আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটের মাঠে কোটিপতি ও ব্যবসায়ীদের ব্যাপক দাপট রয়েছে। অন্যদিকে ৪১.০৬ শতাংশ প্রার্থীর বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকার কম। আছেন ঋণগ্রস্তরাও। এবার প্রায় ৭০ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত। তবে প্রার্থীদের একটি বড় অংশ আয়কর বিবরণী দাখিল করেননি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থার প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার, কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে ঋণগ্রহীতা প্রার্থীদের তথ্য তুলে ধরে সুজন জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সর্বমোট ২০২৬ প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জন (২৫.৬২%) ঋণগ্রহীতা। ৫১৯ জন ঋণগ্রহীতার মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার অধিক ঋণ গ্রহণ করেছেন ৭৫ জন (১৪.৪৫%)। ৫১৯ জন ঋণগ্রহীতার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩২.১৭% (১৬৭ জন) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি)। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচনে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এই হার ছিল ২২.৮৩%। এবার তা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২০.৯৩%।
তথ্যানুযায়ী, টাকার পাহাড়ের নিচে সাধারণ ও যোগ্য প্রার্থীরা দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। এবারের নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীই কোটিপতি। বিশেষ করে বড় দলগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে বিত্তের প্রভাব প্রকট। এসব দলের মধ্যে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ২৭৬ জন (৯৫.১৭%) কোটিপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামীতে কোটিপতির সংখ্যা ১৭৮ জন (৭৮.৪১%) জন। কোটিপতি প্রার্থীর ক্ষেত্রে তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে ১৮৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী (৬৮.৩৬%) এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সর্বমোট ২০২৬ প্রার্থীর মধ্যে ৮৩২ জনের (৪১.০৬%) বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকার কম, ৭৪১ জনের (৩৬.৫৭%) ৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা, ১৩২ জনের (৬.৫১%) ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় দেখানো হয়েছে। শীর্ষ আয়কারীদের তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছেন কুমিল্লা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাকারিয়া তাহের। তার বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে টাঙ্গাইল-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আসাদুল ইসলাম, যার আয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। প্রায় ১৯ কোটি টাকা আয় নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জাকির হোসেন পাটওয়ারী। তালিকায় চতুর্থ বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তার আয় ৯ কোটি টাকার বেশি। ৮ কোটি টাকার বেশি আয় নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে আছেন টাঙ্গাইল-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীর। তালিকায় থাকা বাকি পাঁচজন হলেন যথাক্রমে কক্সবাজার-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ, কুমিল্লা-৫ আসনের বিএনপির প্রার্থী মো. জসীম উদ্দিন, নেত্রকোনা-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী কায়সার কামাল, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী এবং কুমিল্লা-৭ আসনের বিএনপির প্রার্থী রেদোয়ান আহমেদ। তাদের সবার আয় চার থেকে সাড়ে ছয় কোটি টাকার মধ্যে। সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনে আয়কর প্রদানকারী প্রার্থীর হার বেড়েছে। আগের নির্বাচনে এই হার ছিল ৪৭ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ১০ শতাংশে। সুজন জানায়, শিক্ষাগত যোগ্যতায় এবারের প্রার্থীরা উজ্জ্বল হলেও (প্রায় ৭০.১৪ শতাংশ স্নাতক বা তদূর্ধ্ব) রাজনীতির এই ‘ব্যবসায়িকীকরণ’ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতি যখন ধনিক শ্রেণির করায়ত্ত হয়, তখন সাধারণ ও যোগ্য প্রার্থীদের জন্য মাঠ সংকুচিত হয়ে পড়ে। সুস্থ ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের জন্য এই আর্থিক বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।