Image description

বাস্তবতা হলো বিগত ১৮ মাসে অর্থনীতিতে একটা স্থবিরতা দেখা গেছে। যেমন প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থানের দিক থেকেও সংকোচন হয়েছে। সব মিলিয়ে আস্থার অভাব থাকায় দেশে বিনিয়োগ সেভাবে হয়নি। অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়বে এমন প্রত্যাশ রয়েছে নতুন সরকারের কাছে। তাছাড়া বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি করাও হবে নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তারা বলছেন, বিনিয়োগকারীরা চান দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতি ধারাবাহিকতা। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা হচ্ছে, অর্থনীতির বিভিন্ন জায়গায় যে অস্থিরতা ও স্থবিরতা আছে, সেখানে যেন একটা গতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আসে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বর্তমানে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত ১৭ মাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বরং বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি দেখা যায়নি, কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চমাত্রায় থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সামিট ও রোড শো আয়োজন করলেও প্রত্যাশিত বৈদেশিক বিনিয়োগ আসেনি। দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি। তবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, এটিও হয়েছে প্রবাসীদের জন্য। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) সাবেক এই মহাপরিচালক বলেন, একসঙ্গে সব সমস্যার সমাধান কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বিদ্যমান সমস্যাগুলো সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা এবং খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। বিশেষ করে- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং উত্পাদন বৃদ্ধিতে নীতিনির্ধারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারলে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে জানতে চাইলে  সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো- অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে মানুষের মাঝে আস্থা পুনর্গঠন করা। গত সময়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং বিনিয়োগের গতি মন্থর ছিল। তাই প্রথম কাজ হবে মূল্যস্ফীতি ও সুদহার নিয়ন্ত্রণে এনে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা, যাতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পান। রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের বড় অসামঞ্জস্য দূর করে ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি, নইলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হবে।

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা জানতে চাইলে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান ইত্তেফাককে বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে নতুন সরকারের কাছে প্রথম প্রত্যাশা। তাছাড়া সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা জরুরি। কেননা, এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরে আসে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করাও নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা করেন তিনি।

মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েই গেছে:

দেশে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় জুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। অন্তর্বর্তী সরকার এর রাশ কিছুটা টানতে সক্ষম হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারেনি। বরং তাদের মেয়াদের শেষকালে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে টানা চার মাস ধরে খাদ্যমূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গত মাসে অর্থাত্ জানুয়ারিতে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। ইতিমধ্যে রজমান মাস শুরু হয়েছে। এ সময় স্বাভাবিকভাবে কিছু ভোগ্যপণ্য -ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ইত্যাদির চাহিদা বেড়ে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশব্যাপী নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম চলায় অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের শেষ দিকে বাজার ব্যবস্থাপনায় খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারেনি, যার প্রভাব রমজানের ভোগ্যপণ্যের দামে পড়েছে। তবে ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় আমদানিকারকরা সহজে ঋণপত্র খুলতে পেরেছেন। আগে শতভাগ মার্জিনে এলসি খুলতে হলেও এবার ১০-২০ শতাংশ মার্জিনে আমদানির সুযোগ পাওয়ায় আমদানি বেড়েছে।

১৪ মাসে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা:

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় করা হলেও ঋণের লাগাম ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে দেশের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মেগা প্রকল্প থেকে সরে আসার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে কমালেও ঋণনির্ভরতা কমাতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে না পারা এবং আগের ঋণ পরিশোধের চাপের পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানতে না পারায় ঋণ বাড়াতে হয়েছে।

গতি ফেরেনি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে:

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা গত ৯ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি গত অর্থবছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের সময়ের তুলনায়ও এবারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে এডিপির অর্থ ব্যয় হয়েছিল ৩৯ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। এরপর থেকে প্রতি বছরই এই সময়ে ব্যয়ের পরিমাণ চলতি বছরের চেয়ে বেশি ছিল।

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে:

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সময়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। এনবিআরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছয় মাসে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৯৭৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

ভঙ্গুর ব্যাংক খাত ও খেলাপি ঋণের রেকর্ড:

অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো ব্যাংকিং খাত। নাজুক পরিস্থিতিতে পড়া দেশের পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এদিকে গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। তাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। ফলে খেলাপির আকারও বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারকে আর্থিক খাতে চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল। এর মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালকদের লাগাম টানা ও জবাবদিহির আওতার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। খেলাপিদের বিচারের আওতায় আনতে ও অর্থ উদ্ধারে নেওয়া হয় অর্থ ঋণ আদালত আইন সংস্কারের উদ্যোগ। তবে শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। এসব বিষয় নিয়ে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ রয়েই যাচ্ছে।