Image description
বিবিসির প্রতিবেদন

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছে নতুন সরকার। তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা দায়িত্ব পাওয়ায় অবাক হয়েছেন অনেকেই। খোদ বিএনপি নেতারাও কিছুটা অবাক হয়েছেন এই নিয়োগে। সমালোচনা করেছে বিরোধী দলও।

বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদন বলেছে, বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ বলছেন নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিষয়টি বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর বলে মন্তব্য করেছে। এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন মহলেও।

অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে অনেক সময়ই খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি নানা ইস্যুতে খলিলুর রহমানের সমালোচনা করতে দেখা গেছে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের। তখন শুধু সমালোচনায় থেমে থাকেননি তারা, বিএনপি খলিলুর রহমানকে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিল।

সর্বশেষ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি বিএনপি নেতাদেরও কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছিলেন যে, দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। ওই চুক্তি ঘিরেও অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিএনপি নেতাদের অনেকে প্রকাশ্যে খলিলুর রহমানের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকারে। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় এটিই বড় ব্যতিক্রম।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিধান অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে নির্বাচিত সংসদ নেতা তার সরকারের মন্ত্রিপরিষদে কাকে নেবেন বা কাকে রাখবেন, সেটা একান্ত প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তিনি চাইলে দলের কারও কারও সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন, আবার নাও করতে পারেন।

সে কারণে মন্ত্রিসভা গঠনের আগে সম্ভাব্যদের নাম গোপন থাকে। এরপরও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয় অনেক নাম নিয়ে। এবারও তাই হয়েছে। তবে খলিলুর রহমান যে মন্ত্রী হচ্ছেন, তা আলোচনায় এসেছে শেষ মুহূর্তে। বিএনপির নেতাকর্মীরাও অবাক হয়েছেন বলে মনে হয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, খলিলুর রহমান তাদের সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাবেন, এটি তাদের ধারণায় ছিল না। সরকার গঠনের আগমুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে খবর দেখে তারা অবাক হয়েছেন।

তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে বিভিন্ন ইস্যুতে খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে তারাও সমালোচনা করেছেন। তার পদত্যাগও তারা চেয়েছিলেন। এখন তাদের সরকাররই খলিলুর রহমানের মন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি তাদের জন্য বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর হয়েছে।

কয়েকটি জেলায় দলটির তৃণমূলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী করার ব্যাপারে তাদের শীর্ষ নেতার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। বিএনপি সরকারের যাত্রার প্রথম দিনে গত বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকায় সফররত নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মার সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। এরপর খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

তখন সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব থেকে নির্বাচনে বিজয়ী দলের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে কি না। এর জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুল রহমান বলেছেন, আমি তো জোর করে যাইনি। একেকজনের একেকজন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা থাকতে পারে, সেটা পরিবর্তনও হয়। আরেকটি প্রশ্ন ছিল, একটা কথা অনেকেই বলছেন, আপনি আগের সরকারেও ছিলেন। নির্বাচনে রেফারির ভূমিকায় ছিলেন। আপনি বিজয়ী দলের সঙ্গে আসলেন। সেটা কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছে, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি করে কি না। এমনকি বিএনপির এই বিজয়ে আগের সরকারের যুক্ততা নিয়ে কথা উঠছে।

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলছে। তার মানে গণনা ঠিক হয়নি। তাই তো। এটা বলছে তো! গুণে নেন আরেকবার। গুনতে তো মুশকিল নাই। খলিলুর রহমানকে প্রথমে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টার মর্যাদায় রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ করা হয়েছিল। সেই পদে থাকা অবস্থায় তার বিভিন্ন কর্মকা- নিয়ে বিএনপি সমালোচনা করেছিল। এরপর খলিলুর রহমানকে যখন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হয়েছিল, তখন তাকে এমন স্পর্শকাতর দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিএনপি। সে সময় দলটি খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন বিএনপির কোনো কোনো নেতা। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা তখন অভিযোগ করেছিলেন, খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অন্য দেশের নাগরিককে জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে দেশকে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে।

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে মাসে রোহিঙ্গাদের জাতিসংঘের ত্রাণ সরবরাহে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের কক্সবাজারে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে ‘মানবিক’ করিডর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ নিয়ে সে সময় খলিলুর রহমান ও অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তখন চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে দেওয়ার প্রশ্নেও সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই পটভূমিতে ২০২৫ সালের ২২ মে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতিয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে খলিলুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যে ব্যক্তি সম্পর্কে বিএনপি নেতাদের একটা নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে এতদিন, তিনিই এখন দলটির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। খলিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জানালা দিয়েই বিশ্ব দেখবে বিএনপি সরকারের বাংলাদেশকে। সেকারণে মানুষ বিষ্মিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক-বিএনপির নেতারাও এই অভিযোগ তুলেছিলেন।

এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন খলিলুর রহমান। তার দাবি হচ্ছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছাড়া তার অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট নেই।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। সেকারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের প্রশ্ন আলোচনায় আসছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন আগে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্য উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের যে হিসাব প্রকাশ করেছেন, তাতে দেখা যায়, খলিলুর রহমানের সম্পদের বেশিরভাগই বিদেশে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা অনানুষ্ঠানিক আলাপে বলেছেন, কূটনীতিতে খলিলুর রহমানের পেশাদারিত্ব আছে। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র-চীন এবং প্রতিবেশি ভারতের যে অবস্থান, সেখানে বাংলাদেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলার ক্ষেত্রে পেশাদার ও দক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজন। তাকে সরকারে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনায় এসেছে বলে তারা মনে করেন।

বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সাবেক কূটনীতিক। তারা মনে করেন, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। সে সময় বিএনপিও নির্বাচনের দিনক্ষণ চেয়ে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিল। ফলে এক ধরনের অস্থিরতা চলছিল। সেই পটভূমিতে গত বছরের জুন মাসে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডন গিয়ে সে সময় সেখানে নির্বাসনে থাকা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যে বৈঠক থেকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা এসেছিল। সেই লন্ডন বৈঠকের সময়ই খলিলুর রহমান বিএনপির সঙ্গে তার পুরোনো সম্পর্ক ঝালাই করে আসেন। তখন থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে খলিলুর রহমানের কথাবার্তা বা যোগাযোগ ছিল বলে তাদের ধারণা।

তবে সাবেক আরেকজন কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমদ মনে করেন, প্রধানত বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই দলটির সরকারে জায়গা পেয়েছেন খলিলুর রহমান। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ও একটি কারণ হতে পারে।