Image description

Asif Bin Ali ( আসিফ বিন আলী )

স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনের ছাত্র হিসেবে রাজনৈতিক যোগাযোগ সবসময়ই আমাকে আলাদা করে টানে। এই নির্বাচনের সময়ও আমার কৌতূহল ছিল, কাছ থেকে দেখে বোঝার চেষ্টা করা যে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি কীভাবে নিজেদের প্রচারণা সাজাচ্ছে। এই দলগুলো নিজেদের জায়গা থেকে বেশ সৃজনশীলভাবে প্রচার চালিয়েছে, সেটা মানতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করে এক জায়গায় এসে আমার চোখ আটকে গেল – বিএনপির প্রচারণার ধরনটা গত কয়েক মাসে একেবারে বদলে গেল, আকাশ পাতাল ফারাক তৈরি হয়ে গেল নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারির মধ্যে।
কমিউনিকেশনের ছাত্র হিসেবে আমার মাথায় তখন সেই পুরনো প্রশ্নই ঘুরতে থাকল: এই পরিবর্তনটা কে ঘটাল, কীভাবে ঘটাল, আর এর লক্ষ্যটা কী ছিল? রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশ্লেষণ করতে গেলে সবসময় দেখতে হয়, কে কাজটা করছে, কী করছে, কীভাবে করছে এবং কেন করছে। এই ফ্রেমে যখন বিএনপির প্রচারণা দেখতে শুরু করলাম, তখন বিষয়টা একটু একটু করে পরিষ্কার হতে লাগল।
প্রথমেই চোখে পড়ল মুখপাত্রের জায়গাটা। সুচিন্তিত, শান্ত অথচ দৃঢ় ভাষায় কথা বলার একজন স্পোকসপারসন হিসেবে মাহদী আমিন সামনে এলেন। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে একটা নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি হলো, যার দায়িত্ব নিলেন ড. জিয়া হায়দার। অনলাইনের ফ্রন্টে কাজ করছিলেন এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এপোলো। দেখা গেল, কেন্দ্র, তৃণমূল আর অনলাইন – এই তিন স্তরে সমন্বিত একটা কমিউনিকেশন টিম ধীরে ধীরে উঠে আসছে।
 
কিন্তু আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে যে জায়গাটায়, সেটা হলো ছোট ছোট এক মিনিট, দেড় মিনিটের ভিডিওগুলো নিয়ে। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি, এই কনটেন্টগুলো কে বানাচ্ছে? কার মাথা থেকে আসছে এই আইডিয়াগুলো? যাদের সঙ্গে বিএনপির কাজ নিয়ে কথা বলি, তাদের কাছ থেকেও খোঁজ নিয়েছি। তখনই জানতে পারলাম, এই ভিডিওগুলোর পেছনে কাজ করছেন ড. সাইমুম পারভেজ।
 
ড. সাইমুম পারভেজকে আমি আগে চিনতাম একেবারে অন্য ভূমিকায়। উনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আমার পূর্ববর্তী সহকর্মী ছিলেন, যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় সরাসরি সহকর্মী হিসেবে সময় কাটানো হয়নি। কিন্তু যখন আমি র্যাডিকালাইজেশন নিয়ে একাডেমিক গবেষণা করেছি, তখন ড. সাইমুম পারভেজ আর আলী রিয়াজের লেখা বহু প্রবন্ধ আমাকে রিভিউ করতে হয়েছে, রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে হয়েছে। স্প্রিংগারের মতো প্রকাশনায়, বড় বড় জার্নালে, নীতিনির্ধারণী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্ল্যাটফর্মে তাঁর কাজ দেখে আমি তাঁকে সবসময়ই একজন সিরিয়াস একাডেমিক হিসেবে চিনতাম। পরে যখন জিল্লুর রহমান ভাই এর প্রতিষ্ঠান সিজিএস মিসইনফরমেশন নিয়ে যে কাজ হল, সেখানে ড. সাইমুম পারভেজ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, তখনও মনে হয়েছে, বিষয়টা কেবল প্রজেক্ট নয়, বরং বাংলাদেশের মিডিয়া বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবদান।
 
এই প্রেক্ষিত থেকেই আমার বিস্ময়টা এসেছে। যে মানুষটাকে আমি চিনতাম মূলত গবেষক হিসেবে, বই আর প্রবন্ধের পাতায়, তিনি যখন সরাসরি পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনে কাজ শুরু করলেন, তখন দেখা গেল তিনি একের পর এক অসাধারণ কনটেন্ট তৈরি করছেন। আমাদের রাজনীতিতে সাধারণত দেখা যায়, টকশো আর মাইকে যারা সবচেয়ে জোরে চিৎকার করেন, তারাই সামনে থাকেন; নরম স্বভাব, বিশ্লেষণী মস্তিষ্ক, তাত্ত্বিক প্রস্তুতি আছে এমন মানুষ অনেক কম দেখা যায়। একসময় আওয়ামী লীগের মধ্যে গওহর রিজভির মতো কিছু মানুষ ছিলেন, কিন্তু সেই ধারাটা অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হলো, হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া ধারার একটা নতুন সংস্করণ বিএনপির ভেতরে ফিরে আসছে, যেখানে ড. সাইমুম পারভেজ ভাইদের মতো মানুষরা জায়গা পাচ্ছেন।
আমি তখন আরও কাছ থেকে দেখতে শুরু করলাম, এই ভিডিওগুলো কীভাবে বানানো হচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে বানানো হচ্ছে। ধর্ম নিয়ে মানুষের ভুল ধারণা ভাঙার জন্য ছোট ছোট ক্লিপ, “ফ্যামিলি কার্ড” ধারণাকে সহজ ভাষায় তুলে ধরা, জুলাইয়ের আহত আর মুক্তিযুদ্ধের আঘাতকে একই ট্রেনের ভেতর এনে এক ধরনের আবেগ তৈরি করা – এগুলো নিছক ভিডিও নয়, এগুলো খুব হিসাব করে বানানো রাজনৈতিক বার্তা। কমিউনিকেশনের ভাষায় যাকে বলি “ন্যারেটিভ শিফট” বা বয়ান বদলে দেওয়া। সেই কাজটাই সৃজনশীলভাবে করেছেন ড. সাইমুম পারভেজ। আমার কাছে এটা মনে হয়েছে, যোগাযোগের খেলাটা তিনি পুরোপুরি বুঝে ফেলেছেন, এবং মাঠেও সেটার প্রয়োগ করছেন।
এই চার মাসে যাদের নাম উপরে বললাম তারা মিলে বিএনপির ইন্টারনাল কমিউনিকেশনকে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন বলে আমার ধারণা। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি জানি, বিএনপির জন্য আগামীর রাজনীতি সহজ হবে না। সরকার গঠন করাই শেষ কথা নয়; আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হবে সরকার গঠনের পর। পুরোনো প্লেবুক দিয়ে সামনে যা আসছে, তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।
 
এর কারণও পরিষ্কার। এতদিন বিএনপি ছিল ক্ষমতার বাইরে, তাই সামাত সমর্থিত ক্ষমতাবানদের অপপ্রচার বা সমালোচনার মুখে অনেক সিভিল সোসাইটি সদস্য, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কিংবা একাডেমিক বিএনপির সমর্থনে কথা বলেছেন। কিন্তু যখন বিএনপি সরকারে চলে যাবে, তখন একই মানুষদের বড় একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই সরকারের প্রতি সমালোচনামূলক অবস্থানে চলে যাবেন। সিভিল সোসাইটি ও ইন্টেলেকচুয়াল স্পেসে এটাই স্বাভাবিক প্রবণতা, কেউই সরাসরি ক্ষমতার খুব কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে চায় না। এই জায়গায় সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে যারা পারে, যারা একই সঙ্গে একাডেমিক, টেকনিক্যালি দক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে শার্প, তাদের ভূমিকাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, বিএনপি যদি সামনে সত্যিকার অর্থে গুড গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে শুধু ব্যবসায়ী, অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী বা মাঠের রাজনীতিবিদদেরকেই জায়গা দিলে হবে না। পাশাপাশি ড. সাইমুম পারভেজদের মতো মানুষদেরও গুরুত্ব দিতে হবে, তাদের চিন্তাশক্তি ও দক্ষতাকে ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে জায়গা দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি পুলিশ, লাঠি আর ভয় দেখিয়ে চালানো সম্ভব না। এই রাজনীতি করতে হবে যুক্তি দিয়ে, তর্ক দিয়ে, সহমর্মিতা আর সহাবস্থানের ধারণা সামনে রেখে।
বিএনপি এই নির্বাচনে যে ট্যালেন্টগুলো ব্যবহার করে জিততে চলেছে, নির্বাচনের পর সেই ট্যালেন্টগুলোকে কতটা প্রমোট করবে, কতটা ক্ষমতায়িত করবে, তার ওপরই নির্ভর করবে তারা কেমন শাসন দেবে। আমার আশা, এই পরিবর্তিত কমিউনিকেশন কালচারে ড. সাইমুম পারভেজএর মতন যারা পরিশ্রম করেছেন, ক্রেডিট নিতে সামনে আসেন নি, যারা নতুন ধরণের রাজনৈতিক ভাষা ও ক্যাম্পেইনের রূপ দিয়েছেন, বিএনপি তারা যেন বাস্তব মূল্যায়ন পায়। কারণ শেষ পর্যন্ত, দল টিকে থাকবে কেবল স্লোগানে নয়, টিকবে সেই মানুষগুলোর কাঁধে, যারা নীরবে বুদ্ধি আর শ্রম দিয়ে তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথটা গুছিয়ে দিচ্ছেন।