সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের সময় আলোচিত খলিলুর রহমান নির্বাচিত বিএনপি সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় খোদ দলটির নেতা-কর্মীরাই অবাক হয়েছেন। এর সমালোচনা করেছে বিরোধী দলও।
বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, মি. রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার বিষয়টি তাদের জন্য বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর হয়েছে।
নানা আলোচনা চলছে ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন মহলে। কারণ, অন্তবর্তী সরকারের আঠারো মাসে অনেক সময়ই খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
এমনকি নানা ইস্যুতে খলিলুর রহমানের সমালোচনা করতে দেখা গেছে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের। তখন শুধু সমালোচনায় থেমে থাকেননি তারা, বিএনপি মি. রহমানকে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিল।
সর্বশেষ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি বিএনপি নেতাদেরও কেউ কেউ অভিযোগ তুলেছিলেন যে, দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি।
ওই চুক্তি ঘিরেও অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিএনপি নেতাদের অনেকে প্রকাশ্যে মি. রহমানের সমালোচনা করেছেন।
কিন্তু আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকারে। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় এটিই বড় ব্যতিক্রম।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কেন তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলো?
খলিলুর রহমান নিজেও এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। জবাবে তিনি বলেছেন, বিএনপির মন্ত্রিসভায় তিনি "জোর করে" যাননি।
ছবির উৎস,NurPhoto via Getty Images
বিএনপির নেতাকর্মীরাও 'অবাক'
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের পর গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মাঝে প্রত্যাশা তৈরি হয়।
সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ফলে নির্বাচিত এই সরকারের মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ কৌতুহল ছিল।
সংবাদমাধ্যমেও কয়েকদিন ধরে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের অনেক তালিকা প্রকাশ হয়েছে, সেসব তালিকাও ছিল বিএনপির তরুণ-প্রবীণ এবং মিত্র দলগুলোর নেতাদের নিয়ে।
একেবারে শেষ সময়ে সরকার গঠনের আগমুহূর্তে বিএনপির মন্ত্রিসভার জন্য খলিলুর রহমানের নাম আলোচনায় আসে সামাজিক মাধ্যমে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও তিনি মন্ত্রী হতে পারেন বলে খবর প্রকাশ হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিধান অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে নির্বাচিত সংসদ নেতা তার সরকারের মন্ত্রিপরিষদে কাকে নেবেন বা কাকে রাখবেন, সেটা একান্ত তার এখতিয়ার। তিনি চাইলে দলের কারও কারও সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন, আবার নাও করতে পারেন।
সে কারণে মন্ত্রিসভা গঠনের আগে সম্ভাব্যদের নাম গোপন থাকে। এরপরও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয় অনেক নাম নিয়ে। এবারও তাই হয়েছে। তবে খলিলুর রহমান যে মন্ত্রী হচ্ছেন, তা আলোচনায় এসেছে শেষ মুহূর্তে।
বিএনপির নেতাকর্মীরাও অবাক হয়েছেন বলে মনে হয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার নেতা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, খলিলুর রহমান তাদের সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাবেন, এটি তাদের ধারণায় ছিল না। সরকার গঠনের আগমুহূর্তে সংবাদমাধ্যমে খবর দেখে তারা অবাক হয়েছেন।
তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে বিভিন্ন ইস্যুতে খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে তারাও সমালোচনা করেছেন। তার পদত্যাগও তারা চেয়েছিলেন। এখন তাদের সরকাররই মি. রহমানের মন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি তাদের জন্য বিব্রতকর ও অস্বস্তিকর হয়েছে।
কয়েকটি জেলায় দলটির তৃণমূলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী করার ব্যাপারে তাদের শীর্ষ নেতার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।
ছবির উৎস,SCREEN GRAB
'জোর করে যাইনি'
বিএনপি সরকারের যাত্রার প্রথম দিনে বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকায় সফররত নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মার সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। এরপর মি. রহমান সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তখন সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব থেকে নির্বাচনে বিজয়ী দলের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে কি না। এর জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুল রহমান বলেছেন, "আমি তো জোর করে যাইনি। একেকজনের একেকজন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা থাকতে পারে, সেটা পরিবর্তনও হয়"।
আরেকটি প্রশ্ন ছিল, একটা কথা অনেকেই বলছেন, আপনি আগের সরকারেও ছিলেন। নির্বাচনে রেফারির ভূমিকায় ছিলেন। আপনি বিজয়ী দলের সঙ্গে আসলেন। সেটা কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছে, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি করে কি না। এমনকি বিএনপির এই বিজয়ে আগের সরকারের যুক্ততা নিয়ে কথা উঠছে।
এর জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "অনেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলছে। তার মানে গণনা ঠিক হয়নি। তাই তো। এটা বলছে তো! গুণে নেন আরেকবার। গুনতে তো মুশকিল নাই"।
ছবির উৎস,PID
পদত্যাগও চেয়েছিল বিএনপি
খলিলুর রহমানকে প্রথমে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টার মর্যাদায় রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ করা হয়েছিল। সেই পদে থাকা অবস্থায় তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বিএনপি সমালোচনা করেছিল।
এরপর মি. রহমানকে যখন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হয়েছিল, তখন তাকে এমন স্পর্শকাতর দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিএনপি।
সে সময় দলটি খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন বিএনপির কোনো কোনো নেতা।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা তখন অভিযোগ করেছিলেন, খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। অন্য দেশের নাগরিককে জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে দেশকে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে।
গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের মে মাসে রোহিঙ্গাদের জাতিসংঘের ত্রাণ সরবরাহে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের কক্সবাজারে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে 'মানবিক' করিডর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
এ নিয়ে সে সময় খলিলুর রহমান ও অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
তখন চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে দেওয়ার প্রশ্নেও সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সেই পটভূমিতে ২০২৫ সালের ২২শে মে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির সিনিয়র নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের জাতিয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে খলিলুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন।
এই দাবির পেছনে যুক্তি দিতে গিয়ে সংবাদসম্মেলনে বিএনপি নেতা মি. হোসেন বলেছিলেন, "জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার বক্তব্যে আবারও নতুন বির্তকের জন্ম দিয়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তাকে অব্যাহতি প্রদান করতে হবে। ফ্যাসিবাদের দোসর কয়েকজন উপদেষ্টাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি আমরা ইতিপূর্বে অনেক বার উত্থাপন করেছি"।
বিএনপির পক্ষ থেকে তখন খলিলুর রহমানসহ কয়েকজন উপদেষ্টার পদত্যাগের তাদের দাবি প্রধান উপদেষ্টাকে লিখিতভাবেও জানানো হয়েছিল।
সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর নিয়েও খলিলুর রহমানের সমালোচনা করেছিলেন বিএনপি নেতাদের অনেকে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে গত নয়ই ফেব্রুয়ারি ওই চুই সই হয়। এই চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থে হয়নি বলে বিএনপি নেতাদের আনেকে অভিযোগ করেছিলেন। তাদের এই অভিযোগের আঙুল ছিল খলিলুর রহমানের দিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যে ব্যক্তি সম্পর্কে বিএনপি নেতাদের একটা নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে এতদিন, তিনিই এখন দলটির সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী।
খলিলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জানালা দিয়েই বিশ্ব দেখবে বিএনপি সরকারের বাংলাদেশকে। সেকারণে মানুষ বিষ্মিত হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারী?
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনে খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক- বিএনপির নেতারাও এই অভিযোগ তুলেছিলেন।
এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন খলিলুর রহমান। তার দাবি হচ্ছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন। বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছাড়া তার অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট নেই।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। সেকারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের প্রশ্ন আলোচনায় আসছে।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার কয়েকদিন আগে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্য উপদেষ্টারা তাদের সম্পদের যে হিসাব প্রকাশ করেছেন, তাতে দেখা যায়, খলিলুর রহমানের সম্পদের বেশিরভাগই বিদেশে।
মি. রহমানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, নাগরিকত্ব না নিয়ে খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ড নিয়েছেন এবং এর মাধ্যমেই সেখানে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন।
প্রসঙ্গত, গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আয়ের স্তরের অভিবাসীদের সে দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেয়। গ্রিন কার্ডধারীরা সাধারণত পাঁচ বছর পর নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য হয়ে ওঠেন।
ছবির উৎস,BNP
কেন মন্ত্রিসভায় জায়গা দিলো বিএনপি
বিএনপির নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে খলিলুর রহমানকে মন্ত্রী করার পক্ষে বা বিপক্ষে, কোনো দিকেই কথা বলতে রাজি হননি।
তবে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা অনানুষ্ঠানিক আলাপে বলেছেন, কূটনীতিতে মি. রহমানের পেশাদারিত্ব আছে। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র-চীন এবং প্রতিবেশি ভারতের যে অবস্থান, সেখানে বাংলাদেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলার ক্ষেত্রে পেশাদার ও দক্ষ পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজন। তাকে সরকারে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনায় এসেছে বলে তারা মনে করেন।
বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ একাধিক সাবেক কূটনীতিক।
তারা মনে করেন, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। সে সময় বিএনপিও নির্বাচনের দিনক্ষণ চেয়ে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিল। ফলে এক ধরনের অস্থিরতা চলছিল।
সেই পটভূমিতে গত বছরের জুন মাসে ওই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডন গিয়ে সে সময় সেখানে নির্বাসনে থাকা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যে বৈঠক থেকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা এসেছিল।
তখন অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে খলিলুর রহমানও লন্ডন গিয়েছিলেন এবং বিএনপি নেতার সঙ্গে বৈঠকে মি. রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক ওই কূটনীতিকেরা বলছেন, সেই লন্ডন বৈঠকের সময়ই খলিলুর রহমান বিএনপির সঙ্গে তার পুরোনো সম্পর্ক ঝালাই করে আসেন। তখন থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে খলিলুর রহমানের কথাবার্তা বা যোগাযোগ ছিল বলে তাদের ধারণা।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান তার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন খলিলুর রহমানকে।
সে সময়ই বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে মি. রহমানের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
খলিলুর রহমানের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারে থেকেই মি. রহমান শেষপর্যন্ত নির্বাচন করাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিএনপির পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন, তিনি এমন একটি ধারণা দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তৈরি করতে পেরেছিলেন।
ছবির উৎস,BNP
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিও একটি প্রেক্ষাপট
বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় ছাড়াও ভূ-রাজনীতির প্রসঙ্গও টেনেছেন সাবেক একজন কূটনীতিক।
তিনি বলেন, নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে এবং এর বিভিন্ন শর্ত নিয়ে যেহেতু ঢাকায় ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি বিএনপি নেতারাও সমালোচনা করেছেন, ফলে ওই চুক্তি বিরোধী একটা মতামত গড়ে উঠছে।
এমন পটভূমিতে চুক্তিটির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা বা বহাল রাখার বিষয় আছে। এই চুক্তি হওয়ার পেছনে খলিলুর রহমানের ভূমিকা আলোচনায় এসেছে।
এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটসহ আরও কিছু ইস্যুতে আঞ্চলিক ও বৃহত্তর পরিসরের ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন রয়েছে।
সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থেকে মি. রহমানকে নির্বাচিত সরকারে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শ থাকতে পারে, যা বিএনপি নেতৃত্ব বিবেচনায় নিয়েছে- এমন ধারণার কথাও বলছেন সাবেক ওই কূটনীতিক।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বিভিন্ন শর্ত আনা হয়েছে চীনকে টার্গেট করে। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরাও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির শর্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে কঠোর। এ চুক্তিতে দেশের স্বার্থকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি; বরং চুক্তিটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে সীমিত করে দিতে পারে।
খলিলুর রহমান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতাই থাকতে পারে, এমন সন্দেহও প্রকাশ করছেন সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ।
তাদের বক্তব্য হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা রাখা হলে তাতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করা সহজ হবে।
এছাড়া বিএনপি যে কোনো একটি দেশ কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি বিরুদ্ধে, সেই কথা সঙ্গে বাস্তবতা ভিন্ন হবে। তখন সম্পর্ক শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে রেখে এক দেশ কেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ।
তবে সাবেক আরেকজন কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমদ মনে করেন, প্রধানত বিএনপির নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই দলটির সরকারে জায়গা পেয়েছেন খলিলুর রহমান। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ও একটি কারণ হতে পারে।
যদিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যাত্রার প্রথম দিনে বুধবার খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী তারা এগোবেন। সেখানে সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করবেন তারা।
তবে এই বক্তব্যের বাস্তবায়ন প্রশ্নে সন্দেহ রয়েছে কূটনীতি বিশ্লেষকদের অনেকের।