত মালিককে প্রমাণ সাপেক্ষে ফেরত দিতে চাই। তিনি আমার সহযোগিতা চান। আমি তাকে আশ্বস্ত করি। হারানো টাকা প্রকৃত মালিককে প্রমাণ সাপেক্ষে দিতে পেরে আমিও অত্যন্ত খুশি। চায়ের দোকানদার জুবায়ের মিয়া সততার প্রমাণ দিয়েছেন। অন্যদিকে বৃদ্ধ মিরাজ শেখ টাকা পেয়ে খুশি হয়েছেন।