বাংলাদেশের সরকারি অর্থব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। প্রায় চার দশকের মধ্যে এই প্রথম—সরকারকে নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটাতেই ঋণ নিতে হয়েছে। এক কথায় গত চার দশকে এই প্রথম—রাষ্ট্রের নিয়মিত চাকা সচল রাখতেই ঋণের দ্বারস্থ হতে হয়েছে সরকারকে। অর্থাৎ বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও অন্যান্য রুটিন খরচ চালাতে রাজস্ব আয় যথেষ্ট হয়নি। উন্নয়ন ব্যয় তো দূরের কথা, সরকারের দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যয়ই যখন রাজস্ব দিয়ে সামাল দেওয়া যায় না, তখন সেটি অর্থনীতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত।
এই বাস্তবতায় নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনায় দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার। তাদের প্রথম বাজেট—যা আগামী জুনে ঘোষণা হওয়ার কথা, হয়ে উঠতে পারে এক কঠিন আর্থিক পরীক্ষা। কারণ একদিকে রয়েছে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাপ, অপরদিকে সীমিত রাজস্ব আয়, উচ্চ সুদ ব্যয় ও ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-পানি ও অন্যান্য বিল পরিশোধ এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং নতুন সরকারের করণীয় নিয়ে সমন্বিত মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। সেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, ‘‘রাষ্ট্র এখন এমন এক আর্থিক সংকটে পড়েছে যেখানে উন্নয়ন নয়, নিত্য পরিচালন ব্যয় মেটাতেই ধার করতে হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আশির দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের পর এ ধরনের পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি।’’
রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া দায়—এই তিনটি বিষয়কে তিনি বর্তমান সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা মিলেই সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে একই উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘‘কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ ও উন্নয়ন ব্যয় কমানোর পরও ঋণের বোঝা হালকা হয়নি, বরং ক্ষমতা গ্রহণের সময় যে দায়ভার ছিল, তা আরও বেড়েছে।’’
রাজস্ব আয় কম, ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ গতিতে
সরকারি হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা— আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি মাত্র ৬.৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিয়মিত পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায়।
অর্থাৎ আয় যতটা বেড়েছে, ব্যয় বেড়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি গতিতে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ২৯৪ কোটি টাকায়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা—শুধু পরিচালন ব্যয় মেটাতেই। আশির দশকের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঋণ বৃদ্ধির ধারা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে মোট সরকারি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত—যেখানে উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণ কমছে না। বরং পরিচালন ব্যয় ও সুদ পরিশোধই হয়ে উঠছে প্রধান চাপ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ডেবট বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই সময়ে উন্নয়ন ব্যয় ছিল সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায়ও কম। উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণ কমেনি, বরং বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ: লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়া, আগের সরকারের রেখে যাওয়া বকেয়া দায়, ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের চাপ, টাকার অবমূল্যায়নে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণে দ্রুত সম্প্রসারণ, ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক উৎস থেকে। ২০২২ সালের জুনে বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকায়, প্রায় দ্বিগুণ।
এই সময়ে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪৪ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণ টাকায় রূপান্তর করলে আরও বড় হয়ে দেখা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ঋণপরিশোধে বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
অভ্যন্তরীণ ঋণে ব্যাংকনির্ভরতা বৃদ্ধি
অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা।
ট্রেজারি বন্ড ও বিলের মাধ্যমে ধারগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিপরীতে উচ্চ সুদের দায় কমাতে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করায় সঞ্চয়পত্রে সরকারের দায় কিছুটা কমেছে।
তবে ব্যাংকনির্ভর ঋণগ্রহণের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে—বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়। ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক।
ঋণ-জিডিপি অনুপাত: এখনও নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু সতর্ক বার্তা
২০২২ সালে ঋণ-জিডিপি অনুপাত ছিল ৩৩.৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এখনও বিপজ্জনক পর্যায়ে না গেলেও দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সুদ পরিশোধের সক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে যখন রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি দুর্বল এবং কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম, তখন ঋণের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রথম বাজেটেই রাজনৈতিক ও আর্থিক দ্বৈত চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের সামনে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—১. নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন। ২. বাজেট ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ।
বিএনপির ঘোষিত প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে: স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড চালু, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, নতুন বেতন কাঠামোর এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন করলেও অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। ফলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে ঋণের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকবে।
অপরদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, বিএনপি সরকারের সংশোধিত বাজেট পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রক্ষেপণ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের বিচ্যুতি দেখা দিতে পারে।
কাঠামোগত দুর্বলতা: রাজস্ব সংস্কার অনিবার্য
বর্তমান পরিস্থিতি কেবল অস্থায়ী নয়, এটি কাঠামোগত রাজস্ব দুর্বলতার প্রতিফলন। কর ফাঁকি, করজালের সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুল ডিজিটাল নজরদারি এবং প্রশাসনিক জটিলতা দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে।
রাজস্ব আহরণে গতি ফেরাতে প্রয়োজন—করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট ও আয়কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, আমদানি-নির্ভর শুল্ক রাজস্বের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ানো।
ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন কঠোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার চেয়ে আর্থিক টেকসইতাকে অগ্রাধিকার না দিলে ঋণচক্র আরও ঘনীভূত হতে পারে।
তিনটি স্পষ্ট সংকেত
বর্তমান ঋণচিত্রে তিনটি প্রবণতা স্পষ্ট—১. মোট ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি। ২. অভ্যন্তরীণ ঋণে ব্যাংকনির্ভরতা বৃদ্ধি। ৩. বৈদেশিক ঋণের ত্বরান্বিত সম্প্রসারণ।
উন্নয়ন ব্যয় কমানো সত্ত্বেও ঋণ কমেনি, বরং বেড়েছে। এর অর্থ, পরিচালন ব্যয় ও সুদ পরিশোধের চাপ এখন সরকারি অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সংকট।
সামনে যে প্রশ্ন
ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির এই ধারা কতটা টেকসই? রাজস্ব আহরণে সংস্কার, ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতা জোরদার না হলে আগামী বাজেটগুলো আরও কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি হবে।
নতুন সরকারের জন্য প্রথম বাজেট কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়—এটি হবে নীতিগত অঙ্গীকার, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রথম বড় পরীক্ষা।
প্রশ্ন এখন, রাজস্ব কাঠামো সংস্কার ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কতটা সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হবে? কারণ সময় বলছে, হিসাবের অঙ্ক মেলানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।