Image description
তিন দলের ইশতেহার বিশ্লেষণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যেই ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে বিজয়ী হলে দেশ ও মানুষের জন্য কী কী করতে চায় সেসব প্রতিশ্রুতি আর অঙ্গীকারের ফিরিস্তি তুলে ধরেছে তারা। অঙ্গীকারের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি বন্ধ করা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, নারীর উন্নয়ন ও সুরক্ষা, মহান মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

তবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারে বেশ কিছু বিষয়ে মিল থাকলেও অনেক বিষয়েই আছে বৈপরীত্যও। এছাড়া কিছু বিষয়ে মৌলিকভাবে একমত হলেও তা বাস্তবায়নে দলগুলোর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনা। দু-একটি দলের ইশতেহারে নতুনত্ব ও স্বতন্ত্র চিন্তার অনেক প্রতিশ্রুতিও রয়েছে যা আবার অন্য দলের ইশতেহারে উল্লেখ নেই। এছাড়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী বেশ কিছু বিষয় ইশতেহারে যুক্ত করলেও তা বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয়নি কোনো কোনো রাজনৈতিক দল।

‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে বিএনপির ৪৪ পৃষ্ঠার নির্বাচনি ইশতেহারে ‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে নয়টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫১ দফায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কর্মসংস্থান, বেকারভাতা, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ, দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, মনোরেল এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি করাসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহারকে কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা হিসাবে অ্যাখ্যায়িত করেছেন।

অন্যদিকে জামায়াত তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছে। রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখাকে সামনে রেখে এই ইশতেহার উপস্থাপন করা হয়। এতে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিসহ ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও যুবকের কর্মসংস্থানসহ নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এটিকে ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

এছাড়া এনসিপি ৩৬ দফার ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ দিয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে এতে প্রাধান্য পেয়েছে পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নাগরিকদের ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা, সিংহভাগ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, ডিজিটাল হেলথ কার্ড প্রবর্তন, সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করার মতো নানা প্রতিশ্রুতি।

সাংবিধানিক সংস্কার : বিএনপির ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার দফায় রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংসদের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, উচ্চকক্ষ গঠন প্রভৃতি রয়েছে। এছাড়া উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি এবং যত মেয়াদেই হোক না কেন, একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার বিধান তৈরির কথা ইশতেহারে বলেছে বিএনপি। অন্যদিকে নির্বাচনে জিতলে কার্যকর জাতীয় সংসদ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে জামায়াত। দলটি বলছে, তাদের ‘ভিশন’ হবে সংসদকে দেশ গঠন, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করা। এক্ষেত্রে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি, ‘সংসদ সদস্যরা যাতে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে।

এদিকে জামায়াত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি প্রবর্তনের কথা বলেছে। অন্যদিকে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।

পররাষ্ট্রনীতি : বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন-‘সবার আগে বাংলাদেশ।’ দলটি তাদের ইশতেহারে সব রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী, পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতিভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। অন্যদিকে জামায়াতের ভিশন হলো পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও সমমর্যাদামূলক পররাষ্ট্রনীতি। এক নম্বর অগ্রাধিকার-বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়ানো।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক : জামায়াত তাদের ইশতেহারে ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেছে। বিএনপি কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতাকে সম্পর্কের ভিত্তি হিসাবে উল্লেখ করেছে বিএনপি। অন্যদিকে এনসিপি বলছে, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সব বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট : বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি তিন দলই দ্রুত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাদের ইশতেহারে।

রাজনীতির পরিবর্তন : জামায়াতের ‘রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তনের’ প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অংশ হিসাবে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে (আসন ও ভোটের সংখ্যানুপাতে) রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে। অন্যদিকে সরকার গঠনে সক্ষম হলে বিগত দিনে আন্দোলনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের অংশীজন হবে বলে জানিয়েছে বিএনপি।

মহান মুক্তিযুদ্ধ : ইশতেহারের অষ্টম ভাগে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব পর্বে জামায়াত বলেছে, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার) রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হবে। অন্যদিকে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে। দলটি বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ, শহীদদের সার্বিক সহায়তা করা, শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণার্থে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছে বিএনপি।

জুলাই সনদ : এনসিপির ইশতেহারের এক নম্বর প্রতিশ্রুতিতেই বলা হয়েছে, জুলাই সনদের যে দফাগুলো আইন ও আদেশের ওপর নির্ভরশীল, তা বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়বদ্ধ কাঠামো তৈরিতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে। বিএনপি বলেছে, সরকার গঠন করতে পারলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের দেখভালের জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে। জুলাই শহীদ এবং যোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে অনুদান ও ভাতা দেওয়া এবং শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আবাসন ও পুনর্বাসন ও সরকারি খরচে চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত।

আইনের শাসন ও দুর্নীতি : বিএনপির প্রতিশ্রুতি হলো দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে প্রথম অগ্রাধিকার। আওয়ামী লীগের আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে তারা। পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। অন্যদিকে জামায়াত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের পাশাপাশি প্রশাসনের সেবা ডিজিটালাইজ করা এবং ‘আমার টাকা আমার হিসাব’ অ্যাপের মাধ্যমে সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া চাঁদাবাজি, ঘুস, নারী নির্যাতনসহ যে কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ নামে অ্যাপের কথাও বলেছে দলটি। আর এনসিপি বলছে, মন্ত্রী, এমপিসহ সব জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের বিস্তারিত ‘হিসাব দাও’ পোর্টালে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ ও হালনাগাদ করা হবে।

সামাজিক সুরক্ষা : বিএনপির ইশতেহারে দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পেনশনের জন্য পেনশন ফান্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে চলমান বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে দলটি। অন্যদিকে সবার জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ভিশনের কথা জানিয়েছে জামায়াত। যুগোপযোগী সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত ও ওয়াকফা ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। আর এনসিপি বলেছে, টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে দাঁড়িয়ে নয়; বরং নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করা হবে।

স্বাস্থ্য : বিএনপির ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড এবং দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত তাদের ইশতেহারে হাতের নাগালে কম খচরে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া ৫ বছরের নিচে এবং ৬০ বছরের ওপরের সবাইকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি। আর প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডিভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থান : বিএনপির ইশতেহারে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, ক্রীড়া ও দেশীয় সংস্কৃতি শিক্ষা, সংগীত, নাটক পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা, মিড-ডে মিল চালু, ফ্রি ওয়াইফাই, বিনামূল্যে স্কুলড্রেসের ব্যবস্থা এবং শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাফেজে কুরআনদের স্বীকৃতি, নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় কুরআন তেলাওয়াত অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছে বিএনপি। দলটির প্রতিশ্রুতি হলো, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

অন্যদিকে জামায়াতের ইশতেহারে ‘সরকারি চাকরির আবেদনের জন্য ফি নেওয়ার রীতি বাতিল করার’ কথা বলা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি বলছে, ‘কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস পরিমার্জন ও সার্টিফিকেটের মূল্যায়ন করবে’ জামায়াত। তবে বিএনপির ইশতেহারে সিলেবাস সংশোধন নয়, বরং কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। জামায়াত বলেছে, অষ্টম শ্রেণির পর মাধ্যমিকে শিক্ষাব্যবস্থাকে চারটি পৃথক ধারায় বিভক্ত করা হবে (ইসলামিক শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা)।

এনসিপি তাদের ইশতেহারে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সব ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করার কথা বলেছে। এছাড়া শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও পাঁচ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক পর্যায়ে ছয় মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ বা থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

নারী : বিএনপি নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, স্নাতকোত্তর ফ্রি পড়াশোনা, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশ, নারী সাপোর্ট সেল, উদ্যোক্তাদের সহায়তা, ডে-কেয়ার, ভেন্ডিং মেশিন ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের ইশতেহারে জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারীদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে প্রকল্প ও মাল্টিপারপাস মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের কথা বলা হয়েছে। আর এনসিপি বলেছে, নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।

পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু : পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনর্খনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে জামায়াত বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তিন শূন্য ভিশন (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যরে শূন্যতা এবং বন্যাঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সব সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া হবে। এনসিপি বলেছে, দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। বাস্তবায়ন করা হবে শিল্পদূষণ, নদী-খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি।

আইনশৃঙ্খলা : জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রথম ভাগে স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলার মৌলিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠনসহ ১৬টি লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে। বিএনপি তাদের ইশতেহারে আইনের শাসন বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এছাড়া রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।