Image description

সংসদীয় রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের বিপরীতে ছায়া সরকার হিসেবে ভূমিকা রাখতে হয় বিরোধী দলকে। সরকারের যেকোনও বেআইনি বা গণবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গঠনমূলক সমালোচনা করাই হচ্ছে তাদের কাজ। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।

তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীতে এক্ষেত্রে দারুণ শূন্যতা বিরাজমান ছিল। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা। ঠুনকো অজুহাতে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট, দিনের পর দিন সংসদ বয়কট করে রাজপথে হরতাল-অবরোধ ও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সংসদ থেকে পদত্যাগ—এসবই যেন ছিল বিরোধী দলের একমাত্র বৈশিষ্ট্য।

আবার গত এক দশকে তাও ছিল না। বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংসদে বিরোধী দল থাকলেও তারা সরকারের ভুলত্রুটি যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেননি। কখনও সরকারের বন্দনা বা বিশেষ সুবিধা ভোগ করাসহ নানা কারণে তারা আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেননি।

তবে বিগত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়। মাঠে নেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের কার্যক্রম। এ জোটের সবচেয়ে বড় মিত্র জাতীয় পার্টি নির্বাচনে থাকলেও চরম ভরাডুবি হয়েছে। জিততে পারেনি একটি আসনেও।

সেক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আসন নিয়ে বিরোধী দলের কাতারে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। নির্বাচনে জামায়াত ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টিসহ ৭৭টি আসন লাভ করে এই জোট। ইতোমধ্যে তাদের যৌথ সভায় প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

১৯৯৬ সালের পর গত তিন দশকে এত বেশি আসন নিয়ে বিরোধী দল হওয়ার নজির নেই। সেই ক্ষেত্রে এবারের বিরোধী দল নিয়ে এক ধরনের আলোচনা আছে। বিশেষ করে বিগত সরকারের সময়ে সংসদে না থাকলেও রাজপথে সক্রিয় ছিল আজকের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেতারা সরকারের বিপক্ষে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন। নবীন-প্রবীণের সমন্বিত বিরোধী দল এবার কী শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারবে? রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেজারি বেঞ্চের বিপক্ষে জবাব দিতে তারা কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন?

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা অতীতে প্রধান বিরোধী দলে না থাকলেও সংসদ ও রাজপথে জোরালো ভূমিকা রেখেছি। সরকারের বিরুদ্ধে যৌক্তিক ও গঠনমূলক সমালোচনা করেছি। বিগত তিনটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও রাজপথে আমাদের ভূমিকা ছিল আপসহীন। এবার যেহেতু আমরা প্রধান বিরোধী দলের আসনে আছি, তাই আমাদের চেষ্টা থাকবে গঠনমূলকভাবে সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার। এ বিষয়ে আমাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে কর্মশালাসহ বিভিন্নভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস, জাতি এবার নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল দেখতে পাবে।’’

সংসদে বিরোধী দলের কাজ কী, প্রধান নেতার মর্যাদা কতটুকু?

সংসদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার প্রধানই হন সংসদ নেতা। এতে ট্রেজারি বেঞ্চে বসেন তিনিসহ তার দলের শীর্ষ নেতারা। অপরদিকে বসেন বিরোধীদলীয় নেতা।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২(১)(ট) ধারা অনুযায়ী, ‘বিরোধী দলের নেতার অর্থ স্পিকারের বিবেচনা মতে—যে সংসদ সদস্য সংসদে সরকারি দলের বিরোধিতাকারী সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য নিয়ে গঠিত ক্ষেত্রমত দল বা অধিসংঘের নেতা।’

কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিরোধী দলের স্বীকৃতির বিষয়টি স্পিকারের একক এখতিয়ারের বিষয়। তবে রেওয়াজ অনুযায়ী, সরকারি দলের পর যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই দলই প্রধান বিরোধী দল এবং সেই দলের নেতা বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা লাভ করেন।

সর্বশেষ ২০২১ সালে পাস হওয়া নতুন আইন অনুযায়ী, বিরোধীদলীয় নেতা রাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মর্যাদা ভোগ করবেন।

অতীতের বিরোধী দলের আসনে ছিলেন কারা?

সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ১২টি সংসদের মধ্যে প্রথম ও ষষ্ঠ সংসদে কোনও বিরোধী দল ছিল না। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়েছিল।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতবিহীন নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

দেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রথম দৃশ্যমান হয় ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে। সেই নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে এবং বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন দলটির নেতা আসাদুজ্জামান খাঁন।

১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় পার্টি সরকার গঠন করে। এতে আওয়ামী লীগ ৭৬টি আসনে জয়ী হয়ে বিরোধী দলের আসনে বসে এবং শেখ হাসিনা হন বিরোধী দলের নেতা।

তবে এই সংসদের মেয়াদ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই সংসদে সম্মিলিত বিরোধী দলের নেতা হন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (বর্তমান জেএসডি) আ স ম আবদুর রব।

পরবর্তীকালে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে। ১৮ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে তারা। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেলে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। আর ১১৬টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে বিএনপি। এই সংসদে বিরোধী দলের নেতা হন বেগম খালেদা জিয়া।

এরপর ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। এই সংসদে ৫৮টি আসন পেয়ে বিরোধীদলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে জয়ী হয়। অবশ্য পরবর্তীতে ২০১৪, ১৮ ও ২৪ সালে বিএনপি ও জামায়াতসহ বেশিরভাগ দলের বয়কটের নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। আর তিনটি সংসদেই বিরোধী দলের আসনে যায় এরশাদের জাতীয় পার্টি। তারাও সঠিক দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

অধিবেশন বয়কটের ধারাবাহিকতা ও এর প্রভাব

অতীতে সরকারি দল যেমন বিরোধী দলের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ করেনি, তেমনই বিরোধী দল পান থেকে চুন খসলেই ওয়াকআউট করে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেছে। স্পিকারের উদ্দেশে ফাইল ছুড়ে ফেলেছে। রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে।

বিশেষ করে সপ্তম সংসদের (১৯৯৬-২০০১) পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি সংসদ বয়কটের সংস্কৃতি শুরু হয়। এর মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলে একবার সরকারে আওয়ামী লীগ, আর বিরোধী দলে বিএনপি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোটামুটি এমনটাই চলে আসছিল। ঠুনকে অজুহাতে ওয়াকআউট করতো বা দিনের পর দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকতো। আবার পদ বাতিল হওয়া ঠেকাতে তিন মাসের মাথায় এসে হাজিরা দিতো।

এর মধ্যে এই প্রবণতা চরম আকার ধারণ করে অষ্টম সংসদে (২০০১-২০০৬), যখন আওয়ামী লীগ মোট কার্যদিবসের প্রায় ৬০ শতাংশ সময় সংসদ থেকে অনুপস্থিত ছিল। যদিও নবম সংসদে (২০০৯-২০১৩) বিএনপি সংসদীয় কমিটির সভাগুলোতে অংশ নিয়েছিল, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে তারা প্রায় ৭৪ শতাংশ অধিবেশন বর্জন করে।

আর ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিরোধী দলে থাকলেও সংসদের ভেতরেও বাইরে কোনও ক্ষেত্রেই বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বের প্রতি সুবিচার করতে পারেনি জাতীয় পার্টি।

এবার ব্যতিক্রম কী প্রত্যাশা?

অতীতে প্রাণবন্ত ও কার্যকর সংসদ খুব একটা দেখা যায়নি। তবে অনেক সময় সংসদে ক্ষমতাসীন দলের বিপরীতে ঝাঁঝালো ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে বিরোধী দলকে। কখনও কখনও সংসদ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পয়েন্ট অব অর্ডারে কথার লড়াই হয়েছে। টিকতে না পেরে বিরোধী দলের সদস্যদের বের হওয়ার নজির দেখা গেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অতীতে বিরোধী দলগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তাই অনেক সময় প্রাণবন্ত সংসদ পাওয়া যায়নি। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী নির্বাচনে যারা বিরোধী আসনে যাচ্ছে, তারা কতটুকু দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সেটি দেখার বিষয়। তবে তাদের কাছে গঠনমূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করি।’’

জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের হুঁশিয়ারি-আত্মবিশ্বাস

প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছরের মাথায় প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনে তারা এককভাবে ৬৮টিসহ জোটগতভাবে মোট ৭৭টি আসন লাভ করেছে। এতে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান।

একই জোটের আরেকটি দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি আসনে জয়ী হয়ে রাজনৈতিক ময়দানে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। কারণ দলটির প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় এমন ফলকে অনেকে অভাবনীয় মনে করছেন।

তাই দুই দলের নেতারাই নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে আত্মবিশ্বাসের কথা বলছেন। তাদের দাবি নবীনদের তারুণ্য আর প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে তারা নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরতে পারবেন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ছাত্রশক্তির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও  জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘‘আমরা সংসদে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চাই। তবে ঠিকমতো কথা বলতে না দিলে আন্দোলন রাজপথে গড়াবে।’’

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীতে দলের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, সরকারের যৌক্তিক ভুলত্রুটিগুলো তুলে ধরবেন আমাদের সদস্যরা। তবে দেশ ও জাতির স্বার্থে আমরা প্রয়োজন কঠোর হতে বাধ্য হবো।’’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জনপ্রত্যাশা পূরণে আমাদের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ থাকবে। এ জন্য সদস্যদের সে বিষয়ে দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে সে ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কর্মশালাও হয়েছে। আশা করি সময়ের ব্যবধানে আমাদের করণীয়গুলো আরও আয়ত্তে আসবে।’’