Image description

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকাগুলোতে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। গেল তিন বছরে (২০২৩-২৫) এ অঞ্চলে ১৬ হাজার ৭২০ বিচ্ছেদের (তালাক) আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে কার্যকর হয়েছে ১৫ হাজার ৮৬৫। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক কলহ এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাবে তালাকের আবেদনের সংখ্যা প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে।

ডিএনসিসির তিন বছরের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়কালে সবচেয়ে বেশি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে মোহাম্মদ ও কারওয়ান বাজারে। পরবর্তী শীর্ষ অবস্থানগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে মিরপুর ও গুলশান-বাড্ডা এলাকা। তিন বছরে সবচেয়ে কম বিচ্ছেদের আবেদন এসেছে এবং কার্যকর হয়েছে ভাটারা থেকে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নারীরাই বিচ্ছেদের আবেদনের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। তিন বছরে ডিএনসিসিতে নারীদের আবেদন পড়েছে ১০ হাজার ৪৮০, যা মোট আবেদনের প্রায় ৬২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। একই সময়ে তালাকের জন্য পুরুষের আবেদন জমা হয়েছে ৬ হাজার ২৪০, যা মোট আবেদনের ৩৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।

শীর্ষে মোহাম্মদপুর-কারওয়ান বাজার

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০ অঞ্চলের তিন বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন পড়েছে ৫ হাজার ৪১৪, ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৪৫৯ এবং ২০২৫ সালে ৫ হাজার ৮৪৭।

এর মধ্যে মোহাম্মদপুর ও কারওয়ান বাজার (অঞ্চল-৫) এলাকায় বিচ্ছেদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে এখানে তালাকের আবেদন জমা পড়েছে ১ হাজার ৪৯৪, ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫৪১ এবং ২০২৫ সালে জমা পড়েছে ১ হাজার ৫৭৬ আবেদন। তিন বছরে মোট আবেদনের সংখ্যা ৪ হাজার ৬১১। এর মধ্যে তিন বছরে যথাক্রমে বাস্তবায়ন হয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৩৬, ১ হাজার ৪৭০ ও ১ হাজার ৩৭১। এ অঞ্চলে ২০২৫ সালে জমা হওয়া ১ হাজার ৫৭৬ আবেদনের মধ্যে ১ হাজার ১৪৭টিই করেছেন নারীরা।

দ্বিতীয় অবস্থানে মিরপুর
তালাকের আবেদন ও কার্যকরের হিসেবে তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিরপুর (অঞ্চল-২)। ২০২৩ সালে এ অঞ্চলে আবেদন পড়েছে ১ হাজার ৪৩৫, কার্যকর হয়েছে ১ হাজার ৩৮৮। পরের বছর আবেদনের সংখ্যা ১ হাজার ৬২২ এবং কার্যকর ১ হাজার ৫৯৮। ২০২৫ সালে ১ হাজার ৫৪৬ আবেদনের বিপরীতে কার্যকর হয়েছে ১ হাজার ৪৭০। এ অঞ্চলে গেল বছরের মোট আবেদনের মধ্যে ১ হাজার ৪৭০টিই করেছেন নারীরা।

গুলশান-বাড্ডা তিন নম্বরে
রাজধানীর গুলশান-বাড্ডা এলাকা নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর অঞ্চল গঠিত। গেল তিন বছরে এ অঞ্চলে বিবাহ বিচ্ছেদের ৩ হাজার ২৫৬ আবেদনের মধ্যে ৩ হাজার ১৬১ কার্যকর হয়েছে। বছরওয়ারী হিসেবে ২০২৩ সালে আবেদন ১ হাজার ১২৫, কার্যকর ১ হাজার ৯৮। ২০২৪ সালে আবেদন ৯৮০, কার্যকর ৯৫৪। ২০২৫ সালে ১ হাজার ১৫৭ আবেদনের মধ্যে ১ হাজার ১০৯ কার্যকর হয়েছে।

তিন বছর ধরে এ অঞ্চলে নারীদের আবেদনের হার ছিল বেশি। ২০২৩-২৫ পর্যন্ত এ এলাকায় নারীরা যথাক্রমে ৬৮৭, ৬০৪ ও ৭৫৫ আবেদন করেছেন।

বিচ্ছেদের হার দ্রুত বাড়ছে পল্লবীতে

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা উত্তরের ১০ নম্বর অঞ্চলে (পল্লবী) আবেদনের সংখ্যা তিন বছরে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম (১৮৯) থাকলেও ক্রমান্বয়ে তা বাড়ছে। ২০২৩ সালে মাত্র ৩২ আবেদন থাকলেও ২০২৪ সালে ৫৮ এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩ গুণ (৯৯) হয়েছে; যার বড় অংশই (৬১) করেছেন নারীরা। ২০২৫ সালে ৯৯ তালাকের আবেদনের মধ্যে ৬৭ কার্যকর হয়েছে।

আবেদন ও কার্যকর কম উত্তরা-ভাটারায়

পরিসংখ্যান বলছে, উত্তরা সিটিতে বিবাহ বিচ্ছেদের বেশিরভাগ আবেদনই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে কার্যকর হচ্ছে। তবে তুলনামূলকভাবে অঞ্চল-১ (উত্তরা পশ্চিম) এবং অঞ্চল-৯ (ভাটারা) এলাকায় বিচ্ছেদ আবেদনের সংখ্যা অনেক কম এবং কার্যকরও হচ্ছে কম। অর্থাৎ এই দুই এলাকায় সমঝোতা বা আইনি প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে। অঞ্চল-১ এ তিন বছরে ৮০৬ এবং অঞ্চল-৯ এ ৪৯৯ আবেদন জমা পড়ে। কার্যকর হয়েছে যথাক্রমে ৭৪৫ এবং ৪৮৬।

বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা যা বলছেন

উচ্চ ও মধ্যবিত্ত প্রবণ এলাকাগুলোতে ব্যক্তিত্বের সংঘাত, ক্যারিয়ার সচেতনতা এবং নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকায় যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন এবং মাদকাসক্তির মতো সামাজিক সমস্যাগুলো বিবাহ বিচ্ছেদের নেপথ্যে কাজ করছে। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিচ্ছেদের প্রবণতা বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নেহাল করিম এ নিয়ে এশিয়া পোস্টকে বলেন, নারী নাকি পুরুষরা বেশি বিচ্ছেদ চায়, এটি একটি বিষয়। নারীরা যদি চায়, তাহলে বুঝতে হবে তারা স্বাবলম্বী হয়েছে। সিদ্ধান্ত নিতে কারও ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। এক সময় পরনির্ভরতার কারণে অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করলেও এখন সেই পরিস্থিতি নেই। ফলে স্ত্রীর প্রতি অন্যায়-অবিচার হলে তারা আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এ কারণেও বিচ্ছেদ বেড়েছে। এর পেছনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণও আছে।

আবার সীমাহীন প্রত্যাশা এবং একে-অপরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ার ফলে বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনই ভাবেন, আমিই সঠিক, আমিই সুপিরিয়র। ফলে একে অপরকে গুরুত্ব দেন না, সংসারে অশান্তি লেগে থাকে। আগে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে যে শ্রদ্ধাবোধ ছিল, সেটি এখন লক্ষ করা যায় না। আর বিশ্বাস-শ্রদ্ধা না থাকলে সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না, বাস্তবে সেটাই ঘটছে।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চিড় ধরলে সংসার রক্ষার উপায় কী—এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ধর্মীয় অনুশাসন ও বাঙালি সংস্কৃতির পারিবারিক বন্ধনে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্ক যে ক্ষণস্থায়ী, সেটি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীরাই বেশি আসে। একটা বিষয়—নারী মানেই ভুক্তভোগী, তার পাশে আছি বিষয়টি এমন হয়ে গেছে। কিন্তু পুরুষের সংখ্যাও কম নয়, পুরুষও আসছে। নারীরা হয়তো যৌতুকের কারণে ডিভোর্স নিচ্ছে। পুরুষদের কাছে আবার বেশি ডিমান্ড করা হচ্ছে।’