ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণভোট উপহার দিতে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীসহ সব বাহিনীর সদস্য।
আনুষ্ঠানিকভাবে তারা সাত দিন থাকবে, সঙ্গে থাকবেন ১ হাজার ৫১ জন ম্যাজিস্ট্রেট। ভোটের শৃঙ্খলায় মাঠে থাকছে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন এবং আনসার ব্যাটালিয়ন মোবাইল এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। বিজিবি, র্যাব, এপিবিএন এবং আনসার ব্যাটালিয়ন জেলা, উপজেলা ও থানাভিত্তিক কাজ করবে। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার জন্য কোস্ট গার্ড মোতায়েন থাকবে। সব বাহিনী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট করবে। নির্বাচনি সহিংসতা ঠেকাতে এবং যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সমন্বিতভাবে কাজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন ও গণভোটে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩, সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র?্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর বাইরে ৪৫ হাজার ৮২০ জন গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার) দায়িত্ব পালন করছেন। ভোট গ্রহণের সময় সহিংসতার খবর পেলেই একযোগে কাজ করবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন, সব ক্ষেত্রেই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অধীনে কাজ করবে এসব বাহিনী। এ ছাড়া বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনি নিরাপত্তার বৃহৎ কর্মযজ্ঞে তারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।
নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার জন্য শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখাতে পুলিশ, বিজিবি, আনসার-ভিডিপিসহ কোস্ট গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে গতকাল থেকে মাঠে নেমেছেন ১ হাজার ৫১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা ভোটের মাঠে থাকবেন। গত শনিবার নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। একই সঙ্গে নির্বাচনের দায়িত্ব শুরু হচ্ছে সেনাবাহিনীর আরও সদস্যসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের।
ইসি মাছউদ বলেন, সেনাবাহিনী আগে থেকেই মাঠে আছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা ভোটের আগে-পরে সাত দিন থাকবে। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা সবাই বলেছে যে মাঠের অবস্থা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভালো এবং নির্বাচনের জন্য সহায়ক আছে। সব ব্যালট বাক্স জেলায় জেলায় পাঠানো হয়েছে। রিটার্নিং অফিসাররা সেগুলো গ্রহণ করছে।
এখন সবাই ভোটের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, নির্বাচনে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সারা দেশে প্রতিটি সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ১৬-১৭ জন এবং ঝুঁঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭-১৮ জন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আর মেট্রোপলিটন এলাকার সাধারণ ভোট কেন্দ্রে পুলিশ ও আনসারের ১৬ জন ও ঝুঁঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন। দুর্গম ঘোষিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোট কেন্দ্রে ১৬-১৮ জন করে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এসব সদস্য ভোট গ্রহণের দুই দিন আগ থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন। নির্বাচন সংক্রান্ত আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলে অভিযোগ জানাতে ৯৯৯ এ কল করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, নির্বাচনি নিরাপত্তায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য মাঠে নেমেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ সদস্য ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় থাকবে, বাকি পুলিশ সদস্যরা সাপোর্টিং হিসেবে কাজ করবে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের মূল দায়িত্বে থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পেছনে পুলিশ সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য নয়, পুলিশের আনুগত্য থাকবে কেবল আইন ও দেশের প্রতি। নির্বাচনকালীন পুলিশের আচরণ হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, ন্যায়নিষ্ঠ ও পেশাদার।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী উপ-পরিচালক (মিডিয়া) মো. আশিকউজ্জামান বলেন, আনসার ও ভিডিপির প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার সদস্য দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের জন্য গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে মাঠে নেমেছে, থাকবে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিটি উপজেলায় দুটি করে মোট ১ হাজার ১৯১টি স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে, প্রতি টিমে ১০ জন থাকবে। সুরক্ষা অ্যাপের ইন্ডইউজার হিসেবে প্রতিটি কেন্দ্রে দুজন করে আনসার ও ভিডিপির সদস্য থাকবেন। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তারা এ অ্যাপের মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করতে পারবেন। পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি নিরাপদ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫ জন সদস্য গত ১৮ জানুয়ারি থেকে উপকূলীয় এবং নদী তীরবর্তী দুর্গম ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকার ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। চলবে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহল ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে কোস্ট গার্ড বদ্ধপরিকর। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখেই সারা দেশে ৩৭ হাজারেরও অধিক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টি উপজেলায় বিজিবি নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে। ঝুঁকি বিবেচনায় সারা দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনেই বিজিবি মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে দায়িত্বে থাকবে। উপজেলা ভেদে দুই থেকে চার প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকবে। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির র?্যাপিড অ্যাকশন টিম (র্যাট), ডগ স্কোয়াড এবং হেলিকপ্টারসহ কুইক রেস্পন্স ফোর্স (কিউআরএফ) প্রস্তুত রয়েছে। প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে ২ হাজার ৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন। এর মধ্যে আড়াই শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন, বাকিরা ৫১টি দলের প্রার্থী।