তিনদিন পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হবে। দেশব্যাপী প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় নির্ঘুম সময় পার করছেন। নির্বাচনের প্রায় সব প্রস্তুতিও শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ভোটার ও প্রার্থীদের মাঝে উদ্বেগ-আতঙ্ক কিছুতেই কাটছে না।
দেশ জুড়ে সংঘাত, সহিংসতা, অবৈধ অস্ত্রের আতঙ্ক, সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া আচরণ, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো শঙ্কার কথা বলছে সব পক্ষই। এ অবস্থায় ভোটের দিন ভোটার ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভোটের মাঠের নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও ঘুরেফিরে উদ্বেগ- আতঙ্কের বিষয়টি সামনে আসছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্ত সংঘাত সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। এর বাইরে গোয়েন্দারা দেশের বিভিন্ন জেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী কর্তৃক ভোটকেন্দ্রে হামলা সহিংসতার ঘটনাও ঘটতে পারে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, গত ১১ই ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে সাড়ে পাঁচ শতাধিকের বেশি নির্বাচনী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে ১৮০টি সংঘর্ষ, ২৮টি অবরোধ বা বিক্ষোভ, প্রার্থীর ওপর আক্রমণ ৪২টি ও প্রচারে বাধা দেয়ার ১১৯টি ঘটনা ঘটেছে। সূত্র আরও জানিয়েছে, ২৮শে জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী অপরাধের সংখ্যা ছিল ৩৭০টি। গত আট দিনে দুইশ’ নির্বাচনী অপরাধ ঘটেছে। অর্থাৎ ভোটগ্রহণের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনে সহিংসতা ও সংঘাত বাড়ছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ও কারাগার থেকে ৫ হাজার ৮৪৭টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩৬২ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় অস্ত্র আইনে ২ হাজার ৩৯৩টি মামলা করা হয়েছে। এসব অস্ত্রের বাইরে দেশের অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে দেদারছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে অস্ত্র প্রবেশ করছে। নির্বাচনকে সামনে রেখেই এসব অস্ত্র নিয়ে আসছে চোরাকারবারিরা। বিভিন্ন বাহিনীর গোয়েন্দারা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ৩০ রুট শনাক্ত করেছেন। এসব রুট দিয়েই অস্ত্র প্রবেশের তথ্য রয়েছে। সেগুলো হলো- চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের রহনপুর রাঘব বাটি, গোপালপুর, মনাকষা, একই এলাকার সোনা মসজিদ, আজমতপুর, বিলভাতিয়া, ঝিনাইদহের মহেশপুরের জুলুলী, সাতক্ষীরার কলারোয়ার তলুইগাছা; যশোরের বেনাপোল ও চৌগাছা, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত; চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, সাতক্ষীরার শাঁকারা, মেহেরপুর, কুমিল্লার সরাইল, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি; কক্সবাজারের টেকনাফের খড়ের দ্বীপ ও উখিয়া, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চরচিলামারী, সিলেটের কানাইহাট, জৈন্তাপুরের মিনাটিলা, জাফলংয়ের কাটরি, সুনামগঞ্জের ছনবাড়ি বাজার ও চারাগাঁও, দিনাজপুরের গিলবাড়ি ও মৌলভীবাজারের বড়লেখার তারাদরম সীমান্ত। নির্বাচনের সময় এসব অস্ত্র ব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে।
অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে আসা অবৈধ অস্ত্র ও পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এসব অস্ত্র এখন অপরাধীদের কাছে। অগণতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের হয়ে সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ভোটের মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এর বাহিরে জেল পলাতক বন্দিরা এখনো অধরা। এদের মধ্যে অনেকেই দাগি অপরাধী জঙ্গি রয়েছে। তাদের ব্যবহার করে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করবেন কিছু কিছু প্রার্থীরা। এ ছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ প্রার্থীদের হয়ে কাজ করছেন এমন তথ্যও রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। মূলত পুলিশের দুর্বলতা ও সক্ষমতার অভাবের কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া আচরণ করছে। তাই নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কঠোর অবস্থানই তৈরি করতে পারে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, যে চ্যালেঞ্জগুলোর কথা দীর্ঘসময় ধরে আমরা বলে আসছি সেগুলো এখনো পরিপূর্ণ হয়নি। বিশেষ করে গণ-অভুত্থানের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এগুলো যতদিন মাঠে থাকবে ততদিন একটা ভয় কাজ করবে। এর বাইরে ওই সময় কারাগার ভেঙে যেসব অপরাধীরা পালিয়েছে তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। নির্বাচনী সংঘাত-সহিংসতার জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ থাকা দরকার তার সবকিছু এখনো আছে। এ ছাড়া যারা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন প্রার্থীর হয়ে ভোটের মাঠে উত্তাপ ছড়ান সেই চ্যালেঞ্জও আছে। এগুলো শুধু নির্বাচন না সবসময়ই ভয়ের কারণ। তিনি বলেন, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে এসে অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে ও অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে- কিন্তু এগুলো আরও আগে হলে প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকতো না। তাই প্রতিটি পর্যায় থেকে দায়িত্বশীল ও দেশের প্রচলিত এবং নির্বাচনী নিয়ম না মানলে শঙ্কার জায়গা বাড়বে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করছে না। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা সেটি নির্ভর করবে রাজনৈতিক দল, তাদের প্রার্থী ও আচরণের ওপর। তাদের আচরণ যদি সহিংসতায় রূপ না নেয় এব একইসঙ্গে যদি ব্যালট বক্স ছিনতাইসহ কারচুপি, ভোটারদের বাধা না দেয়া হয় তাহলে ভোট শান্তিপূর্ণভাবে হতে পারে। উদ্বেগ আতঙ্ক কাটানোর জন্য সবারই দায়িত্ব আছে তবে মূল দায়িত্ব প্রার্থী ও দলের।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, যে দেশের মানুষ ভোটের অধিকার বুঝে না সেদেশে এ ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করা স্বাভাবিক। এ ছাড়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রচুর অস্ত্রের ছড়াছড়ি। অস্ত্র প্রবেশ করছে পাহাড় দিয়ে। সেই অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দেশে। হাত বদলে চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের কাছে। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোভাব ও সক্ষমতা যতটুকু নড়বড়ে হয়েছিল সেটি এখনো পুরোপুরি পরিবর্তন হয়নি। এখনো পুলিশের ওপর আক্রমণ, গালাগালি করছে মানুষ। তাই এ অবস্থায় পুলিশের পক্ষে কড়াকড়িভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না। তিনি বলেন, যারা মনে করবে ভোটে ভালো করতে পারবে না তারাই সহিংস ও নাশকতামূলক কাজ করতে পারে। এটাই এখন শঙ্কার বিষয়।