ব্যাপক অনিয়ম এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। সম্প্রতি ব্যাংকটির ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উঠেছে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে এমন গুরুতর অনিয়মের তথ্য। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বিরুদ্ধে তার পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদায়ন এবং তার খেয়ালখুশিতেই ব্যাংকটির কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া চেয়ারম্যান নিয়োগেও মানা হয়নি বয়সের সীমা। অর্থাৎ নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একদম ‘ফ্রি স্টাইলে’ চলছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংকের নীলফামারীর সৈয়দপুর শাখায় প্রায় ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশেষ নিরীক্ষা ও তদন্ত প্রতিবেদনে জাল ভাউচার, আরটিজিএস, চেক ক্লিয়ারিং, ইএফটি এবং কৃত্রিম লেজার এন্ট্রির মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে এই আর্থিক জালিয়াতির সুস্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে ঘটনাটিকে ‘গভীর পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সৈয়দপুর শাখার সিনিয়র অফিসার মো. আলিমুল আল রাজি তমাল ও রংপুর সার্কেলের তৎকালীন জিএম স্বপন কুমার ধরকে এই লুটপাটের মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ঘটনায় শাখা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের মোট ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে নাম থাকার পরও তমালের বিরুদ্ধে এখনো মামলা না হওয়ায় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তমাল বর্তমানে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক।
তদন্তে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত একাধিক ধাপে প্রায় ৬০ কোটি টাকা সরানো হয়। তমাল শাখার এনজি, আরটিজিএস, ইএফটি, ফরেন রেমিট্যান্স, ব্যাচ ক্লিয়ারিংসহ গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কের দায়িত্বে থেকে বিভিন্ন কর্মকর্তার আইডি ও পাসওয়ার্ড অপব্যবহার করে ভুয়া লেনদেন সৃষ্টি করেন। তিনি ১৩২ কোটির বেশি টাকার কাল্পনিক ডেবিট ও ক্রেডিট লেজার এন্ট্রি তৈরি করেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা হিসাববহির্ভূত অবস্থায় পড়ে থাকে, যা আর সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ক্লিয়ারিং সাসপেন্স হিসাব থেকে অগ্রণী সুপার অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত হিসাব, ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো ও আরটিজিএসের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিভিন্ন শাখা ও অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে পরে তুলে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তদন্ত কমিটি প্রায় ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাতের হিসাব পেয়েছে।
জড়িত অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন—রংপুর অঞ্চলের তৎকালীন কর্মকর্তা ডিজিএম মোস্তাফা ই কাদের, এজিএম মো. জাহাঙ্গীর আলম, ডিজিএম ইকবাল করিম আকন্দ, সৈয়দপুর শাখার এসপিও মনিরুজ্জামান, পিও জায়েম, এসও (সুপারনিউমেরারি) আব্দুল খালেক সরকার, সিনিয়র অফিসার শাহনাজ বেগম, অফিসার (ক্যাশ) তমাল চন্দ্র রায়, সিনিয়র অফিসার (অব.) আব্দুল ওয়াজেদ, সিনিয়র অফিসার (সুপার নিউমেরারি) মো. তাইজুল ইসলাম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আব্দুল লতিফ, অফিসার (ক্যাশ) মো. মাইদুল ইসলাম, সিনিয়র অফিসার মো. আমিরুল ইসলাম ও এসও মো. আক্তারুজ্জামান।
তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের জন্য তদারকির ঘাটতি, দৈনিক রিকনসিলিয়েশন না করা, কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং আঞ্চলিক ও প্রধান কার্যালয়ের কার্যকর নজরদারির ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয়েছে। রংপুর অঞ্চলের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
এদিকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এমডি পুরো বিষয়টি জানতেন এবং তার আমলেই এই জালিয়াতির বড় অংশ সংঘটিত হয়েছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের পতনের পর বর্তমান এমডি আনোয়ারুল ইসলাম নিয়োগ পান। নিয়োগ পাওয়ার পরই স্বজনপ্রীতি শুরু করেন। নিজের লোকদের পছন্দমতো জায়গায় বদলি ও পদোন্নতি দিচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, জিএম স্বপন কুমার ধর ও আলিমুল আল রাজি তমাল ছিল তার পছন্দের ব্যক্তি। জালিয়াতির সময় জিএম স্বপন কুমার ধর অগ্রণী ব্যাংক সৈয়দপুর শাখায় ছিল। তমালকে বদলি করে সৈয়দপুর শাখায় পাঠিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম। সিনিয়র অফিসার আলিমুল আল রাজি তমাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। শাখার স্টাফদের সঙ্গে হেড অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ক্ষমতা দেখাতেন।
একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, বর্তমান এমডি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। এমডির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াসহ ব্যাপক অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একদম ফ্রি স্টাইলে এসব অনিয়মের সঙ্গে স্বয়ং ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের যোগসাজশ রয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ওইটা (তদন্ত) তো এখনো ফাইনাল হয়নি। এখন বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্ত হচ্ছে, উচ্চ পর্যায়ে তদন্ত চলছে। নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত টাকার পরিমাণ সঠিক বলা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ইনসপেকশন টিম গঠন করা হয়েছে, আমাদের ব্যাংকের উচ্চতর পর্যায়ের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, পছন্দের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের বিষয়টি সঠিক নয়, কারণ একজন এমডি নিম্নপদের কাউকে ডিল করে না। সব দায়িত্ব ভাগ করা আছে। আমার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সত্য নয়।
এদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নীতিমালা মানা হয়নি। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নীতিমালায় স্পষ্ট করে বলা রয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর বয়স অবশ্যই ৭৫ বছরের বেশি এবং ৪৫ বছরের কম হতে পারবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে কোনো ব্যক্তি চেয়ারম্যান বা পরিচালক পদে নিযুক্ত হওয়ার যোগ্য হবে না; কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদকে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বিধান মানা হয়নি।
ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। গণঅভ্যুত্থানের পরপরই গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর তাকে পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রায় ২০ বছর আগে একই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন আবু নাসের বখতিয়ার। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স ৭৯ বছর ২ মাস ৬ দিন। তাকে নিয়োগ দেওয়ার তারিখ (৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪) হিসেবে তখন তার বয়স ছিল ৭৭ বছর ৯ মাস ২ দিন। অথচ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়স ৭৫ বছরের বেশি হতে পারবে না।
এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ কালবেলাকে বলেন, আমি তো জোর করে বসিনি, আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি বিদেশে ছিলাম, ছাত্র-জনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করা হয়। বয়স-সংক্রান্ত বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত।
নির্ধারিত বয়সের চেয়ে বেশি বয়সে চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়ে ব্যাংকটির বর্তমান এমডি বলেন, এটা আমি বলতে পারব না, এটা আমার বলার সুযোগ নেই।
অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, সৈয়দপুর শাখার অর্থ আত্মসাতের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তাধীন। আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে এবং তদন্ত শেষ হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন ও স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শাস্তি লঘু থেকে শুরু করে ডিমোশন, ডিসমিসাল বা টার্মিনেশন পর্যন্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো অর্থ ফেরত আনা। বিষয়টি বড় অঙ্কের হওয়ায় আইন ও আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে এবং তদন্ত চূড়ান্ত হলে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে। এমডি আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, আমার মনে হয় না তিনি জড়িত, কারণ ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল রিপোর্ট অনুযায়ী এমডির সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সার্বিক বিষয় অবহিত করে মন্তব্য জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ৬৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর এবং উদ্বেগজনক। এত বড় অঙ্কের অনিয়ম দীর্ঘ সময় ধরে সংঘটিত হওয়া তদারকি ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বর্তমান এমডির সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য না থাকলেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি তার ঘনিষ্ঠ বা পছন্দের ব্যক্তি হন—এমন অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কেউ জেনে জড়িত থাকলে যেমন অপরাধ, তেমনি না জেনে দায়িত্বে অবহেলাও শাস্তিযোগ্য। বড় দুর্নীতির ঘটনায় কাউকে দায়মুক্তি না দিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সুশাসনের পরীক্ষা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এ ধরনের বড় দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এখানে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান বা পরিচালক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা যদি ৭৫ বছর নির্ধারিত থাকে, তবে তা অতিক্রম করে নিয়োগ হওয়া নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে—যদি না সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। ব্যতিক্রমী কোনো সিদ্ধান্ত থাকলে সেটিও স্বচ্ছভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।