Image description

সিলেট নগর ভবন। অনেকের কাছে ভয়ের। অনেকের কাছে ‘টাকার মেশিন’। নাগরিক সেবা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। কোনোকালেই যে সেবা ভালো ছিল সেটি বলা মুশকিল। পঁচিশ বছর বয়সী এ করপোরেশন পথ হারিয়েছে বার বার।

গণ-অভ্যুত্থানের দিনই গাঢাকা দেন আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। পাড়ি জমান লন্ডনে। তার এই চলে যাওয়ায় শূন্য হয় সিটির মসনদ। সরকার বিলম্ব করেনি। স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারকে প্রশাসক করে। তার নেতৃত্বেই দীর্ঘ ১৮ মাস কেটেছে সিটির কার্যক্রম। এক জায়গায় ছিল শূন্যতা। সেটি হচ্ছে বিভাগীয় কমিশনার সময় দিতে পারতেন না। নিজের দপ্তরের প্রশাসনিক কাজ শেষ করে তাকে সিটিতে সময় দিতে হতো। এতে করে সিটির কার্যক্রমে বেশ ভাটাই পড়েছিল।

অফিসের কার্যক্রম, চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম, নাগরিক সেবা যাই বলেন সবখানেই ছিল গলদ আর গলদ। আর মাঝখানে কয়েক মাস তো নগর ভবনের সব কাজে হস্তক্ষেপ করেছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। তারা যা বলেছেÑ তা-ই করেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। স্থবির হয়ে পড়েছিল সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম।

এ অবস্থায় বিএনপি’র সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসক পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। সিলেটের দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের পিএস হওয়ার কারণে সিলেটের উন্নয়ন কার্যক্রমে তার ভালো ধারণা থাকলেও সিটির কার্যক্রমে তিনি নতুন মুখ। এটি হচ্ছে সিলেটের জন্য বর্তমান সরকারের প্রথম ‘চমক’। কাইয়ূম চৌধুরীকে বরণ করে নিয়েছেন সবাই। বসেছেন সিটির মসনদে।

প্রথম দিন ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল ৯টা বাজার ১০ মিনিট আগেই পৌঁছেছিলেন নগর ভবনের নিচ তলার প্রবেশ দ্বারে। ৫ মিনিট পর আসেন প্রধান নির্বাহী। কাইয়ূম চৌধুরী নতুন প্রশাসককে নিয়ে যান বিভিন্ন দপ্তরে। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে হতাশ হন। ইচ্ছেমতো অফিস করেন সিটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অনেক দপ্তরই ছিল কর্মকর্তা-কর্মচারীশূন্য।

বিষয়টি নিয়ে প্রশাসক কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। জানালেনÑ যেখানে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টার আগেই অফিসে চলে যান সেখানে আমাদের একই ভাবে আসতে হবে। কোনো ব্যত্যয় করা ঠিক হবে না। সিলেট নগরের প্রশাসক হিসেবে কাইয়ূম চৌধুরীর সামনে বড় কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সিলেট নগর ভবন এখনো দাপ্তরিকভাবে অ্যাক্টিভ হতে পারেনি। বিগত মেয়ররা নিজেদের মতো করে চালিয়েছে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম। এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা তিন মেয়রেই রয়েছে ‘নিজস্ব সিন্ডিকেট’। এটি নগর ভবনের ভেতর থেকেই গড়ে ওঠা। এই সিন্ডিকেটের কারণে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থানা কর্মকর্তারাও সুযোগ বুঝে হেলে পড়েন। আর প্রধান নির্বাহী ও চিফ ইঞ্জিনিয়াররা সব সময়ই সিন্ডিকেটদের প্রাধান্য দিয়ে চলেন। নগর ভবন সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছে স্বপ্নের কার্যালয়। তারা ওখান থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আয় করেন। বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছে। এসবের লাগাম টেনে ধরা হবে নতুন প্রশাসক কাইয়ূম চৌধুরীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়নকাজ পট পরিবর্তনে থমকে গিয়েছিল। পরে অবশ্য বর্তমান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর হস্তক্ষেপে কাজ চলমান থাকে। সিলেট নগরের পরিধি এখন অনেক বড়। আগের চেয়ে দ্বিগুণ। নতুন ১৫টি ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী পূর্বের আরিফুল হক চৌধুরীর রেখে যাওয়া উন্নয়নের পথ ধরে হাঁটছিলেন। এই কাজগুলোকে এখন বেগবান করা হচ্ছে নতুন প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জের। নাগরিক সেবা শূন্যের কোটায়। নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের ১৮ মাস আগেই বাদ দেয়া হয়েছে। এখন চলছে সচিবনির্ভর কার্যক্রম। অফিসাররা রয়েছেন দায়িত্বে। এক নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট নিতেই সময় লাগে দুই সপ্তাহ। তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের জন্য দৌড়ঝাঁপ করে কাউকে পাওয়া যায় না।

সুতরাং ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় প্রশাসকের কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনা চ্যালেঞ্জের হবে বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন সাবেক কয়েকজন কাউন্সিলর। তারা বলেন-স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রম স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ছাড়া চালিয়ে নেয়া কঠিন। এদিকে গত ১৮ মাসে নগরবাসীকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে সেটি হচ্ছে মশা। এর যন্ত্রণায় অস্থির ছিল নগরের মানুষ। সিলেট সিটি করপোরেশন থেকে নামমাত্র মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা বলছেন, তাদের কাছে বাজেটও কম। যে বাজেট দেয়া হয় সেটি দিয়ে গোটা নগরে কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয় না। সামনে বর্ষার মৌসুম। বৃষ্টি হলেই ডুবে সিলেট নগর। যদিও ইতিমধ্যে ছড়া, খাল ও নালা পরিষ্কার করা শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু তদারকির অভাবে সেই কার্যক্রমও ঠিকমতো হচ্ছে না। অনেক স্থানে ময়লা পড়ে আছে দিনের পর দিন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে চিফ ইঞ্জিনিয়ার আলী আকবরের কাজের অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে নগর পরিকল্পনাবিদদেরও। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিরও অভিযোগ রয়েছে। ফলে সিলেট নগরের গতিপথকে সঠিক পথে নিয়ে আসা হবে কাইয়ূম চৌধুরীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দায়িত্ব নিয়ে কাইয়ূম চৌধুরী জানিয়েছেনÑনাগরিক সেবা বাড়ানোই হচ্ছে তার জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই তিনি কাজ শুরু করেছেন।