বিএনপির নতুন সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি একজন মন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন অপাহাড়ি একজন। ২৮ বছর আগে মন্ত্রণালয়টি গঠনের পর এই প্রথম কোনো নির্বাচিত সরকারের আমলে এমন ঘটনা ঘটল। চুক্তিকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) এক নেতা দাবি করেছেন, এটা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশ্লেষকেরাও বলছেন, এটা চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই–তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত মঙ্গলবার তাঁর নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শপথ নেন। এরপর দপ্তর বণ্টনে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা দীপেন দেওয়ান। তিনি পার্বত্য রাঙামাটি থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে। দীপেন দেওয়ান পার্বত্যাঞ্চলের চাকমা জাতিসত্তার হলেও মীর হেলাল ওই এলাকার বাসিন্দাও নন, পাহাড়িও নন।
এর আগে কখনো পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। নির্বাচিত সরকার আমলে যে একজন করে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁরা পাহাড়িই ছিলেন। কিন্তু এবার এর ব্যতিক্রম ঘটনায় তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই। এর আগের বছর সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির শর্তানুসারে এই মন্ত্রণালয় গঠিত হয়। পাহাড়ে সংঘাত পেরিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনাই ছিল সেই চুক্তির লক্ষ্য।
কী আছে চুক্তিতে
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে ক, খ, গ ও ঘ খণ্ডে ৭২টি ধারা রয়েছে। এর বেশির ভাগই জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ গঠনসংক্রান্ত। চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের কথা বলা আছে।
ওই ধারায় লেখা আছে, ‘উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’
এই ধারায় প্রতিমন্ত্রীর বিষয়ে কিছু বলা নেই। যদিও এর আগে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তবে তাঁরা ছিলেন পাহাড়ি জাতিসত্তার।
ওই চুক্তির বলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পাচ্ছেন। দলটির প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) এই পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। প্রায় তিন দশক আগে তিনিই সরকারের সঙ্গে ওই চুক্তিপত্রে সই করেছিলেন।

আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ‘অবশ্যই উপজাতীয়’ হবেন বলে চুক্তির ‘গ’–এর ২ ধারায় বলা আছে। ২২ সদস্যের এই পরিষদের দুই–তৃতীয়াংশ ‘উপজাতীয়দের’ জন্য সংরক্ষিত থাকলেও ‘অউপজাতীয়’দের জন্য সাতটি সদস্য পদ (ছয়জন পুরুষ ও একজন নারী) রাখা হয়েছে।
আবার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের বিষয়টি চুক্তিতে রয়েছে। ১৪ সদস্যের ওই কমিটিতে পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা তিনজন ‘অউপজাতীয়’কে রাখার কথা বলা আছে। এ কমিটিতে মন্ত্রীর সঙ্গে আরও সদস্য থাকেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, তিন জেলা (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান) পরিষদের তিন চেয়ারম্যান, পার্বত্য তিন জেলার তিন সংসদ সদস্য এবং চাকমা রাজা, বোমাং রাজা ও মং রাজা।
মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এর আগে যাঁরা ছিলেন
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ১৯৯৮ সালে মন্ত্রণালয় গঠনের পর প্রথম মন্ত্রী করা হয়েছিল কল্পরঞ্জন চাকমাকে। তিনি খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে এই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব পান মনি স্বপন দেওয়ান, তিনি ছিলেন উপমন্ত্রী। মনি স্বপন দেওয়ান বিএনপির মনোনয়নে রাঙামাটি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হয় রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদারকে। এরপর ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিমন্ত্রী করে বান্দরবান থেকে নির্বাচিত বীর বাহাদুর উশৈসিংকে। পরের মেয়াদে ২০১৯ সালে মন্ত্রী হয়ে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রতিমন্ত্রী করা হয় কুজেন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে। তিনি খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা সুপ্রদীপ চাকমা।
এর আগে ২০০৬ সালে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন স্বল্পমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা হাসান মশহুদ চৌধুরী ও রুহুল আমিন চৌধুরী।
‘এক–এগারো’র পর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন ইফতেখার আহমদ চৌধুরী। পরে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় মন্ত্রণালয়টি সামলেছিলেন।

‘চুক্তির লঙ্ঘন’
চুক্তিকারী জনসংহতি সমিতির অনেকেই অপাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী দেখে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সংগঠনটির নেতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় সরকারের এ উদ্যোগ। কোনো সরকারের আমলেই এমন ঘটনা ঘটেনি। এটা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছে। বিএনপি একসময় এই চুক্তির বিরোধিতা করলেও ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সময় এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
গৌতম কুমার চাকমা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে সেই সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি বলেন, বিএনপির তখনকার মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদও চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সে সময় ভূমি কমিশন আইনের বিষয়ে ইতিবাচক ছিলেন আইনমন্ত্রী।
‘সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি বিএনপি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই তা করা দরকার। তা না করে একজন অপাহাড়িকে দায়িত্বে আনাটা ঠিক হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পার্বত্য চুক্তির ফলে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের গঠন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। পার্বত্য চুক্তির ফলে গঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ও গঠিত হয়। ‘এখন যেভাবে এখানে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ হলো, এর উদাহরণ নেই। এটি চুক্তির একটি ব্যত্যয় বলে মনে করি,’ বলেন তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক একাধিক গবেষণামূলক বইয়ের লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আমেনা মোহসীনের মতও একই রকম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেখানে আরও দুজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। প্রতিমন্ত্রীও তাঁদের মধ্যে থেকে করা দরকার ছিল।’
পার্বত্য চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ‘উপজাতীয় অধ্যুষিত’ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। সে বিচারেই এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শুধু ‘উপজাতীয়’দের রাখা দরকার বলে যুক্তি দেখান রাঙামাটির এক আইনজীবী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনিচ্ছুক ওই আইনজীবী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন যুক্তি দেওয়া হতে পারে যে মন্ত্রী তো পাহাড়ি রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ের বাইরের কাউকে রাখা চুক্তির বরখেলাপ নয়। আসলে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনই তো মন্ত্রিসভার সদস্য। আর প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ের বাসিন্দাও নন। সার্বিক বিচারে এখানে আইন নয়, রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে নতুন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়। আমি এ ব্যাপারে পরে জানাব।’