২০২০ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে তখন ‘জাতির পিতার সম্মান, রাখব আমরা অম্লান’ স্লোগানে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম জেলা কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়। দেশের অন্য কোথাও বিচারকদের এমন সমাবেশ দেখা না গেলেও চট্টগ্রামে বিচারকদের নিয়ে আয়োজিত ওই সমাবেশে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান।
বিচারকদের আচরণবিধি উপেক্ষা করে এ ধরনের সমাবেশে অংশ নিয়ে দলীয় আনুগত্য পোষণকারী এই বিচারক পরে আরও ভালো ভালো পেস্টিং ও সুবিধা নিয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন সে ব্যক্তিকেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। সচিবালয়ের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সচিব হিসেবে বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ বিচারকরা। সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিচারক কালবেলাকে বলেন, বিচারক শেখ আশফাকুর রহমান বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের একজন সুবিধাভোগী। বিচার বিভাগে ফ্যাসিজম কায়েমের দায়ে তার শাস্তি হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সেটা না হয়ে তিনি পুরস্কৃত হচ্ছেন।
শুরুতেই যদি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়, তাহলে স্বাধীন সচিবালয় হবে কীভাবে—এমন প্রশ্ন রেখে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের বাস্তবায়ন জরুরি। বিগত সময়ের বিচার বিভাগের নতজানু অবস্থা এবং রাজনৈতিক ফরমায়েশি রায়ের সংস্কৃতি থেকে মুক্তির জন্যই আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা জরুরি ছিল। কিন্তু পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় প্রথম পদায়নেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ব্যক্তিদের সেখানে পদায়ন করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের অনেকেই এই নিয়োগ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে এই নিয়োগের ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি আইন মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সচিব হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে এবং অতিরিক্ত সচিব হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ রুহুল আমীনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া অন্য এক প্রজ্ঞাপনে যুগ্ম সচিব হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ বি এম তারিকুল কবির, উপসচিব হিসেবে পঞ্চগড়ের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুল ইসলাম ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ সুব্রত ঘোষ শুভ, সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে মহসিনা হোসেন তুষি ও সাদিয়া আফরিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগের পরপরই বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় আদালত প্রাঙ্গণে। বেশি সমালোচনা চলছে সচিব নিয়োগ নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের বিচারকরা রাজপথে সমাবেশ করেন। ওই সমাবেশের নেতৃত্ব দেন বিচারক শেখ আশফাকুর রহমান। বিষয়টি নিয়ে ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন বিচারকরা। নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইন সংলগ্ন পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) সামনের সড়কে ‘জাতির পিতার সম্মান, রাখব আমরা অম্লান’ স্লোগানে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, চট্টগ্রাম জেলা কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন করেন তারা। এরপর সেখান থেকে মিছিল নিয়ে তারা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে যান। সমাবেশে বক্তৃতায় চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান বলেন, বিচারক হলেও আমরা মানুষ। তাই আজ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, যখন জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিনে দেশে একটা ন্যক্কারজনক উদ্যোগ ও তার প্রতিক্রিয়া দেখেছি আমরা। যেটা আমাদের সবাইকে নাড়া দিয়েছে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে একটি মৌলবাদী গ্রুপ। এ ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপ পৃথিবীর যে দেশেই কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তারা শুধু দেশের নয় ইসলামের ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। তারা জানে না, তাদের জানা কত কম। ইসলামের সবচেয়ে সুন্দর বৈশিষ্ট্য, যেখানেই তা গেছে প্রচারের জন্য সেখানকার কৃষ্টি সংস্কৃতিকে ধারণ করে নিয়েছে। কিন্তু এখন কিছু মৌলবাদী গ্রুপ বুঝতেই চাইছে না। ইসলাম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে সৌন্দর্যের মধ্যে। কূপমণ্ডূক কিছু মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে ইসলামের।’
তথ্য বলছে, শেখ আশফাকুর রহমানের বাড়ি সাতক্ষীরায়। তার পিতার নাম অ্যাডভোকেট দেলদার রহমান। তিনি সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্যানেল থেকে দুবারের জন্য সভাপতি হয়েছিলেন। কট্টর আওয়ামী পরিবারের সদস্য আশফাকুর রহমান বিচার বিভাগে আওয়ামী তন্ত্র চালিয়েছে ব্যাপকভাবে। শুধু প্রতিবাদ সমাবেশে অংশগ্রহণই নয়, তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সুবিধাভোগীদের অন্যতম একজন। আওয়ামী লীগ আমলে আইন মন্ত্রণালয়, সুপ্রিম কোর্ট, চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ, সিলেট মহানগর দায়রা জজসহ গুরুত্বপূর্ণ সব জায়গায় ছিল বিচারক আশফাকুর রহমানের পোস্টিং। এখানেই শেষ নয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাত্র তিন মাস আগে ২০২৪ সালের ২৫ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পক্ষে জুডিসিয়াল ক্যু করার চেষ্টাকারী সাবেক প্রধান বিচারপতির ওবায়দুল হাসানের সঙ্গে আমেরিকা সফর করেন তিনি। চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় বিচারকদের ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পরিচালক পদে পদায়ন পান। কিছুদিনের জন্য আশফাকুর রহমানকে সিলেটের জেলা জজ হিসেবে পাঠানো হলেও তিনি আবার ঢাকায় লিগ্যাল এইডের পরিচালক হিসাবে পদায়ন নিয়ে চলে আসেন। এবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের শীর্ষ পদটিও বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।
সচিবের পাশাপাশি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে জেলা ও দায়রা জজ রুহুল আমিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনিও আওয়ামী সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে রাজবাড়ীর জেলা জজ হন। সবশেষ আইন মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ করা হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে এভাবে সুবিধাভোগীদের সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।