নোয়াখালীর হাতিয়ায় শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ায় তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে তথ্যপ্রমাণে সত্যতা মিলছে না। যে সময় ও স্থানে ধর্ষণের দাবি করা হয়েছে তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই এলাকায় ছিলেন না বলে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ঘটনায় অভিযোগকারী বা তার পক্ষে কেউ এখনও আইনি পদক্ষেপ নেননি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করার পর মেডিকেল বোর্ড গঠন ও ওই নারীর আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে এশিয়া পোস্ট ওই নারীর অভিযোগ নিয়ে নানাভাবে অনুসন্ধান চালিয়েছে। এর অংশ হিসেবে অভিযোগকারী নারী এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির মোবাইল লোকেশন ও কল ডিটেল রেকর্ড (সিডিআর), হাসপাতালের সিসি ফুটেজ এবং প্রাথমিক তথ্য, ওই নারীর অন্তত আটজন প্রতিবেশী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে এশিয়া পোস্ট। সেসব বিশ্লেষণের পর অভিযোগকারীর বর্ণনার সঙ্গে অনেক ঘটনা ও সময়কালের সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীর দাবি
ধর্ষণের অভিযোগ তোলা নারী হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোটগ্রহণের পরদিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। অবশ্য বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তিনি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর।
সেই সাক্ষাৎকারের ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী বলছেন, শাপলা কলি মার্কায় ভোট দেওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার থেকেই তিনি হুমকি পাচ্ছিলেন। সে জন্য শুক্রবার রাতে তিনি চাচাতো বোনের বাড়িতে চলে যান। প্রথমে সেখানে হামলা ও ভাঙচুর হয়। এরপর তার স্বামী তাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। রাত ১১টার দিকে তিন ব্যক্তি সেখানে আসেন এবং তাদের মধ্যে একজন ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে দাবি করেন ওই নারী। সাংবাদিকদের এ তথ্য জানানোর সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এরপর অভিযোগকারী নারী জানান, শুক্রবার রাতে ধর্ষণের পর শনিবার ভোর ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে ১০-১২ লোক আবার তাদের বাড়িতে আসেন। ওই ব্যক্তিরা তার স্বামীকে মারধর করে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যান।
হাসপাতালে যা বলেছেন অভিযোগকারী
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান ওই নারী। হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে যান তিনি। ওই সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত ছিলেন চিকিৎসক মোস্তাফিজুর রহমান। ওই নারী প্রথমে জানান, শনিবার সকাল ৬টার দিকে মারধর করা হয়েছে। রোগীর দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী চিকিৎসক ইনজুরি নোটে এসব তথ্য লিপিবদ্ধ করেন।

কিন্তু হাসপাতালে যাওয়ার ঘণ্টা তিনেক পর রাত ৮টার দিকে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে নতুন দাবি জানান। ততক্ষণে জরুরি বিভাগে নতুন শিফটের চিকিৎসক চলে এসেছেন। তার কাছে গিয়ে ওই নারী জানান, তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এবার ঘটনার সময় হিসেবে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার কথা বলেন ওই নারী। দায়িত্বরত চিকিৎসক নতুন করে ইনজুরি নোট লিখে অভিযোগকারীকে হাসপাতালের গাইনি বিভাগে স্থানান্তর করেন।

প্রধান অভিযুক্ত দিলেন ভিন্ন তথ্য
অভিযোগকারী নারীর বর্ণনা অনুযায়ী যিনি ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছেন অর্থাৎ প্রধান অভিযুক্ত- তাকে খুঁজে বের করে তার সঙ্গেও কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত একই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। অভিযুক্ত ব্যক্তি জানান, ভোটের পরদিন (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার ওপর হামলা চালায় শাপলা কলির সমর্থকরা। এ সময় মারধরে তিনি মাথায় আঘাত পান। আহত অবস্থায় তিনি তিমির রঞ্জন দাস নামে এক ব্যক্তির দোকানে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। এরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসাপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসা শেষে রাত দেড়টা থেকে ২টার দিকে তিনি বাড়ি ফিরে যান। হাসপাতালের নথিতে দেখা গেছে, সেখানে লেখা হয়েছে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে এই ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে একই সময়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া আরেক নারীর চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য থেকে। ওই নথি অনুযায়ী, ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তি যে এলাকা থেকে হাসপাতালে এসেছিলেন সেই একই এলাকা থেকে একই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন একজন নারী। তাকেও ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে আঘাত করা হয়েছে বলে হাসপাতালের ইনজুরি নোটে উল্লেখ রয়েছে।
জানা যায়, ধর্ষণে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর যখন হামলা চালানো হয় তখন ওই নারী বাধা দেন। ফলে তার ওপরও হামলা চালানো হয় এবং তার হাতে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে দুজন একসঙ্গে হাসপাতালে যান এবং নারীর হাতে প্লাস্টার করা হয়।
অভিযোগকারী নারীর সিডিআর কী বলছে
দুপক্ষের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে মামলা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের থেকে মোবাইল ফোনের লোকেশন ও সিডিআর সংগ্রহ করেছে এশিয়া পোস্ট। অভিযোগকারী নারীর সিডিআর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি ধর্ষণের যে সময় ও স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন ওই সময়ে তিনি সেই স্থানেই ছিলেন। পরদিন ভোরে মারধরের ঘটনার যে স্থান ও সময়ের কথা বলেছেন সিডিআরের সঙ্গে তার মিল পাওয়া গেছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টা ২৮ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এরপর একটি নম্বরে কল করেন এবং ওই এলাকা থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দেন।
সিডিআরের তথ্য থেকে জানা যায়, ১১টায় ৩৩ মিনিটে ওই নারী পশ্চিমচর বাটা এলাকা থেকে আরেকজনকে কল করেন। এরপর আরও পাঁচটি নম্বরে কল দেন তিনি। ১১টা ৫৮ মিনিটে খাশেরহাট এলাকায় পৌঁছান ওই নারী। ১টা ২৬ মিনিটে পৌঁছান নোয়াখালী সদরের মাইজদীতে।
হাসপাতালে যেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব
মাইজদী থেকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের দূরত্বে। কিন্তু অভিযোগকারী নারী ১টা ২৬ মিনিটে মাইজদী পৌঁছালেও হাসপাতালে গিয়ে তিনি প্রথম রিপোর্ট করেছেন বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টার পর।
অভিযুক্তর সিডিআরে পাওয়া তথ্য
প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির মোবাইল ফোনের লোকেশন অনুযায়ী, তিনি শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিট পর্যন্ত আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকাতেই ছিলেন। সিডিআর বলছে, এই ১২ ঘণ্টায় তার মোবাইল ফোন থেকে বিভিন্ন জনের কাছে অন্তত ৯৫টি বার কল করা হয়েছে।
এরপর রাত ৯টা ১৩ মিনিটে তিনি ছিলেন চরবাটা এলাকায়। সেখান থেকে ৯টা ২২ মিনিটে খাশেরহাট, ১০টা ১ মিনিটে মান্নাননগর, ১০টা ১৪ মিনিটে সোনপুর ও ১০টা ১৯ মিনিটে মাইজদী এবং ১০টা ৩০ মিনিটে তার অবস্থান দেখা যায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল এলাকায়। রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে হাসপাতাল এলাকা ত্যাগ করেন তিনি।
এরপরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাত ১১টা ৪৮ মিনিটে মাইজদী, ১১টা ৫৮ মিনিটে হরিনারায়ণ এলাকা এবং রাত ১টা ৬ মিনিটে আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে একটি নম্বরে কল করেন তিনি। রাত ১২টার কয়েক মিনিট আগে তিনি বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন এবং ১টা নাগাদ সেখানে পৌঁছান।
হাসপাতালের সিসি ক্যামেরায় যা দেখা গেল
প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির দাবি এবং তার সিডিআর রেকর্ড মোতাবেক শুক্রবার রাতে তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ওই সময়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করেছে এশিয়া পোস্ট। তাতে দেখা যাচ্ছে, শুক্রবার রাত ১০টা ২২ মিনিটে অভিযুক্ত ব্যক্তি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করছেন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ওই ব্যক্তিকে মাথায় ব্যন্ডেজসহ দেখা যাচ্ছে। এ থেকে হাসপাতালে আসার আগে তার প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার দাবিরও প্রমাণ পাওয়া যায়। হাসপাতালের ১২ মিনিটের ফুটেজে শেষ পর্যন্ত তাকে জরুরি বিভাগের বেডে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
হাসপাতালের সিসি ক্যামেরার ফুটেজের এই তথ্যের সঙ্গে অভিযোগকারী নারীর বক্তব্যের মিল পাওয়া যায় না। রাত ১১টায় যে ব্যক্তি ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তিনি মূলত ঘটনার আধা ঘণ্টা আগে থেকে হাসপাতালে ছিলেন; যা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০ কি.মি. দূরে এবং যাতায়াতে সময় লাগে অন্তত এক ঘণ্টা।
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যান আকবর
ধর্ষণের অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান আকবর নামের এক ব্যক্তি। এশিয়া পোস্টকে তিনি জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় শুক্রবার রাতে মারধরের শিকার ব্যক্তি ও এক নারীকে তিনি কোস্ট গার্ডের সহায়তায় রাত ৮টার দিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত সাড়ে ১০টার তাকে হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানে চিকিৎসা শেষে দুজনকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। আকবর জেলা শহরে তার ছেলের ছাত্রাবাসে থেকে যান।
অভিযোগকারীর দাবি ও সিডিআর তথ্যে গরমিল
ধর্ষণের শিকার নারীর দাবি, তাকে রাত ১১টার দিকে ধর্ষণ করেছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। কিন্তু সিডিআর ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি রাত ৯টার আগেই নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন এবং সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতাল এলাকায় পৌঁছান। রাত ১১টার সময় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার মানে অভিযোগকারী নারীর উল্লিখিত সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই এলাকাতেই ছিলেন না।
অভিযোগকারী নারীর প্রতিবেশীরা কিছুই জানেন না
অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি একই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করেন। তাদের একজনের ঘর থেকে অন্যজনের ঘরের দূরত্বও ২০০ মিটারেরও কম। এশিয়া পোস্টের প্রতিনিধি সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন ওই এলাকায় যান। তিনি অভিযোগকারী নারীর অন্তত ছয়জন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলেন, যাদের ঘরও ওই নারীর ঘরের ২০০ মিটারের মধ্যে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে তাদের বক্তব্যের ভিডিও এশিয়া পোস্টের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগকারীর ঘরের পশ্চিম দিকের একটি ঘরের একজন বাসিন্দা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওই রাতে কোনো ঘটনা ঘটেনি। সবাই যার যার ঘরে ছিলাম। এখন শুনি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
একই সারির আরেক বাসিন্দা বলেন, আমাদের সঙ্গের একজন নারীর ইজ্জত চলে গেলে আমরা কি চেয়ে থাকব? আমরা তাদের (হামলাকারীদের) রক্ত নিয়ে নিতাম। আমাদের ইজ্জত আর ওই নারীর ইজ্জত কি বেশ-কম আছে? নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
অভিযোগকারীর পাশের ঘরের আরেক বাসিন্দা ধর্ষণের অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, ওই রাতে কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এনসিপির এজেন্টের বক্তব্য
অভিযোগকারী নারী বলছেন, তিনি নোয়াখালী-৬ আসনে (হাতিয়া) জামায়াত জোট মনোনীত প্রার্থী এনসিপি নেতা আব্দুল হান্নান মাসউদকে ভোট দেওয়ায় তাকে নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু হাতিয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এনসিপির নির্বাচনি এজেন্ট নিজাম উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভোটের পরদিন বিএনপির লোকজন এসে আমাদের ঘর-দরজা ভেঙেছে। তবে আমাদের মারেনি। ধর্ষণের কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি। আমি যেটা দেখিনি সেটা আমি কেমনে বলব?
ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির দাবি, নেপথ্যে পুরোনো দ্বন্দ্ব
নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, তার বাড়িতে হামলাকারীদের মধ্যে একজন ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইমরান। অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, আগে তিনি কেয়ারিং চরে থাকতেন। নদীতে বাড়ি ভেঙে যাওয়ার পর এই এলাকায় এসেছেন। এখনও ঠিকভাবে এখানকার কাউকে চেনেন না। ভোটের রেজাল্ট শুনে তিনি বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন নেতাকর্মীদের কাছে নির্যাতনের খবর শুনেছেন। হামলার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছে।
বিএনপি নেতা ইমরান আরও জানান, ওই নারী রুবেল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছেন। অথচ রুবেল কোনো দল করে নাক। ব্রিক ফিল্ডের টাকা নিয়ে তার সঙ্গে পুরোনো দ্বন্দ্ব থাকায় তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা মেলেনি পুলিশের তদন্তেও
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রকল্প বাজার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে এখনো কোনো সত্যতা পাননি।
নোয়াখালী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদেরকে কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ করেনি বা ফোনেও জানায়নি। সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে জেনে একজন অ্যাডিশনাল এসপি ও একজন ইন্সপেক্টরকে সেখানে পাঠানো হয়। স্থানীয় লোকজন ধর্ষণের বিষয়ে জানেন না, তবে মারামারির ঘটনা ঘটেছে বলে জানান। ওই নারী যে ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করছেন হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী সেই ব্যক্তি একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, হাসপাতাল থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ।
তাহলে কেন ওই নারী এমন অভিযোগ তুললেন? জানতে চাইলে নোয়াখালী সহকারী পুলিশ সুপার (হাতিয়া সার্কেল) মো. নুরুল আনোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, আগে থেকে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল। সেটা থেকে টুকটাক ঝামেলা হয়েছে। তবে আপনাদের যেভাবে জানানো হয়েছে ঘটনাটি তেমন না।
তিনি আরও বলেন, শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ার জন্য এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এটি জাস্ট একসাজারেশন প্রোপাগান্ডা। দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য, ইস্যু করার জন্য করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সত্য উদ্ঘাটনে মাঠে রয়েছেন বলেও জানান নুরুল আনোয়ার।
পুরোনো দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক বিরোধ
স্খানীয় সূত্র জানায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেকে ইটের ভাটায় কাজ করেন। নুরুন্নবী মাঝির (সরদার) মাধ্যমে তারা ইটভাটায় কাজ করেন। প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে ১৫ হাজার টাকা পাওনা নুরুন্নবীর। অন্যদিকে অভিযোগকারী নারী নুরুন্নবীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। সেই সূত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে একাধিকবার ধারের টাকা ফেরত চাইতে যান ওই নারী। এ নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে ওই নারীর বিরোধ চলছিল।
অন্যদিকে এনসিপির সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মূলত আওয়ামী লীগের সমর্থক। আওয়ামী লীগের পতনের পর তিনি স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় বিএনপিকে সংগঠিত করার জন্য কাজ করেন।
বিএনপির বক্তব্য
চানন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আকবর হোসেন বলেন, সে (প্রধান অভিযুক্ত) আমাদের কর্মী এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি প্রার্থী।
নোয়াখালী-৬ আসনে ধানের শীষের পরাজিত প্রার্থী এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম এশিয়া পোস্টকে বলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে সে আমাদের কর্মী এটা সঠিক। সে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এর আগে ওই ব্যক্তিকে এনসিপিতে যোগ দেওয়ার জন্য একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এনসিপিতে যোগ দিলে তাকে এই এলাকার সভাপতি করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে তাতে রাজি না হয়ে বিএনপিতে যুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে তার ওপর এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ থাকতে পারে।
এ বিষয়ে এনসিপির চানন্দী ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আকবরের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জিডি ও মেডিকেল বোর্ড
ঘটনার তিন দিন পার হলেও অভিযোগকারীর পক্ষে কোনো কোনো মামলা দায়ের বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত ও গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) হাতিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। সাধারণ ডায়েরির পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেডিকেল বোর্ড গঠন ও ঘটনার আলামত সংগ্রহ করেছে।
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মেডিকেল বোর্ড রিপোর্ট দেবে বলে এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম।