Image description
নির্বাচনের আর মাত্র একদিন

আর মাত্র একদিন পরে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে এখন সাজ সাজ রব। অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক সবখানেই প্রচারে ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। শেষ মুহূর্তে ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে প্রার্থীরা ছুটে চলেছেন দ্বারে দ্বারে, জানাচ্ছেন নিজেদের অঙ্গীকার। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন মানেই ছিল এক ধরনের নীরবতা ও অনিশ্চয়তা। সেই দীর্ঘ বিরতির পর এবারের নির্বাচন যেন মানুষের মনে আবারও হারিয়ে যাওয়া উৎসবের অনুভূতি ফিরিয়ে এনেছে।

ভোটকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ, আলোচনা আর কৌতূহল স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। যদিও নির্বাচন নিয়ে একটি অংশের মধ্যে হতাশা, শঙ্কা ও রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা দেখা গেছে, তবু সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজই বেশি দৃশ্যমান। সব মিলিয়ে যেন রাজধানীজুড়ে জমে উঠেছে ভোটের উৎসব।

সোমবার রাজধানী ঢাকার তিনটি আসনের (৭, ৮ ও ১০) বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নগরের বিভিন্ন গলি থেকে শুরু করে মূল সড়ক সকল জায়গায় প্রার্থীদের বড় বড় ব্যানার, ফেস্টুনে ছেঁয়ে গেছে। ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচনী এলাকা নীলক্ষেত মোড় থেকে শুরু করে সায়েন্স ল্যাব মোড়, ধানমন্ডি, কলাবাগান পর্যন্ত প্রার্থীরা তাদের ছবি, প্রতীক আর প্রতিশ্রুতির বাহারি ব্যানার-ফেস্টুনে ঢেকে দিয়েছেন পুরো এলাকা। সাদা-কালো পোস্টারের চিরচেনা রূপের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যানারের আধিপত্য এবার চোখে পড়ার মতো।

একই দৃশ্য দেখা গেছে ঢাকা-৭ ও ঢাকা-৮ আসনেও। যে যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই ব্যানার টাঙিয়েছেন। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে মোড়ে মোড়ে প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্প দেখা গেছে যেখানে মাইকে বাজছে দলীয় গান ও স্লোগান। একইসাথে গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ বা না প্রচারণা করতেও দেখা গেছে। এ ছাড়াও, নেতাকর্মীদের ডেকে ডেকে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলতে, লিফলেট বিতরণ করতে এবং নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে দেখা গেছে যা তাদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।

তবে এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এবার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রচার অনেক বেশি সরব। প্রার্থীরা ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের বক্তব্য, নির্বাচনী কর্মসূচি, ভিডিও বার্তা ও প্রতিশ্রুতি নিয়মিত প্রচার করছেন। এতে করে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সহজ হয়েছে এবং নির্বাচনী প্রচারণায় এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন রাজনীতি, প্রযুক্তি ও জনসম্পৃক্ততার এক ব্যতিক্রমী সমন্বয় তৈরি করেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আবারও নির্বাচনী উৎসবের অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলছে।

ভোটাররা বলছেন, যারা তাদের বিপদে সবসময় পাশে থাকবেন এমন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নিবেন তারা। তাদের ভাষ্যমতে, বিগত নির্বাচনগুলোতে তাদের এতটা আগ্রহ ছিল না। কারণ হিসেবে একতরফা নির্বাচন আর সহিংসতার ভয় ছিল বলে উল্লেখ করছেন তারা। তবে, ৫ আগস্ট গণঅভ্যুথানের পর দেশে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে ফলে আগ্রহ বেড়েছে বহুগুণে।

বাংলামোটর মোড়ে চায়ের দোকানে চুমুক দিচ্ছিলেন আর নির্বাচন নিয়ে আলাপ করছিলেন দুই বন্ধু শরীফ ও রিফাত (২৩)। তাদের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। প্রশ্ন করলে শরীফ বলেন, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে এদেশের মানুষ ঠিকভাবে ভোট দিতে পারিনি। তারা নিজের মত প্রকাশ করতেও ভয় কাজ করত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আলাদা। কোনো চাপ ছাড়াই নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারব। আমরা দেশটাকে গড়তে চাই, নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে চাই। অনেকের কাছেই এটা দীর্ঘ সময় পর ভোট দেওয়ার একটা বড় সুযোগ।

তবে সবচেয়ে বড় চাওয়া ভোটটা যেন সুষ্ঠু আর শান্তিপূর্ণ হয় বললেন রিফাত। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা না থাকে। নির্বাচনের পর যিনি জয়ী হবেন, তার কাছে এলাকার সমস্যা সমাধান আর মানুষের কথা শোনার প্রত্যাশা থাকবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে মানুষের আস্থা ফিরবে, সেটাই আমাদের কামনা।
সিটি কলেজের সামনে কথা হয় শিক্ষার্থী মেহেরিন আফরোজের (২০) সাথে। এবারই প্রথম ভোট দেবেন, জানালেন নিজের অনুভূতি ও প্রত্যাশার কথা। মেহেরিন বলেন, একজন নারী ভোটার হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিরাপত্তা। এবার দেখছি পরিবেশটা আগের চেয়ে অনেক শান্ত। ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় লাগছে না। প্রার্থীরাও বাসায় বাসায় এসে কথা বলছেন, নারীদের মতামত জানার চেষ্টা করছেন। এতে আমাদের অংশগ্রহণের আগ্রহটা অনেক বেড়েছে। তার কাছে, তরুণ প্রজন্মের জন্য এই নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়লে রাজনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেন এই শিক্ষার্থী।

এদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনী জোট তাদের প্রচারাভিযানে দেশের মানুষের প্রতি নানা অঙ্গীকার তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং এনসিপিসহ অংশগ্রহণকারী দলগুলো ইতোমধ্যে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এসব ইশতেহারের মাধ্যমে তারা দেশের বর্তমান সমস্যা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জনগণের প্রত্যাশার কথা সামনে এনে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছে।